চোখে কম দেখেন! পাদরিবাবার সঙ্গে আর সবাইও অবাক হয়ে তাকিয়েছে ঘনরামের দিকে।
পাদরিমশাই বলেছেন, কথাটা যে বুঝতে পারলাম না, বাছা।
না, আমি বলছিলাম, ঘনরাম বুঝিয়ে বলেছেন, চোখে কম না দেখলে তিনি দশ নোনার পেসোও যেমন, এক রুপোর পেসোও তেমনই স্পষ্ট দেখতে পান। সে চাঁদির পেসোর জুয়ার সময় তাঁর হয়ে মাল্লাদের পাপের কথা শোনাতে আপনি কেন আসেননি তাই ভাবছিলাম।
সবাই হেসে উঠেছে। পারিবাবা খেপে গিয়ে একেবারে অন্যমূর্তি ধরে গালাগাল। দিয়েছেন, তুই! তুই পাষণ্ড! জার্মানির সেই শয়তানের দূত নাস্তিকটার চেলা নিশ্চয়। চিরকাল নরকে পচে মরবি!
জার্মানির শয়তানের দূত মানে অবশ্য মার্টিন লুথার। তাঁর ধর্মের স্বাধীনতার আন্দোলনকে যে কোনও ছুতোয় শাপান্ত করে না, দক্ষিণ ইউরোপে তখন এমন ক্যাথলিক নেই।
পাইলট সানসেদো নিজে এসে না থামালে পারিবাবাকে ঠাণ্ডা করা সেদিন শক্ত হত।
সানসেদোও কিন্তু দু-জনকে অত চড়া বাজি ধরে না খেলতে বলেছেন। নাবিক সৈনিকদের জুয়া খেলতে মানা করা মিথ্যে, তিনি জানেন। জীবন নিয়েই যারা জুয়া খেলছে তারা দুটো পয়সা লোকসানের কী পরোয়া করে!
তবে খুব বেশি চড়া দানের জুয়ায় বেশির ভাগ কিছু-না-কিছু কাজিয়া কেলেঙ্কারি হয়ই। সে-কেলেঙ্কারি রক্তারক্তি পর্যন্ত গড়ায়। তাঁর নিজের জাহাজে সেটা তিনি চান না। বিশেষত কর্টেজ যাকে খাতির করে পৌঁছে দেবার নির্দেশ দিয়ে চিঠি দিয়েছেন তার প্রতি সানসেদোর একটা দায়িত্ব আছে।
ঘনরামকেই তাই তিনি অনুরোধ করেছেন বাজিটা একটু নামিয়ে ধরতে।
ঘনরাম হেসে বলেছেন, কত নামিয়ে ধরব বলুন! দশ থেকে পাঁচ? ভাগ্য যদি বেঁকে দাঁড়ায় তাহলে কাটা যে পড়বার সে এক কোপের জায়গায় দু কোপে পড়বে। এই তো! তাতে লাভ কিছু হবে কি? না, কাপিন, ছুড়ে দেওয়া দস্তানা আমি তুলে নিয়েছি। এ-জেদের লড়াইয়ে আমি মাথা নোয়াতে রাজি নই।
আমিও নই! গরম হয়ে বলেছে সোরাবিয়া।
দশ সোনার পেসো ফি দানে বাজি ধরেই খেলা শুরু হয়েছে। এমন খেলা দেখবার সুযোগ কালেভদ্রে হয়। মাঝি-মাল্লারা নিজেদের খেলা ফেলে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। পাদরিবাবা পর্যন্ত চলে যেতে পারেননি জায়গা ছেড়ে। কাপিন সানসেদো অপ্রসন্ন মুখে দু-জনের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থেকেছেন বেশ একটু উদ্বেগ নিয়ে।
সমস্ত মন খেলায় নিবদ্ধ করে রাখলেও এমন কিছুর আভাস ঘনরাম একসময় হঠাৎ পেয়েছেন যা সত্যিই তিনি ভাবতে পারেননি।
তাঁদের চারধারের ভিড় এক দিকে একবার একটু যেন ফাঁক হয়ে গেছে। মসৃণ রেশমি কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে মৃদু ঘর্ষণ লাগার একটা ফিসফিস শব্দ শোনা গেছে। সেই সঙ্গে একটা সুবাসের ঝলক।
সব আদব-কায়দা ভেঙে কে যে একবার উঁকি দিয়ে গেছে অনায়াসে বুঝলেও ঘনরাম মুখ তোলেননি।
