সেনোরা আনা কৌতুক হিসেবেই ষড়যন্ত্র কথাটা ব্যবহার করেছিল। ঘনরামের জীবনে সেটা কৌতুক নয়, সত্যিকার ষড়যন্ত্রই হয়ে দাঁড়াবে কে আর তখন পেরেছিল ভাবতে!
এ ষড়যন্ত্র কিন্তু কোনও মানুষের নয়। ঘনরামের বিরুদ্ধে যত হিংস্র আক্রোশই মনের ভেতর পুষে রাখুক, সোরাবিয়া এ ষড়যন্ত্রের একটা অসহায় যুঁটি মাত্র।
এ ষড়যন্ত্র স্বয়ং নিয়তির।
কৌতুক হিসাবে সাজানো একটা ছেলেখেলার চক্রান্ত নিয়তির নির্মম শঠতা ছাড়া অমন বিফল বিকৃত হয়ে ঘনরামের জীবনকে চরম অপমান লাঞ্ছনা গ্লানিতে জর্জর করে আবার অকূলে ভাসিয়ে দিতে পারত না।
ঘনরামকে আর যেখানেই হোক ১৫২১-এ নতুন মহাদেশের সবচেয়ে জঘন্য অস্বাস্থ্যকর উপনিবেশে অন্তত দেখা যাবার কথা নয়। সানসেদোর ভবিষ্যৎ গণনার প্রথম দিকটা অন্তত হাতে হাতে তাঁর ফলেছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
শেষের দিকটা ফলবার কথা এ উপনিবেশেই বন্দি থেকে এটা ভাবাও বাতুলতা।
এ উপনিবেশের জমকালো ও গালভরা নাম কিন্তু কাস্তিল্লা-দেল-অরো অর্থাৎ সোনার কাস্তিল। এ উপনিবেশের শাসনকর্তা হলেন ডন পেড্রো আরিয়াস দে আভিলা, ওরফে পেড্রারিয়াস।
যেমন নীচ স্বার্থপর তেমনই হিংসুক পরশ্রীকাতর মানুষটা। যে যুগে এসপানিয়াতে সবচেয়ে যাতে কাজ হত সেই খানদানি বংশে বিয়ের জোরেই তিনি একটা নতুন উপনিবেশের শাসকের মতো সম্মান ও দায়িত্বের পদ পেয়েছিলেন। যাকে তাকে তো আর তিনি বিয়ে করেননি, ক্যাথলিক ইসাবেলা বলে সারা ইউরোপ যাঁকে জানে, তাঁরই বান্ধবী মোআ-র মারনেস, বিখ্যাত ডোনা বিয়াত্রিজ দে বোবাদিল্লার মেয়ে তাঁর ঘরনি। এসপানিয়ায় সম্মান প্রতিপত্তির চূড়ায় ওঠবার সিঁড়িই হল এই। মেক্সিকো বিজেতা কর্টেজ যৌবনে নিচু ঘরে বিয়ে করে যত সুখীই হয়ে থাকুন এই সিঁড়ির সুবিধা না পাওয়ার দরুনই তাঁর যোগ্য সম্মানশিখরে উঠতে পারেননি। তার জন্যে কর্টেজ-এর মনে দারুণ আফগোশ ছিল বলেও অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা। মেক্সিকো বিজয়ের শেষে স্পেনের শাসন যখন সেখানে বিস্তৃত তখন সে দেশের হর্তাকর্তা কর্টেজ-এর পাশে তাঁর সহধর্মিণীরূপে অংশ নিতে এসে কর্টেজ-এর স্ত্রী যখন তিন মাসের মধ্যেই মারা যান তখন কর্টেজ নিজের সামাজিক উন্নতির পথ পরিষ্কার করবার জন্যে তাঁকে সরিয়েছেন এমন গুজবও শোনা গেছল।
সামাজিক সম্পর্কের জোরেই অত বড় উচ্চপদ পেলেও এবং স্বভাবচরিত্রে নীচ স্বার্থপর ঈর্ষাকাতর হলেও তখনকার এসপানিওল অর্থাৎ স্পেনের মানুষের বিশেষ চরিত্র লক্ষণটি পেড্রারিয়াস-এর মধ্যেও ছিল।
নতুন মহাদেশ আবিষ্কৃত হবার পর থেকে সমস্ত ইউরোপের যৌবনই তখন অস্থির চঞ্চল। স্পেন ও পোর্তুগালে উদ্দাম বেপরোয়া উদ্দীপনা আর চাঞ্চল্য সবচেয়ে বেশি।
