তাই ইন্ডিয়ায় পৌঁছোবার নিরাপদ রাস্তা চাই।
সে রাস্তার খোঁজে বেরিয়ে কলম্বাস মাঝপথে যা পেয়েছেন সে দেশের সঠিক পরিচয় তখনও গাঢ় রহস্যে ঢাকা।
বিরাট একটা অজানা বিস্তৃতির ওপরকার দুর্ভেদ্য যবনিকা এখানে সেখানে সামান্য একটু উঁকি দেবার মতো ওঠানো গেছে মাত্র।
কিন্তু যবনিকা যেটুকু উঠেছে তাতেই উত্তেজনার বন্যা বইয়ে দিয়েছে। দুঃসাহসীদের রক্তে।
স্পেনে নিজেকে পুরুষ বলে যারা গর্ব করে তারা সবাই তখন দুঃসাহসী, সবারই মন অবিশ্বাস্য যশ আর ঐশ্বর্য জয়ের স্বপ্নে বিভোর। তাদের এ স্বপ্ন দেখবার কারণ যে নেই তা নয়।
আবিষ্কারের পর জয় করে প্রথম উপনিবেশ পাতা হয়েছে হিসপানিওলায়, ফার্নানদিনায়, মানে কিউবায়।
তারপর হার্নান্দেজ দে কর্ডোভা বাহামা দ্বীপ থেকে সেখানকার আদিবাসী ক্রীতদাস ধরে আনতে গিয়ে ঝড় তুফানে ছিটকে আশাতীত এক অজানা রাজ্যে পোঁছে তাদের বাড়িঘর চাষবাস মিহি কাপড়ের শৌখিন বেশভূষা আর গয়নার সোনাদানা দেখে অবাক হয়েছেন। কান শুনতে ধান শুনে সেখানকার লোকের মুখের টেকটেটানকে য়ুকাটান নাম দিয়ে তিনি কিউবায় ফিরে নতুন দেশের ঐশ্বর্যের চোখ কপালে-তোলা গল্প করেছেন।
এক আবিষ্কার আর-এক অভিযানকে ঠেলা দিয়েছে। য়ুকাটানের পর কর্টেজ-এর কীর্তি মেক্সিকো জয়।
উদ্দাম উত্তেজনার ঢেউ তখন এই সব দৃষ্টান্তে নতুন মহাদেশের সমস্ত পূর্ব উপকূলের তীরে ধাক্কা দিচ্ছে।
সামনে অজানা মহাদেশ প্রসারিত। কিন্তু তারই ভেতর কোথাও আছে সেই প্রণালী যা আতলান্তিক থেকে ইন্ডিয়ার পশ্চিম তীরে গিয়ে নামবার সমুদ্রে পৌঁছে দেবে—এই ছিল সব অভিযাত্রীর দৃঢ় বিশ্বাস।
মেক্সিকো স্পেনের পদানত হয়েছে ১৫২৩-এ। তার অনেক আগেই ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো নুনিয়েজ-দেবালবোয়া আশ্চর্য এক দেশের কিংবদন্তি শুনেছেন।
এসপানিওলরা সবাই সোনা বলতে পাগল—এ ব্যাপারটা তখনও নতুন মহাদেশের নিজস্ব অধিবাসীদের কাছে অদ্ভুত লাগে। তাদেরই একজন বালবোয়াকে সে অবিশ্বাস্য দেশের কথা শুনিয়েছে।
আগে যে জঘন্য অস্বাস্থ্যকর উপনিবেশের কথা বলেছি বালবোয়া তখন পেড্রারিয়াস-এর অধীন সেই কাস্তিস্লা-দে-অরো মানে সোনার কাস্তিলের নরকে থাকেন।
কাস্তিল-দে-অরো যে উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার যোজক মাত্র তা তখনও। ঔপনিবেশিকদের অজানা!
