না, কিছুই বলেননি। শুধু দুটি নির্দেশ তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন। প্রথম, তাঁর মৃত্যুর পর শবদেহ আমি যেন দাহ করবার ব্যবস্থা করি। আর তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে সমুদ্রের জলে যেন তা ভাসিয়ে দিই। প্রতিবেশীদের সংস্কারের বিরুদ্ধে শহর বা গ্রামাঞ্চলে দাহ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমি এসপানিয়া থেকে ফার্নানদিনা যাবার পথে এই জাহাজ থেকেই তাঁর দেহ সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দিই। তাঁর দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল তাঁর একটি নিজের হাতে লেখা লিপি তাঁর দেশে পৌঁছে দেওয়া। পৌঁছে দেবার জন্যে আমায় উদ্বিগ্ন বা ব্যস্ত হতে নিষেধ করে তিনি শুধু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর এ অন্তিম লিপি যথাস্থানে পৌঁছে দেবার ভার নিতে একদিন একজন নিজে থেকেই এসে দেখা দেবে। আজ পর্যন্ত কেউ অবশ্য আসেনি।
কিছুটা সান্ত্বনার সুরে, ভবিষ্যতে হয়তো আসবে–বলে অতি কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে ঘনরাম নিজের পূর্বের প্রশ্নেই ফিরে গিয়েছিলেন।
জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এখন আমার ভাগ্যলিপিতে আর কী দেখছেন, বলুন।
আর—বলতে গিয়ে নীরব হয়ে সানসেদোর মুখ হঠাৎ অত্যন্ত বিষগ্ন গম্ভীর হয়ে উঠেছিল।
কী? চুপ করে গেলেন কেন? বলুন! দাবি করেছিলেন ঘনরাম।
কোনও গণনাই নির্ভুল হতে পারে না। একটু যেন মাপ চেয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে বলেছিলেন সানসেদো, আমার তো নয়ই। তাই যা বলছি তা ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেবেন না। আমার নিজেরই শোনাতে মন চাইছে না।
তবু অসংকোচে বলুন। জেদ ধরে বলেছিলেন ঘনরাম, ভাগ্যের সঙ্গে আমার অনেক দিনের লড়াই। তার চোরা চক্রান্তগুলো আগে থাকতে জানলে বরং কিছু সুবিধেই হতে পারে।
আপনার সমস্ত ভবিষ্যৎ স্পষ্ট করে দেখা আমার বিদ্যার বাইরে। ধীরে ধীরে বলেছিলেন সানসেদো, আমি আবছা আলোছায়ায় সেখানে যা দেখতে পাচ্ছি তাতে চোখ ধাঁধাবার মতো আশ্চর্য সাফল্যই বেশি। অন্ধকার খাদে আর উজ্জ্বল চূড়ায়। নামাওঠার হতাশায় উল্লাসে দোলানো বিচিত্র আপনার জীবন। অজানা নিরুদ্দেশে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে, রক্তের নদী বইবে আপনার সামনে, সোনায় বাঁধানো পথ দিয়ে আপনি হাঁটবেন, আপনাকে বরমাল্য দেবে এক রাজকুমারী এমন এক অচিন রহস্যের দেশে পৃথিবীর কেউ আজও যা জানে না, কিন্তু তার আগে, তার আগে
সানসেদো আবার দ্বিধাভরে থেমেছিলেন। কিন্তু ঘনরাম তাঁকে থামতে দেননি।
তার আগে কী বলুন।ঈষৎ তীব্র দাবি করেছিলেন।
