দাঁতে দাঁত চিবিয়ে সে বলেছে, আমায় সুযোগ দেবার জন্যে ব্যস্ত হবেন না। আপনার কতখানি দৌড় তাই দেখিয়ে যান।
তাহলে একটা প্রস্তাব করি, সেনর সোরাবিয়া। একটু যেন কৌতুক মুখে ফুটিয়েই ঘনরাম হঠাৎ নিজের হাতের আংটিটা টেবিলের ওপর ফেলে দিয়ে বলেছেন, হারজিতের হিসেব যা লেখা হচ্ছে তা তো খেলার শেষে শোধ হবেই, কিন্তু শুধু ওই লেখালেখির বদলে একবার চাক্ষুষ হারজিতের খেলা হোক। আমার এই আংটি রইল বাজি আপনার হাতের ওই আংটির বিরুদ্ধে। তিন দান খেলায় দু-দান যে জিতবে দুটো আংটিই তার।
না, আংটির খেলা খেলতে আমি বসিনি! গজরে উঠেছে সোরাবিয়া, যা ঠিক। হয়েছে আমি সেই দশ পেসোর খেলাই খেলব।
ও, দশ পেসোর চেয়ে আংটি খোয়াবার ভয় আপনার তাহলে বেশি, সেনর সোরাবিয়া? মিছরির ছুরির মতো গলায় বলেছেন ঘনরাম, আপনারটার কথা জানি না, কিন্তু আমার আংটিটার দাম দশ পেসো-দে-অরো-র অন্তত পাঁচ গুণ। কাপিন সানসেদো কি আপনার বন্ধু সেনর সালাজারকেই পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।
সানসেদো ঘনরামের মুখের কথা খসতে না খসতেই আংটিটা হাতে তুলে নিয়েছিলেন। ভাল করে পরীক্ষা করে তিনি সালাজারের হাতে তা দিয়ে বলেছেন, আপনিও দেখুন, সেনর সালাজার। এ আংটির শুধু পান্নাটারই দাম অন্তত পঞ্চাশ পেসো।
সালাজার কাপিন সানসেদোর কথায় সম্পূর্ণ সায় দিয়েছে। সায় দেওয়াটা আশ্চর্য কিছু নয়। আংটিটা আজেবাজে সস্তা কিছু নয়, সত্যিই দামি। মেক্সিকো থেকে আসবার সময় ঘনরামকে এই আংটিটই উপহার দিয়েছিল ডোনা মারিনা। বলেছিল, তোমাকে নিজের ভাই-এর মতোই দেখেছি, গানাদো। বোনের এই উপহারটুকু তোমায় নিয়ে যেতেই হবে।
সাত সমুদ্র পারের এই পাতানো বোনের স্নেহের পরিচয়ে সত্যিই সেদিন চোখে জল এসেছিল ঘনরামের।
আজ তারই দেওয়া আংটি বাজি ধরার সময় মনটা বিদ্রোহ করে উঠেছিল একবার। কিন্তু তারপর নিজেকে বুঝিয়েছিল—এ ছাড়া উপায় নেই বলে।
এদিকে সানসেদো শুধু নয়, সমস্ত নাবিকরা পর্যন্ত ঘনরামের পক্ষ নিয়ে তখন। আংটির বাজি সোরাবিয়াকে দিয়ে না ধরিয়ে ছাড়বে না।
কাপিন তো রেগে উঠেই বলেছেন, কী রকম জুয়াড়ি আপনি! জুয়ায় তালঠোকার জবাব দেওয়াই তো কাবালিয়েরো-র লক্ষণ বলে জানি। বিশেষ দাস যখন আপনাকে সে জবাব দিয়েছে।
আর নারাজ হওয়া সোরাবিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়নি। রাগে ফুলতে ফুলতে সে বাঁ-হাতের অনামিকা থেকে আংটিটা খুলে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছে।
এ আংটিটাও একেবারে ফেলনা না হলেও ঘনরামের আংটির চেয়ে যে অনেক। নিরেস তা পাশাপাশি দুটো আংটির চেহারা দেখেই নেহাত গোলা লোকের কাছেও ধরা পড়বে। সোরাবিয়ার আংটির পাথরটা একটু যা বড়, কিন্তু ঘনরামের আসল পান্নার কাছে তা সস্তা কাঁচের শামিল।
এত হারের পর এ দামি জিনিসটা তার চেয়ে খেলো আংটির বিরুদ্ধে বাজি রাখাটা ঘনরামের আহাম্মুকি বলেই মনে হচ্ছিল কাপিন সানসেদোর। কিন্তু জুয়াড়িদের মতিগতিই আলাদা। দুই-এ দুই-এ চারের হিসেব মানলে তারা ক-টা খুঁটির চাল কি তাসের পড়তার ওপর তাদের সর্বস্ব জলাঞ্জলি দিতে তৈরি থাকবে কেন?
