ফার্নানদিনা ছিল কিউবার তখনকার নাম। ঘনরাম ফার্নানদিনায় তাঁর বংশ চালনা। করবার চেষ্টা দেখে মনে মনে হেসে বলেছেন, না ফার্নানদিনায় আমাদের বংশধররা। স্পেন থেকে আসেনি। আমরা যেখানকার সেইখানেই আছি ও থাকব বলেই আমার। বিশ্বাস। আমাদের ঘরানা কোথাকার যদি জানতে চান তাহলে তাম্রলিপ্তির নামই করতে হয়।
তাম্রলিপ্তি শুনেই শব্দটা উচ্চারণ করবার বা বোকা বনবার ভয়েই বোধহয় আর কিছু জিজ্ঞাসা করতে সোরাবিয়া সাহস করেনি।
মনে যদি একটু বিরক্তি কি জ্বালা থাকে বাইরে সৌজন্যের বিনিময় করে সোরাবিয়া তখনকার মতো চলে গেছে। আলাপের ছুতো যা দিয়ে করেছিল বাজি ধরা সেই স্বর্ণমুদ্রাটা সঙ্গেই নিয়ে গেছে ভুলে।
ঘনরামও হাওয়ার অভাবে নিস্তরঙ্গ পুকুরের মতো স্থির সমুদ্রের দিকে খানিক চেয়ে থেকে পাইলট সানসেদো যেখানে টঙ-এ বসে আছেন জাহাজ চালাতে সেই দিকে পা বাড়িয়েছেন।
পা বাড়িয়েও হঠাৎ চমকে ঘনরামকে থামাতে হয়েছে। ওপরের ডেক থেকে নীচের খোলে যাবার সিঁড়িতে একটা চাপা হাসির তরল ঝংকার দ্রুত পদশব্দের সঙ্গে মিলিয়ে গেছে।
একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ঘনরাম আবার পাইলট সানসেদোর সন্ধানেই গেছেন। এ হাসিতে চমকে উঠলেও বিমূঢ় তিনি হননি। এ হাসি ও পদশব্দ কার তা তিনি জানেন। এই হাস্যময়ীকে তাক লাগাবার উদ্দেশ্যেই কার্তিক কিংবা তার ময়ূরটি সেজে সময়ে অসময়ে পেখম-তোলা ভঙ্গিতে ঘোরাফেরা করার দরুনই হিড্যালগো সোরাবিয়াকে প্রথম তিনি লক্ষ করেন।
মেয়েটি কে তা-ও ঘনরাম জানেন। ক্ল্যাভিহেরো নামে এক হিড্যালগো সেনানায়কের সদ্যবিধবা যুবতী স্ত্রী। সে হিসেবে তার এরকম হাস্যচপলতা বেশ বিসদৃশ বেহায়াপনা মনে হওয়ারই কথা। তবে মেয়েটির স্বপক্ষে এইটুকু বলা যায় যে, ক্ল্যাভিহেরো এক হিসেবে প্রায় বিয়ের পর দিনই স্ত্রীকে কিউবায় ত্যাগ করে পালিয়ে কর্টেজ-এর বাহিনীর সঙ্গে মেক্সিকো অভিযানে চলে আসে। মেক্সিকোয় যাবার পর স্ত্রীর কোনও খোঁজ সে তো করেইনি, সেদেশে বার বার বহু সুন্দরীকে ঘরণীও করেছে। ক্ল্যাভিহেরোর স্ত্রী স্বামীর প্রেমের টানে নয়, তার ওপর আক্রোশেই তার সত্যিকার স্বরূপ নিজের চোখে দেখবার জন্যে পরম দুঃসাহসে পাইলট সানসেদোকে বলে তাঁরই জাহাজে মেক্সিকো পর্যন্ত আসে। এসে সে জানতে পারে যে, যুদ্ধে নয়, মাতাল অবস্থায় টেনচটিটানের রাস্তায় নারীঘটিত ব্যাপারের দাঙ্গাতেই মারা গিয়ে ক্ল্যাভিহেরো সব সমস্যা মিটিয়ে দিয়ে গেছে।
মেয়েটি তাই আবার ফার্নানদিনায় নয়, স্পেনেই ফিরে যাচ্ছে। স্বামীর কাছে প্রতারণা ছাড়া কিছু যে পায়নি, স্বামীর মৃত্যুসংবাদে তার একেবারে ভেঙে পড়া খুব স্বাভাবিক বোধ হয় না। তার একটু আধটু তরল চাঞ্চল্যও তাই বোধহয় ক্ষমার যোগ্য।
কিন্তু সেদিনের হাসিটা কেমন একটু হিসেবের বাইরে বলে ঘনরামের মনে হয়। হাসিটা যেন ঝংকৃত হতে একটু দেরিও হয়ে গেছে।
সোরাবিয়া উপস্থিত থাকতে থাকতেই হাসির লহরীটা ওঠবার কথা নয় কি?
