দু-জনের তাস উপুড় করে রাখা।
আর তাস টানবেন নাকি, সেনর? বিদ্রূপের সুর ছুঁইয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন ঘনরাম।
সোরাবিয়ার মুখচোখ লাল হয়ে উঠেছে তখন। কপালের ওপর একটা শিরা স্পষ্টই দপদপ করে কাঁপছে। একবার ঘনরামের সামনে উপুড় করে রাখা তাসটার দিকে, একবার তাঁর মুখের দিকে চেয়ে কী যেন বোঝবার চেষ্টা করে কিছুতেই সে মনঃস্থির করতে পারেনি।
কী, সেনর সোরাবিয়া? বিঁধিয়ে বলেছেন ঘনরাম, হঠাৎ যেন বড় বেশি সাবধানী হয়ে পড়লেন! আগে তো চটপট দান চুকিয়ে ফেলছিলেন!
নাবিকরাও কেউ কেউ একথায় হেসে উঠেছে। সেই সঙ্গে তরল জলতরঙ্গের মতো একটা মৃদু হাসির ঝংকার শোনা গেছে।
এবার ঘনরাম মুখ তুলে তাকিয়ে দেখেছেন। হ্যাঁ, আর কারও নয় হাসিটা, সেনোরা। আনারই। এ উত্তেজনার টান কাটাতে না পেরে ডেকে বেড়াবার ছলেই বৃদ্ধা ঝিকে নিয়ে তাদের আসরের পাশ দিয়ে উঁকি দিয়ে যেতে গিয়ে নিজেকে সে সংবরণ করতে পারেনি।
সারাবিয়ার কানেও সে ঝংকার গেছে, তবে মধু নয়, তরল বিষের মতো। সেনোরা আনার চকিত দৃষ্টির মুগ্ধতাটুকু কার দিকে যে ফেরানো ওই অবস্থাতেই তার চেয়ে বেশি কেউ বোধহয় লক্ষ করেনি।
কিন্তু আর দ্বিধাভরে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলে না। মনঃস্থির এবার করতেই হয়। যা টেনেছে তারই ওপর ভরসা করে শক্ত হয়ে থাকতে সাহস করেনি সোরাবিয়া। প্রায় কম্পিত হাতে আর একটা তাস টেনেছে।
চেয়ে দেখেছে ঘনরামের দিকে তার মতলব বোঝবার জন্যে।
ঘনরামের মুখ কিন্তু এখন মুখোশ, গাম্ভীর্যের নয়, বিদ্রূপের বাঁকা কৌতুকের। সে মুখোশের তলায় ঘনরামের মনের খবর একেবারে লুকোনো।
কী করবেন এবার? কাপিন সানসেদো জিজ্ঞাসা করেছে ঘনরামকে।
কিছুই করব না! সেই মুখোশের মতো মুখেই বলেছেন ঘনরাম, যদি চান তো আমাদের ভালিয়েন্তে কাবালিয়েরো তাঁর প্রাপ্য শেষ তাসটাও টানতে পারেন।
তাই টেনেছে সোরাবিয়া দাঁতে দাঁত চেপে। আর দু-জনের তাস চিত করবার পর দেখা গেছে তাতেই সর্বনাশ হয়ে গেছে।
ঘনরামের একটিমাত্র টানা তাস বেশ বড়ই ছিল, কিন্তু সোরাবিয়ার প্রথম দুটো তাস মিলে তাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল দামে। তিনবারের বার টানা তাসটি টেনেই সোরাবিয়া সে ভাল হাতটা পচিয়ে দিয়েছে।
নাবিকেরা চিৎকার করে উঠেছে আনন্দে। কাপিন পর্যন্ত নিজের আনন্দটা গোপন করতে পারেননি। শুধু পারিবাবাকে পেছন থেকে বেশ একটু জোরে জোরে পা ফেলে চলে যেতে দেখা গেছে। তিনি এতক্ষণ এই পাপের সংস্পর্শে ছিলেন এইটেই আশ্চর্য।
উপুড় করা তাস চিত করে ফেলার পর সোরাবিয়া কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো একদৃষ্টে সেগুলোর দিকে চেয়ে ছিল। নাবিকরা তখন কে কী উল্লাস প্রকাশ করেছে তা লক্ষ করবার হুঁশই তার ছিল না।
তারপর ঘনরামকে আংটি দুটো নিজের দিকে টেনে আনতে দেখে গায়ের সমস্ত হিংস্র জ্বালাটা তাসগুলোর ওপরই ফলিয়ে সেগুলো টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে সে উঠে পড়তে গেছে।
ও কী! উঠছেন কী, সেনর সোরাবিয়া! কাপিন সানসেদো তাকে বাধা দিয়ে বলেছেন, খেলা কি এখনই শেষ নাকি?
