তাঁর কাছে কাজ করতে করতে ঘনরাম সেই নতুন আবিষ্কৃত মহাসমুদ্র আর তার কূলে কোথাও যা এখনও নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে সেই বাস্তব স্বর্ণলঙ্কার কথা শুনেছেন।
১৫২২-এ পিজারো যখন তাঁর অভিযানের স্বপ্ন সার্থক হওয়া সম্বন্ধে কোনও আশাই রাখেন না, ঘনরাম তখনও ওই পানামা শহরেই আছেন।
পিজারোর সঙ্গে পথেঘাটে তাঁর দেখা হয়। দেখা হয় মোরালেস-এর বাড়িতেও।
পিজারো সেখানে যান। তাঁর সঙ্গে একটু বেঁটেখাটো শক্তসমর্থ আর-একজন আসেন। তখনও একটা চোখ অসাধ্য সাধনের ব্রতে তাঁকে নৈবেদ্য দিতে হয়নি। দেখতে পিজারোর মতো সুপুরুষ না হলেও কিছুক্ষণ লক্ষ করলেই তাঁর প্রাণখোলা চরিত্র ভাল লাগে। ইনিই পিজারোর বন্ধু দিয়েগো দে আলমিগরো।
পিজারো আর আলমাগরো মোরালেস-এর সঙ্গে একত্র হলেই অবশ্য যে দেশের রাস্তাঘাট সোনায় বাঁধানো, আর সোনার বাসন ছাড়া কেউ যেখানে অন্য কিছু ব্যবহার করে না, সেই দেশে অভিযানের আয়োজন কেমন করে করা যায় তারই আলোচনা করেন।
কিন্তু সে আলোচনা যেন বামন হয়ে চাঁদ পাড়বার ফন্দির আলোচনার মতো।
এ অভিযান সাজানো মানে চারটিখানি তো কথা নয়। ছোটখাটো হলেও অন্তত দুটো জাহাজ নিয়ে পাড়ি দিতেই হবে। কোথায় পাবেন সে জাহাজ কেনবার বা তৈরি করাবার খরচ? দুটি জাহাজের রসদ জোগাড় করার সমস্যা আছে তারপর, আর সেই সঙ্গে প্রায় শ-খানেক মাঝিমাল্লা সৈনিক।
এমনিতেই দেনার দায়ে তাঁদের চুলের টিকি পর্যন্ত বাঁধা। এত খরচের টাকা সুতরাং তাঁদের বেচলেও জুটবে না।
পিজারো তবু বলেন যে যেমন করে তোক অস্ত্রশস্ত্র গুলিবারুদ বন্দুকের খরচটা তিনি দিতে পারবেন। আলমাগরো জানান যে দুটি জাহাজে প্রয়োজনীয় রসদ বোঝাই করবার ভার নিতে প্রস্তুত।
কিন্তু লাগাম যাতে লাগাবেন সে ঘোড়া কোথায়? আসল যা দরকার সেই জাহাজ আসছে কোথা থেকে!
হঠাৎ পিজারো একদিন তাঁর বাসায় একটা চিঠি পান। অজানা কে একজন। লিখেছে তাঁকে উদ্দেশ করে।
পিজারো পড়তে জানেন না। চিঠি পড়তে তাঁকে মারলেস-এর কাছেই আসতে হয়েছে।
মোরালেস চিঠি পড়ে যা জানিয়েছেন তাতে অবাক হবারই কথা।
কে একজন অপরিচিত হিতৈষী পিজারোকে জানিয়েছে যে পানামার বন্দরে একটা জাহাজ খুলে রাখা অবস্থায় আছে। ভাস্কো নুনিয়েজ দে বালবোয়া নিজের ব্যবহারের জন্য এ জাহাজটি তৈরি করিয়েছিলেন। সূর্য কাঁদলে সোনার দেশেই এ জাহাজ নিয়ে অভিযান করার বাসনা তাঁর ছিল। সে বাসনা তাঁর পূর্ণ হয়নি। খুলে রাখা জাহাজটা বেশ সস্তা দরে পাওয়া যেতে পারে। সেটা জুড়ে নিয়ে ব্যবহারের যোগ্য করাও শক্ত নয়। পিজারো ও তাঁর বন্ধু এ জাহাজটার খোঁজ নিয়ে দেখুন না!
চিঠির তলায় কোনও নাম সই নেই। কে লিখল তাহলে এ চিঠি?
