জাহাজ স্পেনে পৌঁছোবার অনেক আগেই সোরাবিয়া তা ভুলে গেছে।
শুধু ভোলেনি, ঘনরামের বিরুদ্ধে হিংসায় আক্রোশে সে প্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে।
তা হলেই বা ক্ষিপ্ত, শুধু সোরাবিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে কতখানি ক্ষতি আর করতে পারত ঘনরামের! বড়জোর একদিন খোলা তলোয়ার নিয়ে এ বিরোধের মীমাংসা করতে হত, তার বেশি কিছু নয়।
কিন্তু ঘনরামের ভাগ্যাকাশের কুগ্রহ তার চরম লাঞ্ছনার জন্যে অনেক বেশি জটিল ফাঁসের রশি তখন গোপনে টানছে।
সেদিন রাত্রে একসঙ্গে বসে খাওয়ার সময় কাপিন সানসেদো তাঁর গণনায় সেই ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন।
খেতে বসে বিশেষ কিছু ভূমিকা না করে সানসেদো সোজাসুজি সোরাবিয়ার আংটির কথাটা তুলেছিলেন। বলেছিলেন, আংটিটা আমায় দেখতে দিলেন না কেন বলুন তো!
কী আর দেখতেন ওই একটা সাধারণ আংটিতে! ঘনরাম প্রসঙ্গটা চাপা দিতে চেয়েছিলেন।
কী দেখতাম! সানসেদো চাপা দিতে না দিয়ে বলেছিলেন, দেখতাম হয়তো পাথর নয়, আংটিটায় একটা ঈষৎ রঙিন আয়নার কাচই কৌশলে বসানো। আংটিটা যার আঙুলে থাকে, তাস বিলোবার সময় চেষ্টা করলে বিলোনো তাস এই কাঁচের ছায়া থেকে সে চিনে নিতে পারে।
ঘনরাম কাপিতানের দিকে চেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বেশ একটু কৌতুকের সুরে বলেছিলেন, যে-আংটি সমুদ্রের জলে ড়ুবে গেছে তা নিয়ে আর জল্পনা কল্পনায় লাভ কী, কাপিন! আংটি ড়ুবলে হয়তো মানুষটা ভাসতে পারে।
এবার কাপিনও হেসে উঠে বলেছিলেন, ঠিকই বলেছেন, সেনর দাস।
তারপর হঠাৎ ঘনরামের ডান হাতটা টেনে নিয়ে টেবিলের ওপর চিত করে রেখে বলেছিলেন, মাপ করবেন, সেনর দাস! মানুষ সম্বন্ধে অন্যায় অশোভন কৌতূহল আমার নেই, কিন্তু দু-একজনকে দেখলে তাদের ভাগ্য জানবার আগ্রহ আমি চাপতে পারি না। আপনার সঙ্গে পরিচয় হবার পর কোনও ব্যক্তিগত প্রশ্ন আমি যে করিনি তা আপনি ভাল করেই জানেন। ও সব বিবরণে আমার প্রয়োজন নেই। আপনাকে দেখা মাত্র কিন্তু আমার মনে হয়েছে আপনার ভাগ্যলিপি অদ্ভুত কিছু হতে বাধ্য। আপনার হাতটা তাই একটু দেখতে চাই।
হাতের রেখার ভাষা আপনি জানেন? ঘনরামের কথায় কৌতূহলের চেয়ে কৌতুকই বেশি প্রকাশ পেয়েছিল।
কিন্তু সানসেদোর প্রথম কথাতেই তিনি চমকে উঠেছিলেন। যেটুকু পড়তে পারি, মনে করতাম, বেশ গম্ভীরভাবে বলেছিলেন সানসেদো, তা তো এখন ভুল মনে হচ্ছে!