উনি বোধহয় আর আমার দৌড় দেখতে চান না! কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো চিপটেন কেটেছেন ঘনরাম।
সোরাবিয়াকে মুখোনা কালো করে আবার খেলতে বসতে হয়েছে। নজর তাঁর তখন নিজের আংটিটার দিকেই। ঘনরাম নিজের আংটির সঙ্গে সেটা কাছের দিকে টেনে আনলেও কোনওটাই কিন্তু আঙুলে আর পরেননি।
একটু বেশ অদ্ভুতভাবেই সোরাবিয়ার দিকে চেয়ে থেকে বলেছেন, আপনার আংটির পয়টা না নিয়েই ভাগ্যের চাকা ঘঘারে কিনা দেখা যাক।
তা ভাগ্যের চাকা ধীরে ধীরে সত্যিই ঘুরে গেছে। কাগজে লেখা সোরাবিয়ার লাভের হিসেব নামতে নামতে সত্যিই শূন্যে গিয়ে ঠেকবার পর হঠাৎ ঘনরামই তাসটা ঠেলে দিয়ে বলেছেন, যাক, আমাদের পাওনা দেনা কারও কাছেই কারও কিছু আর নেই। এইখানেই সুতরাং দাঁড়ি টানা যাক। শুধু আপনার এই আংটিটা–
ঘনরাম সোরাবিয়ার আংটিটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে যা বলতে যাচ্ছিলেন তা তক্ষুনি আর বলতে পারেননি। কাপিন সানসেদো আগেকার খেলা এইভাবে মোড় ঘুরে যাওয়ার পর থেকেই ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিলেন। ঘনরাম আংটিটা তুলতেই সেদিকে ব্যস্তভাবে হাত বাড়িয়ে সন্দিগ্ধ স্বরে বলেছেন, দেখি একবার আংটিটা!
ঘনরাম কিন্তু আংটিটা সানসেদোকে দেননি। হাতটা সরিয়ে নিয়ে হেসে বলেছেন,
কাপিন, এ আংটির জাদু আর পয় বড় বেশি। আপনার মতো লোককেও জুয়ায় টানতে পারে। তার চেয়ে এটিকে সবার নাগালের বাইরে রাখাই ভাল।
ঘনরাম তারপর যা করেছেন সকলে তাতে তাজ্জব! হাঁ হাঁ করে ওঠা সত্ত্বেও ঘনরাম ডেক-এর ওপর থেকে ছুঁড়ে আংটিটা সমুদ্রের জলে ফেলে দিয়ে সেখান থেকে উঠে চলে গেছেন আর একটি কথাও না বলে।
সোরাবিয়ার মাথা তখন নিজের অজান্তেই বুঝি একটু নিচু হয়ে গেছল। দৃষ্টিটাও কেমন বিমূঢ়। কাপিন সানসেদো আর সেনর সালাজার নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেছেন।
নাবিকেরা এ রেষারেষির জুয়া যে যার নিজের মতো বুঝে উত্তেজিতভাবে আলোচনা করতে করতে চলে যাবার পর নিজে উঠে পড়ে কাপিন শুধু বলেছেন, কাবালিয়েরো কাকে বলে আজ দেখবার সৌভাগ্য হল! কী বলেন, সেনর সোরাবিয়া?
সোরাবিয়া কোনও জবাব দেয়নি।
আশা করি আজকের কথা কেউ আমরা ভুলব না, বলে কাপিতান সেনর। সালাজারের সঙ্গে চলে গেছেন।
০৪. ভুলতে বারণ করেছিলেন
ভুলতে বারণ করেছিলেন কাপিন সানসেদো।