তাঁদের ভাবনা ভাববার এত মাথাব্যথা কার? ভেতরকার এত কথা আর কেউ জানলই বা কী করে?
তার ওপর বালবোয়া-র নিজের জন্যে তৈরি জাহাজটার ওই অবস্থার খবর তো তাঁরা নিজেরাই রাখেন না! কাস্তিল কি মাদ্রিদের মতো একটা বিরাট কিছু শহর নয়। অল্পবিস্তর সকলকেই সকলে এখানে চেনে। এত হুশিয়ার এবং তাঁদের হিতৈষী কারও কথা পিজারো কি আলমিগরো কি মোরালেস কেউই মনে করতে পারেন না।
তাজ্জবের ওপর তাজ্জব। খানিক বাদে মোরালেস-এর খোঁজে যিনি সেখানে এসে উপস্থিত হন, তাঁকে দেখে পিজারো ও মোরালেস দুজনেই একেবারে হতভম্ব।
স্বয়ং পানামার ভাইকার হার্নারেমন্ডো দে লুকে তাঁদের খোঁজে এখানে এসেছেন। তিনিও এসেছেন এক অচেনা বন্ধুর চিঠি পেয়ে। চিঠিতে তাঁকে মোরালেস-এর বাড়িতে অতি অবশ্য সেদিন সকালে একবার দেখা করতে অনুরোধ করা হয়েছে। দেখা করলে তাঁর নিজের যাতে বিশেষ উৎসাহ হতে পারে এমন একটি ব্যাপারের কথা তিনি জানতে পারবেন। অত্যন্ত দুঃসাধ্য ও দুঃসাহসিক একটি উদ্যোগ হয়তো তাঁরই সাহায্যে সার্থক হয়ে উঠতে পারে।
কী সে ব্যাপার আর উদ্যোগ দে লুকে-কে জিজ্ঞাসা করে তা জানতে হয়নি।
দুটি চিঠির লেখা মিলিয়ে দেখতে গিয়ে দুটি যে এক হাতের লেখা তা বোঝা। গেছে। ভাইকার দে লুকে-কে পিজারোর সঙ্গে দেখা করানোর চেষ্টার উদ্দেশ্যটাও বোঝা গেছে।
তাঁদের বিস্মিত উত্তেজিত আলোচনার মধ্যে আলামাগরো এসে পড়েছেন। তিনিও সব শুনে এ-চিঠি কে পাঠাতে পারে, ঠিক করতে পারেননি।
চিঠি যে-ই পাঠিয়ে থাক তার উদ্দেশ্য সফলই হয়েছে। মোরালেস-এর বাড়িতে ভবিষ্যতের তিন অংশীদারের যোগাযোগ ও আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে সেদিন থেকেই।
মোরালেস খুশি মনে সকলের জন্যে পানীয় আনবার হুকুম দিয়েছেন।
পানীয় এনে যে সসম্রমে সকলকে পরিবেশন করেছে তার দিকে কে আর নজর। দিয়েছে?
নজর এক-আধবার পড়লেও তাকে ঘনরাম বলে চিনবে কে? যে অচেনা হিতৈষীর চিঠি তাঁদের এইভাবে একত্র করেছে তা যে তাঁদের সামনে যথাবিহিত মাথা নুইয়ে দাঁড়ানো একজন ক্রীতদাসের লেখা, তাঁরা আর কী করে কল্পনা করবেন!
ক্রীতদাস! ঘনরাম দাস ক্রীতদাস! এবার শ্রীঘনশ্যামকে বাধা দিয়ে মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই শিবপদবাবুই তীক্ষ্ণ স্বরে তাঁর সংশয় প্রকাশ করেছেন, তা কী করে হয়?
হ্যাঁ, মেদভারে হস্তীর মতো বিপুল সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবুও তাঁকে সমর্থন করে বলেছেন, সেই সেনোরা আনা মজা করে ষড়যন্ত্রের মতলব নিয়ে আসার পর কোথায় কী যে হল কিছুই তো জানতে পারলাম না। সেনোরা আনা কীসের ষড়যন্ত্রের কথা বলেছিল, তাতে হলই বা কী, কী এমন ভাগ্যের কারসাজিতে কীভাবে ঘনরাম আবার সেই ক্রীতদাস হয়ে পানামার মতো জায়গায় এসে ছিটকে পড়ল কিছুই তো জানতে পারলাম না।
