পারবেন। সবই জানতে পারবেন। দাসমশাই উদারভাবে আশ্বাস দিলেন, কিন্তু তার জন্যে ধৈর্য ধরে একটু অপেক্ষা করতে হবে, অপেক্ষা করতে হবে সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের গৌরবের মধ্যাহ্নে হঠাৎ অবিশ্বাস্য কালরাত্রি যখন নেমে আসে তখন। অনাঘ্রাতা স্বর্গীয় কুসুমের মতো রহস্য-মাধুর্যমণ্ডিত সূর্য-সমর্পিতা এক অসূর্যম্পশ্যা রাজকুমারীর আশ্চর্য উদ্ধারের পর থেকে নারীমাংস লোলুপ নরপশুদের শাস্তি দিতে দুগ্ধ-ধবল তুরঙ্গবাহনে দেবাদিদেব ভীরাকোচারই যেন অলৌকিক আবির্ভাব পর্যন্ত শুধু নয়, ঘনরামের জীবনের হিংস্র পরম শনি মার্কুইস গঞ্জালেস দে সোলিস-এর কুজকো শহরে বিচিত্র প্রেত-দর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে পানামা যোজকের পূর্ব উপকূলে নোৱে দে দিয়স বন্দরের অন্ধকার সমুদ্রে সেই অভাবিত চরম নাটকীয় হিসাবনিকাশ অবধি।
এর পর কারও মুখে কিছুক্ষণ আর কোনও কথা নেই। মর্মর-মসৃণ শিরোদেশের শিবপদবাবু পর্যন্ত তাঁর ঘূর্ণায়মান মাথাটাকে স্থির করবার চেষ্টা করেছেন। কুম্ভের মতো উদরদেশ যাঁর স্ফীত সেই ভোজনবিলাসী রামশরণবাবু তো আগেই হাল ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে বললেন, না মশাই, আমি ধৈর্য ধরে থাকতেই প্রস্তুত। এক চক্কর যা ঠেলা পেয়েছি তাতেই মাথাটার মধ্যে একটা ঘূর্ণি চলছে। এর ওপর আর এক পাক দিলে একেবারে কাত হয়ে পড়ব।
শিবপদবাবু সামান্য একটু প্রতিবাদের চেষ্টা করলেন তবু। বললেন, এত যে লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে গেলেন উনি, তা মনে করে কেউ রাখতে পারে!
মনে রাখবার আপনার খুব প্রয়োজন আছে কি! হেসে বললেন দাসমশাই, আমিই তো আছি তার জন্যে। যথাসময়ে সবই ঠিক মনে করিয়ে দেব। আর তাতে যদি শান্তি না পান, একটা খাতা-পেন্সিল নিয়ে আসবেন টুকে রাখার জন্যে।
খোঁচাটা হয়তো ইচ্ছে করে দেওয়া নয়। কিন্তু শিবপদবাবু একটু পালটা খোঁচাই দিলেন, টুকে রাখব? কেন আমাদের কি পরীক্ষা দিতে হবে নাকি!
