এ দেশ কি শুধু এখানকার অজ্ঞ অধিবাসীদের কল্পনাতেই আছে!
যদি কল্পনারই হয় তবু বালবোয়া নিজে একবার তা যাচাই করে দেখবেন।
সুদৃঢ় সংকল্প আর গভীর আশা নিয়ে বালবোয়া তাঁর হর্তাকর্তা সোনার কাস্তিল-এর শাসক পেড্রারিয়াস-এর রাজধানী ডারিয়েন-এ ফিরে যান। তাঁর সব সংকল্প ব্যর্থ, সব আশা চূর্ণ হয়ে যায় পেড্রারিয়াস-এর নীচ পরশ্রীকাতরতায় আর সংকীর্ণতায়। পেড্রারিয়াস নতুন রাজ্য আবিষ্কারের গৌরব নিতে চায়, নিতে চায় সেখানে যা পাওয়া যায় সে সম্পদের সিংহভাগ, কিন্তু আর কারও, এমনকী অভিযানের সমস্ত দুর্ভোগ দায়িত্ব নিয়ে নির্বাসন বন্দিত্ব মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করতে যে প্রস্তুত তার, বিন্দুমাত্র সাধুবাদ সহ্য করতে পারবে না।
শাসকের সমর্থন ও অনুমতি ছাড়া কোনও অভিযান পরিচালনা করা অসম্ভব। এসপানিয়ার সম্রাট অনেক দূর অস্ত। ডারিয়েন-এ তাঁর প্রতিনিধি পেড্রারিয়াস।
বালবোয়া দিনের পর দিন বৃথাই তাঁর অনুমতির জন্য অপেক্ষা করেছেন। ইতিমধ্যে বালবোয়ার যুগান্তকারী আবিষ্কারের মূল্য পেড্রারিয়াস যে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তা নয়। নতুন মহাসমুদ্রে আবিষ্কারের অভিযান চালাবার সুবিধার জন্যেই ১৫১৯-এ বালবোয়ারই পরামর্শ অনুসারে ডারিয়েন থেকে রাজধানী পশ্চিমের সমুদ্রকূলে পানামায় সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখান থেকে নতুন অজানা দেশ, বিশেষ করে সেই ভারতমুখী প্রণালী খোঁজার উদ্দেশ্যে জাহাজ সাজিয়েও বেরিয়েছেন অভিযাত্রীরা, কিন্তু সব অভিযানেরই মুখ উত্তরে। উত্তরে যোজকের ভেরাগুয়া, কোস্টারিকা, নাইকারগুয়া প্রভৃতি পর পর আবিষ্কৃত ও অধিকৃত হয়েছে।
শুধু দক্ষিণে কোনও অভিযান যায়নি।
বালবোয়া অন্যায়ে অবিচারে আশাভঙ্গের বেদনায় নিরুপায় হতাশায় ভেতরে ভেতরে জর্জর হয়ে একদিন মৃত্যুবরণ করেছেন।
সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ আবিষ্কারের ভাগ্য তাঁর হয়নি।
সে সৌভাগ্য হয়েছে তিনজনের মিলিত একটি দলের।
এ তিনজনের দু-জন রাস্তায় কুড়িয়া পাওয়া অনাথ শিশু হিসেবে বেশির ভাগ ইগ্নেসিয়া অর্থাৎ স্থানীয় গির্জার কৃপা করুণাতেই মানুষ। দু-জনেই এঁরা নিরক্ষর মূখ। একজন দেশে গাঁয়ে শুয়োর চরাতেন, আর-একজন কী করতেন সঠিক জানা না গেলেও ওর চেয়ে সম্মানের কিছু যে করতেন না সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
অজানা দেশ আবিষ্কারের অভিযাত্রী হওয়া জোয়ান তরুণদেরই কাজ। কিন্তু যাঁদের কথা বলেছি তাঁরা দু-জনে যখন প্রথম অভিযানে রওনা হন তখন দু-জনেরই বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে।
আধবুড়ো এই দুই নিরক্ষর ভাগ্যান্বেষীর পয়সার জোরও ছিল না। তাঁদের অভিযানের খরচ বইবার ভার দলের তৃতীয় যে জন নিয়েছেন তিনি হলেন একজন এসপানিওল ধর্মযাজক-পানামায় ভাইকার-এর কাজ করেন। তার আগে ডারিয়েন-এর গির্জায় গুরুমশাই ছিলেন ছাত্র পড়াবার।
এত টাকা তিনি পেলেন কোথায়?