তার আগে আমার গণনায় ভাগ্যের অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতম আঘাতে আপনাকে একেবারে অতলে তলিয়ে যেতে দেখছি। দেখছি অমঙ্গলের একটা ভয়ংকর কালো ছায়া গাঢ় হয়ে আপনার জীবনে নামছে।
সানসেদো আর কিছু বলতে পারেননি। একটা চাপা হাসির হিল্লোল দমকা হাওয়ার মতো কামরাটার ভারি আবহাওয়ার গাম্ভীর্যে একটা ঝাপটা দিয়েই থেমে গেছল।
ও, তিয়েন-এর পর সিয়েন্তো মুচো শুনে ঘনরাম মুখ ফিরিয়ে দেখেছিলেন, সেনোরা আনা যেন ভুল করে ঘরে ঢুকে পড়ার লজ্জায় থমকে থেমে গেছে।
খুব যেন একটা জরুরি একটা কথা বলতে এসে বাইরের লোকের উপস্থিতিতে তিয়েন বলে যাঁকে কাকার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে তাঁকে বলবে কি না ঠিক করতে পারছে না।
একবার সানসেদো আর একবার তাঁর নিজের দিকে আনাকে চঞ্চলভাবে তাকাতে দেখে ঘনরাম নিজেই উঠে পড়ে ঘর থেকে বিদায় নিতে চেয়েছেন।
না, না, সে কী! আপনার তো এখনও খাওয়াই হয়নি! আপত্তি করতে বাধ্য হয়েছেন সানসেদো।
এর পরও সেনোরা আনা ঘরে দাঁড়িয়ে থাকাতে পরিচয় না করিয়ে দিয়েও পারেননি।
এটি আমার সাব্রিনা সেনোরা আনা, বলেছেন সানসেদো, নিজের ভাগ্নী না হলেও তার চেয়ে কম কিছু নয়। আর ইনি হলেন সেনর দাস।
আনা শুধু এইটুকুর জন্যেই অপেক্ষা করছিল বোধহয়। পরিচয়ের পর প্রথম যথাবিহিত সৌজন্য বিনিময়টুকু সারতে না সারতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছে, ওঁর নাম আমি জানি। আজ ওঁর খেলাও দুবার উঁকি দিয়ে দেখেছি, তিয়েন! জাহাজে এখন সকলের মুখে তো শুধু ওঁরই কথা!
ঘনরাম সত্যিই একটু অস্বস্তি বোধ করেছেন এ উচ্ছ্বাসে। সেটা কাটাবার জন্যে ঠাট্টার সুরে বলেছেন জুয়াখেলায় বাহাদুরি দেখিয়ে একটা মস্ত কীর্তি রেখেছি তাহলে!
জুয়াখেলায় বাহাদুরি কেন! আনা প্রতিবাদ করেছে, তিয়েনই বলুন না, হারজিৎ এমন সমানভাবে নেওয়ার মতো জুয়াড়ি ক-জন উনি জীবনে দেখেছেন।
তা বেশি দেখিনি বটে! স্বীকার করেছেন সানসেদো।
এ প্রসঙ্গ তাঁর সামনে চলতে দিতে ঘনরাম আর চাননি। এবার খাবার প্লেট সরিয়ে রেখে উঠে পড়ে বলেছেন, আমার খাওয়া হয়ে গেছে কাপিন। আপনারা যদি অনুমতি করেন, আমি যেতে পারি এখন।
কেন, আপনি যাবেন কেন! আনা এর মধ্যেই সহজ হয়ে গেছে বহুদিনের পরিচিতের মতো।
কিছু একটা কথা তিয়েনকে বোধহয় আপনার বলবার ছিল। স্মরণ করিয়ে। দিয়েছেন ঘনরাম, আপনাকে ঘরে ঢুকতে দেখে অন্তত তা-ই মনে হয়েছিল।
হ্যাঁ, কী বলতে এসেছিলে, আনা? সানসেদোও জিজ্ঞাসা করেছেন, এঁর সামনে। বলতে যদি বাধা না থাকে তো বলো।
না, ওঁর সামনে বাধা কী! আনা ঘনরামকে যেন অন্তরঙ্গের মধ্যে ধরে বলেছে, আমি একটা ষড়যন্ত্রের কথা ভেবেছি। তাই হাসতে হাসতে ঢুকছিলাম।
ষড়যন্ত্রের কথা ভেবে হাসতে হাসতে আসছিলে! সানসেদো বিমূঢ়ভাবে আনার দিকে তাকিয়েছেন।
হ্যাঁ, ষড়যন্ত্র।আনা উচ্ছ্বসিত ভাবে বলেছে, শোনোই না ষড়যন্ত্রটা—তুমিও খুশি হয়ে হাসবে।
