অবশ্য!
হঠাৎ দিব্যজ্ঞান পেয়ে আমি সবিস্ময়ে বলেছি, ও! মুলো দিয়েই তা হলে মুলোর বিষক্ষয়! জিন-সেও তো আসলে একরকম মুলো!
জিন-সেঙ নয়, শিশির গম্ভীরভাবে সংশোধন করেছে, জংশন!
সূর্য কাঁদলে সোনা (উপন্যাস)
০১. অর্থাৎ তস্য তস্য
অর্থাৎ তস্য তস্য!
কে বললেন?
না, শ্রীঘনশ্যাম দাস নয়, মর্মরের মতো মস্তক যাঁর মসৃণ, ইতিহাসের অধ্যাপক সেই শিবপদবাবুই উক্তিটি করলেন ঈষৎ ব্যঙ্গের সুরে।
এ উক্তির প্রতিবাদ স্বয়ং শ্রীঘনশ্যাম দাসের কণ্ঠেই শোনা গেল উদার সহিষ্ণুতার সুরে।
না, তস্য তস্য নয়, ইনি সেই অনন্য অদ্বিতীয় ঘনরাম!
ঘনরাম! মেদভারে হস্তীর মতো যিনি বিপুল সেই সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবু বিস্ফরিত চক্ষে জিজ্ঞাসা করলেন মানে আপনার সেই আদিপুরু:, ঘনরাম দাস, যিনি সেই পৃথিবীর প্রথম ট্যাঙ্ক আবিষ্কার করেছিলেন—
আর ছেলেবেলাতেই ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূলের সমুদ্রে পোতুর্গিজ বোম্বেটেদের লুঠ করা, জ্বালিয়ে দেওয়া তাম্রলিপ্তির সদাগরি জাহাজ থেকে রক্ষা পেয়েও ধরা পড়ে প্রায় অর্ধেক যৌবন পর্যন্ত পোর্তুগালে স্পেনে এবং পরে এখন যা আমরা কিউবা আর মেক্সিকো বলে জানি, সেই দুই দেশে ক্রীতদাস হয়ে কাটিয়ে ওই মাষ্টা আবিষ্কারের পুরস্কারস্বরূপ দাসত্ব থেকে মুক্তি পেলেও নিজের বংশের ধারায় ওই চরম গ্লানি ও পরম গৌরবের অধ্যায় চিরস্মরণীয় করে রাখবার জন্যে দাস পদবিই গ্রহণ করেছিলেন।—সদাপ্রসন্ন ভবতারণবাবুর অসমাপ্ত বাক্যটি একদমে ময়দানের মনুমেন্ট-মুখো মিছিলের মতো এই বাক্যস্রোতে পূরণ করে শ্রীঘনশ্যাম দাস যখন থামলেন তখন উপস্থিত আর সকলের বিশেষ্য বিশেষণ ক্রিয়া ক্রিয়ার বিশেষণ কনজাংশন প্রিপোজিশন কা কর্ম ক্রিয়া ইত্যাদির জট থেকে গদ্যাংশ উদ্ধার করে তাৎপর্যে পৌঁছোতে হিমসিম খাওয়া গলদঘর্ম অবস্থা।
মর্মর-মসৃণ শিরোদেশের শিবপদবাবুই প্রথম বোধহয় চরকি-পাক থেকে মাথাটি স্থির করতে পেরে জিহ্বা সঞ্চালনে সক্ষম হলেন। বললেন, কিন্তু আপনার সে ঘনরাম দাস তো টেনচটিটলান-বিজয়ে কর্টেজ-এর কীর্তিকেও কানা করে আতলান্তিকের এপারে ওপারে বাহাদুরকা খেল দেখিয়ে স্বাধীনতার সনদ নিয়ে দেশে ফিরে গেছলেন?
শিবপদবাবুর গলার সুরে ঠাট্টার খোঁচাটা আগের চেয়েও একটু বেশি তীক্ষ্ণ।
তা তীক্ষ্ণ হওয়ার আর দোষ কী!
অমন মোক্ষম সময়ে মুখের কথা কেড়ে নিলে কার মেজাজ আর ঠিক থাকে!
