কুম্ভের মতো উদরদেশ যাঁর স্ফীত, সেই ভোজন-বিলাসী রামশরণবাবু কেমন করে অমন ত্বরিৎবেগে তাঁর পাশে দাসমশাইকে জায়গা দেবার ব্যবস্থা করে ফেললেন সেটি একটি দর্শনীয় বস্তু।
শ্রীঘনশ্যাম দাস কর্তৃক অলংকৃত এই সান্ধ্য-সভাটি আমাদের করুণ আত্মছলনায় একদা হ্রদ নামে অভিহিত ও বর্তমানে সরোবরে সংকুচিত হয়েও সম্মানিত একটি জলাশয়ের এক প্রান্তে বেদিকা-বেষ্টিত নাতি-বৃহৎ একটি বৃক্ষের তলায় প্রায় নিয়মিতভাবে যে বসে, এ সংবাদ দাসমহাশয়ের অনুরক্ত মহলের কারও বোধহয় অজানা নয়।
দাসমশাই আসন গ্রহণ করাতে মস্তক যাঁর মর্মর-মসৃণ, সেই শিবপদবাবু আর সকলের মতো অমন কৃতার্থ বোধহয় হতে পারলেন না। তাঁর কণ্ঠের ঈষৎ ক্ষুব্ধ তিক্ততাতেই তা বোঝা গেল।
দেনার দায়ে মানে? শিবপদবাবু রুদ্ধস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন।
মানে, দাসমশাই নিজের সংক্ষিপ্ত উক্তি বিস্তারিত করলেন, সহজ সরল অর্থে যা হয় তা-ই। খাতক হয়ে উত্তমর্ণের ভয়ে দেশান্তরী হতে গিয়ে ভূগোলের সীমা বিস্তৃত করার দৃষ্টান্ত অতীতে একেবারে বিরল নয়। তা ছাড়া দেনার দায় না থাকলে প্রৌঢ় এক পর্যটক চার শতাব্দী আগেকার সংকীর্ণ পৃথিবীকে মরণ-পণ দুঃসাহসে প্রসারিত করে সে-যুগ এ-যুগ নিয়ে বোধহয় সর্বকালের সমৃদ্ধতম দেশ আবিষ্কারে উৎসাহী হতেন কি না বলা যায় না। অন্তত কল্পনার স্বর্ণলঙ্কাকেও হার মানানো সত্যিকার সোনায় বাঁধানো এক বাস্তব রূপকথার দেশ আবিষ্কারের গৌরব একজন দেনদারের। সে দেনদার আবার দেনার দায়ে কারারুদ্ধও হয়েছিলেন সেভিল-এ। সেদিন কারাগার থেকে তাঁকে উদ্ধার করবার জন্য একজন যেন ভোজবাজিতে সেভিল-এ উদয় হয়েছিল। তা না হলে পৃথিবীর হয়তো কল্যাণই হত, কিন্তু যোড়শ শতাব্দীকে বিদ্যুৎ-চকিত করা একটি আবিষ্কার তখনকার ইউরোপীয় সভ্যজগতের হৃদস্পন্দন অত দীর্ঘকাল অমন দ্রুত করে তুলত না।
মেদভারে যিনি হস্তীর মতো বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবু যেন দাসমশাই-এর কথা শেষ হবার জন্যে মুখ বাড়িয়ে ছিলেন। দাসমশাই থামতেই তিনি নিজেই যেন ধন্য হবার ব্যাকুল উৎসাহে গদগদ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, সেই ভোজবাজিতে যিনি উদয় হয়েছিলেন, তিনি কে? আপনার কেউ নিশ্চয়ই? ঠাকুরদার ঠাকুরদা তস্য ঠাকুরদা গোছের কেউ, কেমন?
না, পিতামহ কি অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহও নয়-বলে সহিষ্ণুভাবে শুরু করে দাসমশাই আর বক্তব্যটা শেষ করতে পারলেন না।
শিবপদবাবু তাঁকে সে সুযোগ না দিয়েই ব্যঙ্গভরে বলে উঠলেন, বুঝেছি বুঝেছি! অর্থাৎ তস্য তস্য!
এর পর এ সভায় উত্তর প্রত্যুত্তর কীভাবে কোথায় গিয়ে থেমেছে তা আগেই বলা হয়েছে।
তাঁর আদিপুরুষ ঘনরাম দাসের দাসত্বশৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার বৃত্তান্ত যে দাসমশাই-এর মুখ থেকেই শোনা একথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শিবপদবাবু যদি তাঁকে একটু বিব্রত করতে চেয়ে থাকেন সে আশা তাঁর কিন্তু পূর্ণ হল না।
আদি পুরুষের দুঃখ স্মরণ করেই যেন বিষণ্ণ সুরে দাসমশাই বললেন, না, স্বাধীন হয়ে আর দেশে ফিরতে পারলেন কই? দাসত্ব থেকে মুক্তি আর দেশে ফেরা তখনও তাঁর ভাগ্যে নেই।
তার মানে, আপনার আদিপুরুষ সেই ঘনরাম দাস ক্রীতদাস হয়েই রইলেন? স্ফীতোদর রামশরণবাবু নীল নদের উৎস-আবিষ্কারকদের জীবনের রহস্য রোমাঞ্চের কথা অনায়াসে ভুলে গিয়ে ঘনরাম দাসের জন্য উদ্বিগ্ন ও কাতর হয়ে উঠলেন—কিন্তু তিনি তো স্বয়ং কর্টেজ-এর ছাড়পত্র পেয়েছিলেন!