খেলা এতক্ষণ যথেষ্ট জমেছিল। কিন্তু এইবার যারা দেখছে তাদেরও যেন নিশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড় হয়েছে।
তাসের এ প্রিমিয়েরো খেলা পোর্তুগালের আমদানি। অজানা মহাদেশ আবিষ্কারের পর যারা সেখানে যশ আর ঐশ্বর্যের ললাভে প্রাণ তুচ্ছ করে যায় তাদের মধ্যে এ খেলার চল তখন দিন দিন বাড়ছে। য়ুকাটানের জঙ্গলে জান দিতে দিতে বেঁচে এসে সেখানকার সমস্ত রোজগার আর লুঠ এক রাত্রের প্রিমিয়েরোতে উড়িয়ে দিয়েছে এমন জুয়াড়ি কাবালিয়েরোর তখন অভাব নেই।
মোক্ষম সময়ে তাসের ভেতর দিয়ে ভাগ্য কী মুখ দেখাবে, তার ওপরই এ খেলার হার জিৎ।
প্রথম খেলা রুদ্ধশ্বাসে দেখতে হয়েছে সবাইকে। এক একটি তাসের টানে ভাগ্য একবার যেন ঘনরাম একবার সোরাবিয়ার দিকে হেলেছে।
শেষপর্যন্ত জয় হয়েছে সোরাবিয়ার।
তারপর দ্বিতীয় খেলা। এ খেলায় হারলেই ডোনা মারিনার উপহারের চরম অপমান তো বটেই, শেষ কড়ি দিয়ে জুয়ার দেনা শোধ করে একেবারে ফতুর হতে হবে, ঘনরাম তা বুঝেছেন।
তবু বুকে যেন তাঁর এখন নতুন সাহস আর বিশ্বাসের জোর। ভাগ্য চরম বেইমানি করলে তিনি হারবেন না এ যেন তিনি জানেন।
সত্যিই দ্বিতীয় খেলায় ঘনরামের জিৎ হয়েছে। জিৎ হয়েছে সোরাবিয়ার খেলার ভুলে এইটেই আশ্চর্য ব্যাপার। এতক্ষণের দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের ভিত হঠাৎ তার নড়ে গিয়েছে। দোনামোনা হয়ে চালের ভুল করেছে সে। তাস টেনে আগের মতো নির্ভুল আন্দাজে তার দান বুঝে উলটে রাখবার সাহস তার হয়নি। পাকা তাসের হাত কাঁচা করে দিয়েছে নিজেই বেশি তাস টেনে।
সোরাবিয়ার হঠাৎ এই পরিবর্তনে অবাক হলেও দর্শকরা যেন তার পরাজয়ে খুশি বলে মনে হয়েছে।
সেটা হয়তো পরাজিতের প্রতি সাধারণের স্বাভাবিক সহানুভূতি, হয়তো সোরাবিয়ার দম্ভ আর আস্ফালনের বিরুদ্ধে আক্রোশ।
এবার তৃতীয় খেলা।
সোরাবিয়ার চোখ দুটো যেন ছুরির ফলা হয়ে ঘনরামকে বিদ্ধ করতে চায়।
ঘনরামের মুখে কিন্তু এবার একটু বিদ্রূপের হাসি।
আপনার আংটিটা খুব পয়া—তাই না, সেনর সোরাবিয়া? সরলতার ভান করে জিজ্ঞাসা করেছেন ঘনরাম।
সোরাবিয়া জবাব না দিয়ে চোখের দৃষ্টিতে ছুরি চালিয়ে তাস টেনেছে।
তাস টেনেছেন ঘনরামও।