পোর্তুগাল আর স্পেনই নৌবিদ্যায় তখন অন্যদের তুলনায় বেশি অগ্রসর। সময়ের মাপ আরও সূক্ষ্ম হয়েছে তখন, তার ওপর চুম্বক কম্পাস নির্ভুল দিকনির্ণয়ের শক্তি দিয়ে নাবিকদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ধুকধুকে প্রাণ হাতে নিয়ে সমুদ্রের কূল ঘেঁষে যারা জাহাজ চালাত অকূল দরিয়ায় পাড়ি দেবার মতো তাদের এখন বুকের পাটা।
পোর্তুগাল ও স্পেন এ অগ্রগতির পুরোভাগে থেকেও কিছুকাল আগেও যা কল্পনাতীত ছিল সেই অসাধ্য সাধন করেছে।
আফ্রিকার কূল ধরে ধরে গুটি গুটি এগিয়ে দক্ষিণের দিকে একটা অন্তরীপ থেকে আর-একটা অন্তরীপ পর্যন্ত নিজেদের দৌড় বাড়াতে যাদের প্রায় গোটা শতাব্দীটা লেগে গিয়েছিল, সেই পোর্তুগালের এক দুঃসাহসী নাবিক ডিয়াজ প্রথম আফ্রিকার দক্ষিণের শেষ অন্তরীপ ঘুরে নতুন সমুদ্রে পৌছোবার কীর্তি রাখলেন। আমরা সে অন্তরীপের নাম উত্তমাশা বলে জানি! কিন্তু ডিয়াজ এ অন্তরীপে উত্তম আশা করবার মত কিছু পাননি। ঝড়-তুফানে নাজেহাল হয়ে তিনি এর নাম ঝোড়ো অন্তরীপই রেখেছিলেন। পোর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জন-এর কিন্তু দূরদৃষ্টি ছিল অনেক বেশি। তিনিই অন্তরীপের নতুন নামকরণ করেছিলেন উত্তমাশা। তাঁর নামকরণ যে সার্থক ভাস্কো-দা-গামার আফ্রিকার দক্ষিণ অন্তরীপ ঘুরে ইউরোপের আকুল স্বপ্নের ইন্ডিয়া অর্থাৎ আমাদের ভারতবর্ষে পৌঁছোনোতেই তা প্রমাণ হয়।
যে লক্ষ্যের দিকে একাগ্র হয়ে পোর্তুগ্যাল আফ্রিকার দক্ষিণ দিকে দুঃসাহসভরে এগিয়ে গেছে, সেই একই লক্ষ্যের টানে কলম্বাস স্পেনের হয়ে নতুন এক মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলেছেন পোর্তুগালের আগেই।
সে লক্ষ্য হল ইন্ডিয়া। প্রাচ্য দেশ বলতে তখন ইন্ডিয়াই আগে বোঝায়। সেই ইন্ডিয়াই কল্পনাতীত ঐশ্বর্যের দেশ—-সোনা রুপা হিরে মুক্তো সুগন্ধী আতর আর চন্দন, অপরূপ সব মশলা আর তার চেয়ে অপরূপ সব বয়নশিল্পের নিদর্শন।
এই ইন্ডিয়ায় পৌঁছোবার পথ আবিষ্কার করতে পারাতেই জীবনের চরম সার্থকতা। তার চেয়ে বড় আকাঙক্ষা স্পেন পোর্তুগালের কোনও ভদ্রসন্তান। কাবালিয়েরোর তখন নেই।
কিন্তু পোর্তুগাল যেখানে যাবার পথ খুঁজছে আফ্রিকার দক্ষিণ দিয়ে, পৃথিবী গোলাকার জেনে কলম্বাস তাকে বেড় দিয়ে উলটো দিক থেকে সেখানে পৌঁছোবার চেষ্টা করেছেন কেন?
আর কি পথ ছিল না ইন্ডিয়ায় যাবার?
ছিল আরও সহজ সংক্ষিপ্ত পথ, কিন্তু মেয়ার-ইনসট্রম অর্থাৎ মধ্যোপসাগরে সে। পথে ধনপ্রাণ বাঁচানো অনিশ্চিত করে তুলেছে মরক্কো আর আলজিরিয়ার মূর বোম্বেটেরা। সে সমুদ্রের পূর্বদিকের মুখও আবার মিশর আরবের যোজক সুয়েজ দিয়ে বন্ধ। তারপরও আছে দুরন্ত আরব সাগর-সদাগরেরা, যারা একহাতে বাণিজ্য করে আর-এক হাতে লুঠতরাজ!