তার মানে? সত্যি কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন ঘনরাম।
মানে, আমার বিচার ঠিক হলে বুঝতে হয় যে তিন সমুদ্র পার হয়ে চতুর্থ সমুদ্রও আপনি দেখবেন। সবিস্ময়ে ঘনরামের দিকে চেয়ে বলেছিলেন সানসেদো।
পুরোপুরি না বুঝলেও যেটুকু বুঝেছেন তাতেই ভেতরে ভেতরে চমকে উঠেছিলেন ঘনরাম। মনে মনে তখন তিনি শিশুকালের কালাপানি থেকে আরবসাগর আর তারপর লিসবনে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হতে আসার সময় আফ্রিকার উপকূলের সেই অসীম সাগর, পরে যা আতলান্তিক বলে জেনেছেন, তা গুনে ফেলায় বিস্মিত হয়ে উঠেছেন সানসেদের গণনা শক্তিতে। কিন্তু সে বিস্ময় গোপন করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এ তো হেঁয়ালির মতো শোনাচ্ছে। অর্থ কী এ কথার?
অর্থ কী আমিও তা জানি না। সরলভাবে স্বীকার করেছিলেন কাপিন সানসেদো। সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া যাদের নিয়তি তাদের হাতে যে চিহ্ন থাকে তাই দেখেই যা বলবার বলেছি।
এ গণনা আপনি শিখলেন কোথায়? বিশেষ আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ঘনরাম।
শিখেছি আমাদের এসপানিয়াতেই। তবে সুদুর এক দেশের আশ্চর্য এক জ্যোতিষীর কাছে।
সুদূর দেশের আশ্চর্য এক জ্যোতিষী! ঘনরাম অবাক হয়ে সে দেশের নাম জানতে চেয়েছিলেন।
নাম তার ইন্ডিয়া! গর্বভরে বলেছিলেন সানসেদো, একদিন অ্যাডমিরাল কলম্বাস এই দেশ খুঁজতেই অকূল সাগরে পাড়ি দিয়েছিলেন এবং এই ভ্রান্ত ধারণা নিয়েই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন যে ইন্ডিয়া যার অংশ সেই এশিয়া মহাদেশের পূর্ব উপকূলই তিনি আবিষ্কার করেছেন। সে দেশ আবিষ্কারের গৌরব কিন্তু তাঁর বা আমাদের দেশের কারও অর্থাৎ কোনও এসপানিওল-এর প্রাপ্য হয়নি। সে গৌরব পেয়েছে পোর্তুগিজ ভাস্কো-দা-গামা। সেই ভাস্কো-দা-গামার আবিষ্কৃত সমুদ্রপথে সে দেশ থেকে আশ্চর্য এক মানুষকে পোর্তুগিজদের জাহাজে এদেশে ক্রীতদাস হিসাবে এনে বিক্রি করা হয়। ভাগ্যক্রমে এক ক্রীতদাসের বাজারে তাঁকে দেখে আমার গভীর কৌতূহল ও শ্রদ্ধা জাগে। বৃদ্ধ দুর্বল মানুষ। ক্রীতদাস হিসাবে তাঁকে খাটিয়ে নেবার সুযোগ নেই বললেই হয়। অত্যন্ত সুলভেই তাই তাঁকে কিনে আমি মুক্তি দিই।
ক্রীতদাসকে আপনি মুক্তি দেন। ভেতরে ভেতরে অভিভূত হলেও বাইরে একটু অপ্রসন্ন বিস্ময়ের ভান করেছিলেন ঘনরাম।
পারলে দিই। কিন্তু কতটুকু আর আমার ক্ষমতা! কোনওরকম আস্ফালন না। করেই বলেছিলেন কাপিন সানসেদো, স্বাধীনভাবে তাঁকে নিজের দেশেই ফেরত পাঠাতে পারব এই আশা করেছিলাম। কিন্তু তিনি নিজেই আমায় সে চেষ্টা করতে মানা করেছিলেন। বলেছিলেন, এই দেশেই তাঁর মাটি কেনা আছে। সে নিয়তি খণ্ডাবার চেষ্টা বৃথা। জীবনের শেষ কটা দিন আমার মেদেলিন শহরের বাড়িতেই তিনি কাটান। তাঁর আশ্চর্য গণনার বিদ্যা সামান্য একটুমাত্র শেখবার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম। তাঁর কাছেই শুনি তাঁদের দেশে জ্যোতিষের নামও সামুদ্রিক বিদ্যা।
সানসেদোর প্রতি প্রথম থেকেই ঘনরামের মনে একটা শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জেগেছিল। আরও বর্ধিত শ্রদ্ধা নিয়ে ঘনরাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন, নিজের সম্বন্ধে কিছু কি তিনি বলে গিয়েছেন।