আসলে টাকা তাঁরও নিজের নয়। তিনি আর-একজনের প্রতিনিধি হয়ে টাকাটা দিয়েছেন মাত্র।
কী নামে এঁরা সবাই পরিচিত? তখনকার সেই ছোট উপনিবেশের জগতেও গ্রাহ্য করবার মতো নাম কারও নয়। নেপথ্য থেকে যিনি সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে টাকা দিয়েছেন সেই আসল মহাজনের নাম লাইসেনসিয়েট গাসপের দে এসপিনা। যাঁর মারফত টাকাটা দেওয়া হয়েছে তিনি হলেন হার্নারেমন্ডো দে লুকে, দুই দুঃসাহসী আধবুড়ো অভিযাত্রীদের মধ্যে একজনের নাম দিয়েগো দে আলমিগরো আর অন্যজনের ফ্রানসিসকো পিজারো। মূর্খ নিরক্ষর অনাথ গির্জার দয়ায় মানুষ পিজারোই যেখানে তাঁর জন্ম স্পেনের সেই টুকসিল্লো শহরে যৌবন পর্যন্ত শুয়োর চরাতেন।
১৫২২ সালে তিনি পানামার রাস্তায় ঘাটে যাদের ছড়াছড়ি নতুন মহাদেশে ভাগ্যান্বেষে আসা সেই বাউণ্ডুলেদের একজন।
তাদেরই একজন বটে, কিন্তু কিছু বিশেষত্বের পরিচয় ইতিমধ্যেই তিনি দিয়েছেন। ১৫১০-এ নতুন মহাদেশের পথেঘাটে সোনা ছড়ানো গুজব শুনে ও বিশ্বাস করে আরও অনেকের মতো দেশ ছেড়ে তিনি অকূলে ঝাঁপ দিয়ে প্রথম হিসপানিওলায় এসে ঠেকেছিলেন। সেখান থেকে সোনার কাস্তিল-এর নরকে। কিন্তু এখানে অসামান্য অথচ একান্ত হতভাগ্য বালবেয়ার সঙ্গে পিজারোর যোগাযোগ হয়। বালবোয়ার সঙ্গেই ইউরোপের মানুষ হিসেবে প্রথম প্রশান্ত মহাসাগর দেখার সুযোগ তিনি পান। তারপর বালবোয়ার অকাল মৃত্যুর পর ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে আর একবার যোজকের পর্বতপ্রাকার ডিঙিয়ে মোরালেস নামে একজন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি সমুদ্রকূলের আদিম অধিবাসীদের কাছে দক্ষিণের রহস্যরাজ্যের আরও কিছু খবর সংগ্রহ করে আনেন।
১৫২২-এ পাসকুয়াল দে আন্দাগোয়া নামে আর-একজন অধিনায়কের নেতৃত্বে একটি অভিযান বালবোয়া যতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন সেই পুয়েরতো দে পিলিয়াস-এর বেশি অগ্রসর হতে না পারলেও সূর্য কাঁদলে সোনার দেশের আরও বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে এসে প্রচার করে।
পানামা শহরের হাওয়ায় তখন সেই আশ্চর্য দেশ খুঁজতে বার হওয়ার ব্যাকুল উত্তেজনা। পথেঘাটে সকলের মুখে ওই বিষয়ে ছাড়া আলোচনা নেই।
কিন্তু ঘনরামও তো তখন ওই সোনার কাস্তিল-এর নরকে কোথাও না কোথাও আছেন!
হ্যাঁ, আছেন। ১৫২১-এ ভাগ্য ও সত্যিকার সমুদ্রের ঝড় তুফানের প্রচণ্ড ঢেউ তাঁকে নিয়ে কিছুকাল লোফালুফি করে এই পানামা যোজকেই আছড়ে ফেলে দিয়ে গেছল।
এখানে পানামায় যার বাড়িতে তিনি আশ্রয় পেয়েছেন তাঁর নাম আমরা একবার শুনেছি। তিনি মোরালেস। পিজারোর সঙ্গে ১৫১৫-তে তিনি পশ্চিমের অসীম মহাসমুদ্র দেখে এসেছেন।