না, দিতে হবে কেন, তার বদলে নিতেও তো পারেন! একটু হেসেই বললেন দাসমশাই, ঘনরাম দাসকে একটু বেকায়দায় যদি চেপে ধরতে পারেন তাই বা মন্দ কী? সোরাবিয়া থেকে মার্কুইস দে সোলিস, এমনকী স্বয়ং পিজারো পর্যন্ত, সেই চেষ্টাই করেছিল। কিন্তু সে পরের কথা। আপাতত তাঁকে মোরালেস-এর বাড়িতে ক্রীতদাস হিসেবে দেখেই আমাদের উঠতে হয়।
শ্রীঘনশ্যাম দাস আসর ভেঙে উঠলেন। তাঁর সঙ্গে আর সবাই।
রাত বেশ হয়েছে। সরোবরের তীরে তীরে মশলামুড়ির মাহাত্ম্য আর তেমন ঘন-ঘন ঘঘাষিত হচ্ছে না। আইসক্রিম ফেরিওয়ালারাও অদৃশ্য।
আমাদের পরিচিত সরোবর-সভা ভাঙবার পরই একটা ঝিঝি হঠাৎ একটানা তীব্র ঘর্ষণ ধ্বনিতে সকলকে চমকে দিলে।
এতক্ষণ দাসমশাই-এর জন্যেই সে যেন সাড়া দিতে সাহস করেনি।
০৫. রাজধানী পানামায়
১৫২১-এ যোজকের নতুন সরিয়ে-আনা রাজধানী পানামায় পিজারো আর আলমিগরো বন্ধু মোরালেস-এর বাড়িতে ঘনরামকে ক্রীতদাস হয়ে থাকতে আমরা দেখেছি, পরের দিন সরোবরের সান্ধ্যসভায় শুরু করলেন শ্রীঘনশ্যাম দাস, আর সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের সন্ধানে যাবার জন্যে যারা ব্যাকুল তাদের একত্র মিলিয়ে পাথেয় সংগ্রহের উপযুক্ত ভূমিকা তৈরি করার ব্যাপারে তাঁর নেপথ্য হাত যে আছে তা অনুমান করা আমাদের ভুল হয়নি।
পিজারো আর আলমাগরোর স্বপ্ন সার্থক হবার সম্ভাবনা সত্যিই ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাঁরা নিজেরাই বিস্মিত হয়েছেন অপ্রত্যাশিতভাবে নানাদিক থেকে ভাগ্য তাঁদের ওপর অনুকূল হয়ে ওঠায়।
ভাইকার হার্নারেমন্ডো দে লুকে তাঁদের দুই বন্ধুর প্রস্তাব শুনে সে বিষয়ে কিছু করা। সম্ভব কি না চেষ্টা করে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়ে গেছলেন। কিন্তু তাঁর দিক থেকে কয়েক মাস কোনও সাড়াই পাওয়া যায়নি।
আসলে ভাইকার দে লুকে খুব প্রাণ খুলে কোনও আশ্বাস তাদের দেননি। এ-অভিযানের পরিকল্পনা যা শুনেছেন, তাতে তেমন কিছু উৎসাহবোধ করার বদলে তিনি তার সাফল্য সম্বন্ধে সন্দিহানই হয়েছেন। পিজারো আর আলমাগরোর এ-রকম অভিযান চালাবার যোগ্যতা সম্বন্ধে সংশয় জেগেছে তাঁর মনে। যত উৎসাহীই হোক, দু-জন প্রায় বুড়ো, সম্পূর্ণ নিরক্ষর বাউণ্ডুলে ছাড়া তো তারা কিছু নয়। তা ছাড়া আরও একটা কথা ভাবতে হয়েছে দে লুকেকে। নতুন মহাদেশ আবিষ্কৃত হবার পর থেকে আশাতীত অনেক কিছুর সন্ধান মিলেছে সত্যিই, কিন্তু কল্পনারঙিন কিংবদন্তি যে আশা জাগিয়েছে, তার একশোটার মধ্যে একটাও পূর্ণ হয়েছে কি না সন্দেহ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লুব্ধ করে টেনে এনে মরীচিকার মতোই আশ্চর্য সব দেশের ঘোষিত ঐশ্বর্যের সমারোহ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
দুঃসাহসী বেপরোয়া ভাগ্যান্বেষীরা না হোক, তাদের অভিযানের খরচ যারা জোগায় ভবিষ্যৎ লাভের আশায়, সেই মহাজনেরা অন্তত একটু সাবধান হয়ে হাত গুটিয়ে নিয়েছে তাই।
এ মহাজনির কারবারে লাভ হলে অঢেল হয় বটে, কিন্তু লোকসানের ঝক্কিও দারুণ। প্রথমত, অভিযান সফল হলেও কতদিনে হবে তার কোনও ঠিকই নেই। এক-দু বছর নয়, পাঁচ-দশ বছরেও লাভ দূরের কথা, যাদের ভরসায় টাকা খাটানো, তাদের মুখই হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে না। বেঁচেবর্তেই তারা না থাকতে পারে। তখন যা-কিছু তাদের জন্যে ঢালা হয়েছে, সবই জলাঞ্জলি। তাদের আরম্ভ করা অভিযান হয়তো সফল হবে, কিন্তু ভিন্ন লোকের হাতে। তারা আমলই দেবে না আর কারও সঙ্গে আগেকার কোনও চুক্তিকে।