তখন তিনি হারতে হারতে তাঁর পুঁজির প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছেন। কিন্তু তাঁর মুখ দেখে শুধু চোয়ালের একটু কাঠিন্য ছাড়া আর কিছু ভাবান্তর বোঝবার নেই।
ওদিকে সোরাবিয়া চোখ মুখ তখন সাফল্যের উল্লাসে জ্বলছে! উদ্ধত দম্ভে সে যেন ফেটেই পড়বে। অবজ্ঞাভরে তাস বাঁটতে বাঁটতে সে বলেছে, আর ক-দান খেলতে চান আমাদের ভালিয়েন্তে কাবালিয়েরো।
ভালিয়েন্তে কাবালিয়েরো অর্থাৎ সাহসী ভদ্রলোক বলে ব্যঙ্গটা এ সময়ে একেবারে বিষাক্ত হুলের মতো বিধেছে ঘনরামকে।
সাহসের তাঁর অভাব নেই, কিন্তু ভদ্রলোক থাকা আর খানিক বাদে কঠিন হয়ে পড়বে তাঁর পক্ষে বুঝতে পারছেন।
কাবালিয়েরো অর্থাৎ ভদ্রলোকের মান-মর্যাদা ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে, যদি জুয়ার। দেনা সে শোধ না করে। মনে মনে হিসেব করে ঘনরাম তখন বুঝেছেন যে, আর কয়েকটা দান এমনই তাসের পড়তা পড়লে জমে-ওঠা-দেনা তাঁর পক্ষে শোধ করা সম্ভব হবে না।
কেন যে ভাগ্য তাঁর এত বিপক্ষে তিনি বুঝতে পারছেন না। সোরাবিয়া ভালো খেলোয়াড় এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু খেলার দোষে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন হার হচ্ছে বলা ঠিক হবে না। আগাগোড়াই খারাপ তাস পাচ্ছেন বলেও নয়। কারণ তাস তিনি মাঝে মাঝে বেশ ভালই পাচ্ছেন। ভাল করে লক্ষ করে তিনি দেখেছেন সোরাবিয়ার তাস দেওয়ার সময়ই তাঁর হাত যে খারাপ পড়ছে এমন নয়। সুতরাং সোরাবিয়ার হাতের কারসাজি বলে সন্দেহ করবার কোনও কারণই তিনি পাননি। তাস ভাল-মন্দ দু-জনের। হাতেই আসছে। শুধু সোরাবিয়া ভাল তাসের বেলা তার লাভ ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা নিংড়ে আদায় করে খারাপ তাসের বেলা কেমন যেন পিছলে আগে থাকতে পালিয়ে যাচ্ছে।
এ কি শুধু তার ভাগ্য না তার সঙ্গে ফ্রানসিসকান পারিবাবার অভিশাপও কাঁধ লাগিয়েছে।
ঘনরামের হারে প্রায় সোরাবিয়ার সমান খুশি যদি কেউ হয়ে থাকেন তাহলে তিনি পাদরিবাবা। খেলা শুরুর আগেই তিনি ঘনরামের দিকে প্রায় ভস্ম করা-দৃষ্টি ফেলছিলেন। ঘনরামের গো-হারান-হার ক্রমশই বাড়বার পর সে দৃষ্টিতে ব্যাভেরিয়ার পাষণ্ড নাস্তিকের চেলার উপযুক্ত শাস্তিতে ধর্মের জয়ের উল্লাস ফুটে উঠেছে।
অন্য দর্শকেরা কিন্তু তখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। কাপিন সানসেদো সত্যিই শঙ্কিত হয়ে ঘনরামকে এবার খেলায় ক্ষান্ত হতে অনুরোধ করেছেন।
ঠিকই বলেছেন, কাপিন! ঘনরাম স্বীকার করেছেন, লাভ থাকতে থাকতে সেনর সোরাবিয়াকে এবার উঠে পড়ার সুযোগই দেওয়া উচিত।
নিজের বিদ্রূপের উপযুক্ত জবাবের বিচুটির জ্বালায় চিড়বিড়িয়ে উঠেছে সোরাবিয়া। তার পক্ষে সৌজন্যের আবরণ বজায় রাখাই শক্ত হয়েছে।
