কী বললেন? শিবপদবাবুই প্রথম তাঁর সন্দিগ্ধ বিস্ময় জ্ঞাপন করলেন, লাটুর ওপর কার কেন্ধু না কী!
লাট্ট নয়, ক্লান্টু! ধৈর্য ধরে বোঝালেন ঘনশ্যাম দাস, উচ্চারণটা জিভে আনা একটু শক্ত। ক্লান্টু হল একরকম নানারঙের ভাঁজ-দেওয়া পাগড়ি গোছের উষ্ণীষ, বাস্তবের স্বর্ণলঙ্কার অধীশ্বররা যা পরতেন।
আর, ওই কার কী কেঁউকু যা বললেন? মেদভারে বিপুল ভবতারণবাবু উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলেন।
কার কী কেঁউকু কি কেংকু নয়,, করুণাভরে সংশোধন করে দিলেন দাসমশাই, কথাটা হল কোরাকেন্ধু। কোরাকেন্ধু ছিল দুনিয়ার দুষ্প্রাপ্যতম পাখি। বোখারা সমরকন্দের সন্দিগ্ধ সমৃদ্ধতম বাদশার হারেমের সেরা সুন্দরীর চেয়ে কড়া পাহারায় সকলের চোখের আড়ালে তাদের পালন করা হত। সত্যিকার স্বর্ণলঙ্কার অধীশ্বরের মাথার উষ্ণীষ ক্লান্টু-তে গোঁজা হত তার দুটি পালক।
আপনার আদিপুরুষ ঘনরাম ওই কোরাকেন্ধু-র পালক গ্লান্টুর ওপর খুঁজে ভাগ্যের পাশা উলটে দিয়েছিলেন? কেন? কী করে? বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে ভক্তিভরে জিজ্ঞাসা করলেন কুম্ভোদর রামশরণবাবু।
তা বলতে গেলে ওখানেই তো থামা চলবে না! হাসলেন দাসমশাই, যে বিষ-ফলের গাছ পোঁতার ব্যাপারে কিছু ভাগ তাঁর ছিল, একদিন তা বেড়ে উঠে আকাশ-বাতাস বিষিয়ে তুলে ন্যায়ধর্মের টুটি যখন চেপে ধরে, তখন গোড়ায় কোপ দিয়ে তা শেষ করার চেষ্টায় কী ভূমিকা ঘনরামের ছিল তা পর্যন্ত বলতে হয়। কিন্তু সে যখনকার কথা তখনই বলা যাবে। ঘনরামের জীবনের নতুন পালার যা থেকে সূত্রপাত, ক্রীতদাস হওয়ার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েও ঘনরাম তাঁর স্বাধীনতা আবার কী করে খোয়ালেন, সেই করুণ বৃত্তান্তেই আগে ফিরে যাওয়া যাক। , এবার শিবপদবাবুরও কোনও আপত্তি দেখা গেল না।
ঘনরাম ঘটা করেই স্পেনে ফিরছিলেন। শুরু করলেন দাসমশাই। কর্টেজ সত্যিকার ভালবাসায় আর কৃতজ্ঞতায় তাঁর মুক্ত ক্রীতদাসকে উপহার হিসাবে যা দিয়েছিলেন, খানদানি স্প্যানিশ হিড্যালগোদেরও তা ঈর্ষার বস্তু।
সেই ঈর্ষাই জেগেছিল এক স্পেনের সৈনিকের মনে। ঘনরামের সঙ্গে একই জাহাজে সে দেশে ফিরছিল। কর্টেজ-এর আদি বাহিনীর নোক সে নয়। কর্টেজ-এর বিরুদ্ধে পাঠানো নার্ভেজ-এর দলেই মেক্সিকোতে এসে সে কর্টেজ-এর পক্ষ নেয়। বেশির ভাগ ট্রাসকালায় অন্য বাহিনীতে ছিল বলে ঘনরামকে আগে সে দেখেনি। সে নিজের উন্নতিও মেক্সিকোয় এসে এ পর্যন্ত তেমন কিছুই করতে পারেনি। সত্যিকার লড়াই বেশির ভাগ সে ফাঁকিই দিয়েছে। ঠিক প্রমাণ না পাওয়া গেলেও কর্টেজ-এর বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রে হয়তো আছে এই সন্দেহে তাকে এখন ফেরত পাঠানো হচ্ছে। যুদ্ধ না হোক, লুঠতরাজৈ সোরাবিয়ার উৎসাহ খুব। তাতে কিন্তু যা পেয়েছে সবই বলতে গেলে উড়িয়ে দিয়েছে জুয়া খেলে আর সাজপোশাকের বিলাসিতায়। সোরাবিয়ার ধারণা তার মত সুপুরুষ নেই। সুন্দরী মেয়েরা তাকে দেখলেই মূছা যায়।