শাসক পেড্রারিয়াস-এর প্রতিনিধি হিসেবে বালবোয়া আদিম অধিবাসীদের কাছে সংগ্রহ করা কিছু সোনা ওজন করাচ্ছিলেন। সেখানে স্থানীয় একজন সর্দার ছিল। উপস্থিত। বিস্ময়ে কৌতুকে সোনা ওজনের এ অনুষ্ঠানে দেখতে দেখতে হেসে উঠে দাঁড়িপাল্লায় একটা চাপড় দিয়ে সে সমস্ত সোনা মাটিতে ছড়িয়ে দেয়। তারপর মুখ বেঁকিয়ে বলে, এই জিনিসের ওপর তোমাদের এমন লোভ যে হিতাহিত কাণ্ডজ্ঞান। পর্যন্ত খুইয়ে পাগলের মতো হন্যে হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছ! এমন দেশের খোঁজ আমি দিতে পারি যেখানে সোনার থালা বাটিতে ছাড়া কেউ খায় না, তোমাদের কাছে লোহা যা সেখানে সোনা তারই মতো সস্তা। সেখানে সূর্য কাঁদলে সোনা ঝরে।
সূর্য কাঁদলে সোনা ঝরার দেশ হয়তো আজগুবি কিংবদন্তি মাত্র। অমন অনেক আজগুবি কল্পনাই তো তখনকার অভিযাত্রীরা এই রহস্যময় মহাদেশ সম্বন্ধে করেছে, অল্পবিস্তর বিশ্বাসও করেছে অদ্ভুত অবিশ্বাস্য সব আরব্যোপন্যাসকে হার-মানানো কাহিনী।
মেয়েরাই যেখানে যোদ্ধা সেই বীরনারী আমাজনদের কথায় তারা খুব অবিশ্বাসের কিছু পায়নি, শুনেছে পাটাগোনিয়ার দানব জাতির কথা, আর সেই এল ডোরাডো-র বিবরণ শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে যেখানে সোনার কণা সমুদ্রের বালির মতো ছড়িয়ে থাকে, আর নদীতে জাল ফেললে পাখির ডিমের মতো সোনার ঢেলার ভারে জাল টেনে তোলা শক্ত হয়।
সূর্য কাঁদলে সোনার দেশ সত্যে মিথ্যায় বাস্তবে কল্পনায় মেশানো তেমনই কিছু হওয়া অসম্ভব নয়।
কিন্তু কাহিনী যারা শোনায় তারাও সে দেশের সঠিক হদিস দিতে পারে কই!
রহস্য-যবনিকার আড়াল থেকে মাঝে মাঝে বিহ্বল করা একটা অস্পষ্ট হাতছানি। শুধু অস্থির করে তোলে।
এই হাতছানির ডাকেই বালবোয়া সূর্য কাঁদলে সোনা ঝরার দেশের কাহিনী শোনার কিছু পরেই কাস্তি দে অরো-র পচা জলাবাদার সাপখোপ মশা পোকামাকড়ের ভ্যাপসা নরক থেকে ডারিয়েন যোজকের মেরুদণ্ডের মতো
পর্বতপ্রাকার ডিঙিয়ে গেছলেন পরম দুঃসাহসে।
পাহাড় ডিঙিয়ে যা তিনি দেখেছিলেন তা তাঁর সমস্ত কল্পনার অতীত।
সমস্ত অস্ত্রশস্ত্রসমেত যোদ্ধার পোশাকেই তিনি ঝাঁপিয়ে গিয়ে পড়েছিলেন সামনে। ফেনায়িত তরঙ্গ-ফনা-তোলা নীল জলের বিস্তৃতিতে। পাগলের মতো চিৎকার করে বলেছিলেন, যতদূর এ অজানা সমুদ্র ছড়িয়ে আছে ততদূর পর্যন্ত দেশ মহাদেশ থেকে দ্বীপবিন্দু সমেত সব কিছুর ওপর কাস্তিল-এর মহামান্য নৃপতির একছত্র অধিকার আমি ঘোষণা করলাম।
দিগন্ত পর্যন্ত প্রসারিত দেখেও সে নীল জলধির বিরাটত্ব তিনি তখন বোধহয় অনুমান করতে পারেননি।
সেই অসীম জলরাশি প্রশান্ত মহাসাগরের। সময়টা বোধহয় ১৫১৪র কিছু পূর্বে।
মানুষের সভ্যজগৎ সমবেত ও সচেতাভাবে সেই প্রথম এক অজানা মহাসমুদ্রের সন্ধান পেল।
যোজকের অপর পারে এই মহাসমুদ্রের তীরেই বালবোয়া রূপকথার মতো অবিশ্বাস্য সোনার দেশের আরও কিছু কিছু বিবরণ পান। সে দেশের পশু পাখি ফল ফসলও নাকি অদ্ভুত। সেখানকার প্রধান একটি প্রাণীর ছবি তাঁকে এঁকে কেউ দেখায়। ইউরোপ এশিয়ার কোনও প্রাণীর সঙ্গে মিল তার কিছু হয়তো থাকলেও তা একেবারে স্বতন্ত্র।