০২ .হাসির লহরী কী হিংসার তুফান
এ হাসির লহরী কী হিংসার তুফান যে তুলবে তা ঘনরাম যদি জানতেন!
জানলে অবশ্য করতেনই বা কী? তিনি তো এ চঞ্চলা হাস্যময়ীকে কোনও প্রশ্রয় দেননি। নির্লিপ্ত নির্বিকার দূরত্বেই নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন।
কিন্তু মুশকিল হয়েছে জাহাজ হঠাৎ একেবারে অচল হওয়ায়। সাগরবাজ নিয়ে বাজি ধরার সকাল থেকে সেই যে হাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে তার পর থেকে সেনোরা আনা-র চুলের একটা গুছিও কাঁপায়নি।
মাস্তুলে পালগুলো ঢিলে হয়ে ঝুলছে। জাহাজের পতাকাটাও তাই!
নতুন মহাদেশ থেকে স্পেনে ফেরার পথে এই একটি জায়গার ভয়ে নাবিক যাত্রী সবাই তটস্থ হয়ে থাকে। সমুদ্রের মাঝখানে সত্যিই এ এক বদ্ধ জলা। নাম সার্গাসো সাগর। সমুদ্রের শৈবালদাম জমে জমে ও অঞ্চলটাকে এমনিতেই বেশ দুর্ভেদ্য করে রেখেছে। তার ওপর সেখানে বাতাসও প্রায় ঘুমন্তই থাকে। সেকালের পালতোলা জাহাজ একবার সেখানে হাওয়া বিহনে আটকে পড়লে আকাশের দেবতা দয়া করে একটু ঝড়-তুফান না পাঠানো পর্যন্ত তার আর নিষ্কৃতি নেই। চারিদিকে অসীম সমুদ্রের মাঝখানে অচল হয়ে থাকা তখন এক শাস্তি!
সে শাস্তি হালকা করতে একটু আমোদ-প্রমোদ ফুর্তির ব্যবস্থা করতেই হয়। তাতে যাত্রীদের পরস্পরের মধ্যে মেলামেশাটাও খুব আড়ষ্ট থাকে না।
জাহাজে পনেরোজন নাবিক। তাদের অধিনায়ক হলেন সানসেদো। যাত্রী ঘনরাম আর সোরাবিয়াকে নিয়ে সবসুদ্ধ সাতজন মাত্র। তার মধ্যে দুজন মাত্র স্ত্রীলোক। সেনোরা আনা আর তার সঙ্গিনী পরিচারিকা এক প্রৌঢ়া।
পুরুষ পাঁচজনের মধ্যে একজন ফ্রানসিসকান পাদরি। বর্বরদের অন্ধ তমসার নরক থেকে সত্যধর্মে দীক্ষিত করবার জন্যে স্পেন থেকে তাঁর ধর্মভাইদের আনতে যাচ্ছেন। ঘনরাম বাদে বাকি তিনজনই সৈনিক হিড্যালগো। তবে সোরাবিয়াই তার মধ্যে একটু দুর্নামের কলঙ্ক নিয়ে মেক্সিকো থেকে একরকম বরাবরের জন্যে বিদায় নিয়েছে। অন্য দু-জন হিড্যালগোর মধ্যে অ্যালনসো কিনটেরো মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর জন্যে স্পেন থেকে ঘোড়া কিনে আনতে যাচ্ছে আর বার্নাল সালাজার যাচ্ছে স্বয়ং কর্টেজ-এর দূত হয়ে স্পেন সম্রাটের কাছে কর্টেজ-এর পত্র আর মহামূল্য সব উপহার নিয়ে।
এসব যাত্রীদের মধ্যে একমাত্র বানাল সালাজার-এরই ঘনরামের পূর্ব-পরিচয় জানা সম্ভব ছিল। কারণ দু-একবার কর্টেজ-এর সঙ্গে তাঁর নিজস্ব কামরাতেই সালাজার দেখা করতে আসার সুযোগ পেয়েছে। কর্টেজ-এর পেয়ারের ক্রীতদাস হিসেবে ঘনরামকে একটু-আধটু লক্ষ করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল না।
