তবু আলাপের ঔৎসুক্য, তা সে যারই হোক, অবজ্ঞায় উপেক্ষা করার শিক্ষা ঘনরামের নয়।
তিনি একটু হেসে বলেছেন, পেসোর গায়ে তো আমার নাম লেখা নেই। আছে স্বয়ং মহামান্য সম্রাটের ছাপ। সুতরাং ওটা আমার কি না বোঝবার মতো কোনও প্রমাণ পাচ্ছি না। এইটুকু শুধু বলতে পারি যে, আমার কোনও পেসো হারিয়েছে বলে এখনও আমি জানতে পারিনি।
আশ্চর্য তো! সত্যিই যেন বিব্রত হয়ে সোরাবিয়া এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে— আমার যেন স্পষ্ট মনে হল আপনি ওদিক থেকে চলে আসবার সময় ওটা গড়িয়ে পাটাতনের ধারে গিয়ে পড়ল।
তা সেটা আপনার থলি থেকেও তো পড়তে পারে? বলেছেন ঘনরাম সহজ পরিহাসের সুরে, আপনার নিজের পয়সাকড়ি গুনে দেখেছেন?
দেখিনি! সোরাবিয়াও সহজ হয়ে বলেছে, তবে দেখবার দরকার নেই। কারণ আমার কাছে স্পেনের এরকম কোনও মুদ্রাই নেই।
তাহলে আমার বা আপনার কারওই যখন নয়, তখন পেসোটা আমাদের পাইলট সানসেদোর কাছেই জমা দিন না। তিনি কার সম্পত্তি খোঁজ করে দিয়ে দেবেন।
তা-ই দেবেন, না নিজের থলে মোটা করবেন কে বলতে পারে? সোরাবিয়া হেসে উঠে আরও ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করেছে তার চেয়ে আপনার আমার কারওই যখন নয়, এটা নিয়ে একটা বাজিই ধরা যাক। ওই যে সাগরবাজটা আমাদের জাহাজের মাথার ওপর ডানা মেলে ভাসছে ওটা মাছ ধরতে কোন দিকে জলে ছোঁ মারবে, জাহাজের বাঁয়ে না ডাইনে, বলতে হবে। ঠিক যে বলতে পারবে এ পেসো-দে-অরো তার।
হিড্যালগো জোয়ানের স্বরূপটা বুঝে ফেলতে ঘনরামের আর দেরি হয়নি। তবু তাকে একেবারে নিরাশ না করে তালে তাল দিয়ে তিনি বলেছেন, ভালো কথা। কিন্তু পেসোটা যখন আপনিই কুড়িয়ে পেয়েছেন তখন প্রথম সুযোগটা আপনিই নিন।
আমাকেই নিতে বলছেন? সোরাবিয়া এরকম প্রস্তাব ঠিক বোধহয় আশা করেনি।
বেশি আপত্তি করলে ধরা পড়ার ভয় আছে বলেই বোধহয় একটু দ্বিধার ভাব দেখিয়েই সে নিজের অনুমান জানিয়েছে।
সেটা ভুল প্রমাণ হওয়ায় খুশিটা প্রায় চাপতে না পেরে বলেছে, এবার আপনার পালা সেনর।
আমার পালাটা বোধহয় বৃথাই গেল। ঘনরাম মুখে একটু আশাভঙ্গের ভাব ফুটিয়েছেন।
কেন? কেন? জিজ্ঞাসা করেছে সোরাবিয়া ব্যস্ত হয়ে।
কারণ আমাদের বাজি ধরার খবর বোধহয় ও পেয়েছে! মুখ টিপে একটু হেসে বলেছেন ঘনরাম, বিরক্ত হয়ে জুয়াড়িদের সংস্রব ছেড়ে বোধহয় চলেই যাবে তাই!
ঘনরামের গণনা নির্ভুল প্রমাণ হতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হয়েছে মাত্র। সাগরবাজটা ভাসতে ভাসতে হঠাৎ সবেগে ডানা নেড়ে দূর আকাশে উড়ে চলে গেছে!
আশ্চর্য ব্যাপার তো সেনর!—সোরাবিয়ার চোখে সত্যিকার সম্ভ্রম আর বিস্ময় এবার ফুটি-ফুটি করেছে—আপিন কি জাদু-টাদু জানেন নাকি?