স্পেনের সম্রাট বুঝি তা মানলেন না? এ ক্রুদ্ধ সমালোচনা শোনা গেল সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবুর কণ্ঠে। ভবতারণবাবুর বিপুল মেদবহুল হাতের কাছে থাকলে স্পেনের সে সম্রাটের কী দুর্দশাই যে হত তা পরের কথাতেই বোঝা গেল—এ সব সম্রাটের কী হওয়া উচিত, জানেন?
দাসমশাইকে তাড়াতাড়ি ভবতারণবাবুকে শান্ত করতে হল তাঁর ভ্রান্ত ধারণাটুকু সংশোধন করে।
না, না, সম্রাটের কোনও দোষ নেই। বোঝালেন দাসমশাই, সম্রাটের হাতে পড়লে তাঁর নিজের হুকুমনামা দেওয়া কর্টেজ-এর ছাড়পত্র নিশ্চয়ই তিনি স্বীকার করতেন। কিন্তু ঘনরাম তাঁর ছাড়পত্র সম্রাটকে দূরে থাক, সেভিল-এর বন্দরের কাউকেও দেখাবার সুযোগ পাননি!
কেন? কেন? সে ছাড়পত্রের হল কী? প্রায় সমস্বরে প্রশ্ন করলেন রামশরণ ও ভবতারণবাবু। শিবপদবাবু শুধু তখনও নীরব।
যা হল তা বড় জঘন্য, দার্শনিক নির্লিপ্ততা রাখার যেন বৃথা চেষ্টা করে বললেন শ্রীঘনশ্যাম দাস, মানুষ সম্বন্ধে তাতে হতাশই হতে হয়। কল্পনার নয়, বাস্তবের স্বর্ণলঙ্কা আবিষ্কারের কাহিনী কিন্তু সে কুৎসিত ঘটনার বিবরণটুকু ভূমিকা হিসেবে আগে না জানালে দুর্বোধ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
তার মানে ঘনরাম দাস স্বাধীন থাকলে ওই আপনার সত্যিকার স্বর্ণলঙ্কা আর মুখের ঘোমটা খুলত না?
শিবপদবাবুর কথাগুলো এখনও বেশ বাঁকা। কিন্তু দাসমশাই সহিষ্ণুতার অবতার। পিন-ফোটানোেটা যেন পালক-রোলানোর মতো নিয়ে হাসিমুখে বললেন, স্বর্ণলঙ্কা কত দিনে কীভাবে তাহলে আবিষ্কৃত হত তা হয়তো ঠিক বলতে পারব না। কিন্তু স্বাধীন থাকলে ঘনরাম দাস সেভিল-এর বন্দরে জাহাজের গারদ ভেঙে বেরিয়ে সমুদ্রে নিশ্চয় ঝাঁপ দিতেন না, একদিন পশ্চিমের নতুন মহাদেশে বন্ধুত্বের আদর্শ হিসেবে যাঁর নাম লোকের মুখে মুখে ফিরবে সেই দিয়েগো দে আলমাগলোর জাহাজে লুকিয়ে তাঁকে আবার আতলান্তিক পার হতে হত না, তখনকার সবচেয়ে আজগুবি এক অভিযানে লোকসানের পর লোকসানেও টাকা ঢেলে যাবার মন্ত্র নতুন মহাদেশের সবচেয়ে বড় গুপ্ত মহাজন গ্যাস্পার দে এসপিনোসার কানে দেবার কেউ থাকত না, আসল হর্তাকর্তাদের মন বিষিয়ে দিয়ে অভিযান মূলেই মুড়িয়ে দেবার জন্যে সব কিছুই কালিমেড়ে দেখানো বিবরণ গোপনে পাঠাবার সত্যিকার শয়তানি চালাকি তাহলে কেউ ধরে সাবধান করে দিত না, দশ বছরের মধ্যে স্পেনকে ঐশ্বর্য আর গৌরবের শিখরে যে তুলবে, তখনও অজ্ঞাত অখ্যাত দেনার দায়ে দেউলে আধবুড়ো একটি মানুষকে যেমন কারাগার থেকে উদ্ধার তেমনই এ যুগের স্বর্ণলঙ্কার ভবিষ্যতের চরম সংকটের দিনে ভাগ্যের পাশার দান উলটে দিতে ক্লান্টুর ওপর কোরাকেন্ধুর পালক গোঁজার ফন্দি কারও মাথায় আসত না।