জাহাজে ঘনরামের সঙ্গে ঠোকাঠুকি তার বেশি করে লেগেছে এই ব্যাপারে।
ঘনরামের সঙ্গে সোরাবিয়ার পরিচয় আগে ছিল না। জাহাজে একই যাত্রার সঙ্গী। হিসেবে দেখে চেহারায় সাজপোশাকে ঘনরামকে বেশ শাঁসালো কেউ বলেই মনে হয়েছে সোরাবিয়ার। সেই সঙ্গে জুয়ায় নামিয়ে ভাল করে নিংড়ে নেবার মতলবও মাথায় এসেছে।
ঘনরামকে স্পেনে ফেরার সে জাহাজে দেখলে কেউ-কেটা বলে ভুল করা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কর্টেজ-এর হুকুমে সম্মানিত অতিথির মর্যাদাই তাঁকে দেওয়া হয়েছে। সাজপোশাকে কথাবার্তায় চালচলনে ব্যবহারে সে মর্যাদার সম্পূর্ণ যোগ্য বলেই তাঁকে বোঝা গেছে। কর্টেজ ঘনরামকে বিদায় দেবার সময় পয়সাকড়ি ছাড়া যে সব সম্ভ্রান্ত সাজপোশাক সঙ্গে দিয়েছিল তাতে তাঁকে বেমানান লাগেনি।
সোরাবিয়া গোড়ায় একটু গায়ে পড়েই ঘনরামের সঙ্গে ভাব করেছে।
তখনকার দিনের পালতোলা মাত্র সত্তর টনের মাঝারি গোছের জাহাজ। একশো টনের জাহাজ হলেই সেকালে খুব বড় বলে গণ্য হবার যোগ্য হত। এখনকার তুলনায় মোচার খোলার মতো সে ছোট জাহাজের সংকীর্ণ খোলে যাত্রীদের পরস্পরকে এড়িয়ে চলাও শক্ত।
ঘনরাম এড়িয়ে যেতে যেমন চাননি তেমনই উৎসাহও দেখাননি কারও সঙ্গে নিজে থেকে আলাপ করার।
সোরাবিয়াই প্রথম একটা ছুতো বার করেছে তাঁর সঙ্গে আলাপ শুরু করার।
তখন সবে সকাল হয়েছে। ঘনরাম জাহাজের খোলা ডেকের নিচু রেলিং ধরে সামনের সমুদ্রের দিকে চেয়েছিলেন।
হঠাৎ একটু চমকে উঠেছেন কাছেই একজনের গলা পেয়ে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেছেন জাহাজের আর এক যাত্রী এক স্প্যানিশ হিড্যালগো ছোকরা মাথার টুপিটা খুলে অভিবাদনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাঁকেই কী যেন বলছে।
কথাগুলো প্রথমে বুঝতে একটু দেরি হওয়ার কারণ ছিল। হিড্যালগো ছোকরা একেবারে যাকে বলে রাজ-দরবারের কেতায় তাঁকে কুর্নিশ করে যা বলছে তা একটু অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত।
হিড্যালগো ছোকরা কুর্নিশ সেরে হাতে একটা স্প্যানিশ সোনার মুদ্রা বাড়িয়ে ধরে বলছে—মহামান্য সেনর কিছু যেন মনে না করেন। তাঁকে বাধ্য হয়ে বিরক্ত করতে হচ্ছে। এই পেসো-দে-অরোটি যেন সেনরের জামা থেকেই গড়িয়ে পড়ল মনে হচ্ছে। সেনর যদি একটু কষ্ট করে দৃষ্টিপাত করে এটি তাঁর কি না বলেন।
ঘনরাম পেসোটা দেখেই চালাকিটা ধরতে পেরেছেন। তখনও তাঁর সঙ্গে এভাবে মিথ্যে অজুহাত বানিয়ে আলাপ করার কারণটা বুঝতে পারেননি।