না, জাদু জানি না। হেসে বলেছেন ঘনরাম, শুধু চোখ-কান একটু ভোলা রাখতে জানি।
সোরাবিয়ার মুখটা তবু হাঁ হয়ে আছে দেখে বুঝিয়ে বলেছেন, আমাদের জাহাজের গলুই-এ জলের ঢেউ-এর সাদা ফেনা আর দেখছেন? লক্ষ করেছেন যে পালগুলো ঢিলে হয়ে ঝুলতে শুরু করেছে? হাওয়া গেছে বন্ধ হয়ে? আমাদের জাহাজ প্রায় অচল। সাগরবাজ আর কী আশায় আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে। মাছের ললাভে সমুদ্রের এ সব পাখি আমাদের সঙ্গ দেয়। মে বাহবা! বাহবা! চমৎকার। সোরাবিয়া সত্যিই হাততালি দিয়ে তারিফ করে বলেছে, আমাকে রীতিমতো আহাম্মুক বানিয়ে ছেড়েছেন। এখন আমায় এমন শিক্ষা দেবার গুটি কে জানতে পারি? অধীন তার আগে নিজেই নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এ অধমের নাম সোরাবিয়া। কর্টেজ-এর অধীনে লড়াই করে মহামান্য সম্রাটের সেবা করার সঙ্গে নিজের ট্যাঁকও ভারী করে ফিরব আশা ছিল। সে আশা পূর্ণ হয়নি। এবার কোন নৌ-সেনাপতির সঙ্গে পরিচয় হবার সৌভাগ্য আমার হল যদি জানান।
ঘনরাম সোরাবিয়ার ছ্যাবলামিতে একটু হাসলেও তার সঙ্গে সুর মেলাননি! গম্ভীর গলাতেই বলেছেন, আপনাকে একটু হতাশ হতে হবে, সেনর সোরাবিয়া। নৌ-সেনাপতি তো নয়ই, জাহাজের একজন মাঝি-মাল্লাও আমি নই। সত্যি কথা বলতে গেলে মানুষ হিসাবে আমায় গণ্য না করলেও আমি কিছু মনে করব না। কারণ তাই আমার অভ্যাস আছে।
সোরাবিয়া এ ঘোরালো কথার দু পিঠের মানে অবশ্য বুঝতে পারেনি, বিনয়ের আর-এক প্যাঁচ ভেবে ঘনরাম কোথাকার লোক এবং আসলে কে, সে পরিচয় জানতে আরও উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
মুখে সে ব্যাকুলতা প্রকাশ করতে সে দ্বিধা করেনি। বিনয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বলেছে, সমুদ্র ও জাহাজের বিষয়ে আপনার অদ্ভুত হুশিয়ারি আর নজর দেখে আপনাকে নৌ-সেনাপতি ভাবা আমার যদি বেয়াদবি হয়ে থাকে মাপ করবেন। তবে আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্যই যখন হল তখন আপনাকে সম্বোধন করতে পারাটা বড় দুঃখের হবে এটুকু না জানিয়ে পারছি না।
সৌজন্যের জিলিপি প্যাঁচ আর না বাড়িয়ে ঘনরাম বলেছেন, পুলকিত হয়ে সসম্রমে সম্বোধন করবার মতো কেউ আমি কিন্তু নই। আমার নাম ঘনরাম দাস।
ঘনরাম দাস! সোরাবিয়ার একে স্প্যানিশ, তায় বাকদেবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন জিহ্বায় উচ্চারণটা লালাতেই যেন জড়িয়ে গেছে। স্পেনের এপার-ওপার মনের আঙুল বুলিয়েও এ ধরনের নামের উৎস খুঁজে না পেয়ে বেশ একটু বিমূঢ় হয়ে দাসকে দশ উচ্চারণ করে সে জিজ্ঞাসা করেছে, আচ্ছা দাস বললেন, কোথাকার দাস বলুন তো? ফার্নানদিনায় ওরকম পদবির একটি পরিবার আছে বলে যেন শুনেছি। কাস্তিল থেকে এসে তারা পদবিটা নাকি বেঁকিয়ে ওই রকম করেছে!