এমনিতেই শ্রীঘনশ্যাম দাস উপস্থিত থাকলে আর কারও কোনও মৌ-কা বড় একটা মেলে না। তাতে অমনভাবে আসরটা জমিয়ে তোলার পর ওই একটা বিদঘুটে ফোড়ন কেটে সব ফাঁসিয়ে দেওয়া।
না, শিবপদবাবু আজ সত্যিই মনে মনে খুব বেশিরকম চটেছেন।
ঘনশ্যাম দাসের ফোড়নে যদি ঝাঁঝ থাকে, তাহলে তাঁর টিপ্পনিতেও কী জ্বালা শিবপদবাবু বুঝিয়ে দেবেন।
আজকের বেয়াদপিটা কিছুতেই তিনি ক্ষমা করতে রাজি নন। দাসমশাই রোজ তো নিজেই আসর মাত করেন, আজ একটু ধৈর্য ধরে তিনি শুনতে পারতেন না!
শিবপদবাবু আজেবাজে গল্প তো ফাঁদেননি। শুরু করেছিলেন নীল নদের উৎস আবিষ্কারের আশ্চর্য রোমাঞ্চকর কাহিনী। একদিনে সে উৎস তো আবিষ্কার হয়নি, আবিষ্কারের অভিযান সাফল্যের আনন্দে এক একবার যেখানে এসে থেমেছে, দেখা গেছে নীল নদের উৎপত্তির রহস্য তারও চেয়ে দূর দুর্ভেদ্য যবনিকার আড়ালে গোপন।
সে রহস্য-যবনিকা সরিয়ে দিতে কত রকমের মানুষই না এগিয়ে এসেছে।
নেহাত মূৰ্থ গোঁয়ার বেপরোয়া গোছের বাউণ্ডুলে যেমন তেমনই আবার এমন জ্ঞানী-গুণী-পণ্ডিত-গোছের বিচক্ষণ মানুষও এসেছে যাদের কাছে এই অজানা উৎস-সন্ধান আধ্যাত্মিক সাধনারই শামিল।
এই সন্ধানী পর্যটকদের মধ্যে রিচার্ড বার্টন-এর মতো বিচিত্র অদ্ভুত মানুষেরও দেখা মেলে। অসামান্য পণ্ডিত, জীবন-রসিক, সকল রকম নকল গণ্ডি-ভাঙা যে বিদ্রোহী, এক হিসেবে নেহাত মুখ গরিব ইতরদের জমায়েত থেকে সভ্য আরব জগতেরই ভুলে-যাওয়া, হেলায় পায়ে-ঠেলা, কল্পনার উধাও-ডানা-মেলা আরব্য উপন্যাসের মতো গল্প-সাহিত্যের একটি বিরল মুকুটমণি চিনে উদ্ধার করে এনেছিলেন, আসল জহুরির চোখ আর খাঁটি জীবন-পিপাসীর কলজের জোরের বিশেষত্বে, নিজের যুগের মাথা-ছাড়ানো সেই রিচার্ড বাটন-এর মতো মানুষ ভেতরকার কী প্রেরণায় কী তাগিদে অজানা আফ্রিকার অন্ধকার গভীরে অতবড় দুঃসাহসী অভিযানে বেরিয়ে টাঙ্গানায়িকা হ্রদ আবিষ্কারের উপলক্ষ হয়েছিলেন, শিবপদবাবু নাটকীয়ভাবে জবাব দেবার জন্যে নিজেই সে প্রশ্নটা তুলে ধরেছিলেন।
হয়তো দেনার দায়ে!
এতক্ষণের বক্তৃতার ফুয়ে ফাঁপানো-ফোলানো রংবাহারদার বেলুনটাকে যেন চোখের ওপর ওই বিদ্রূপের আলপিনের খোঁচায় ফুস করে ফেঁসে চুপসে যেতে দেখা গেল।
কে বললে কথাটা?
কে আর! ওই পাকাকাঠে করাত-চালানো অদ্বিতীয় গলা একমাত্র শ্রীঘনশ্যাম দাসের ছাড়া আর কারওই হতে পারে না।
তাঁকে সশরীরে ঠিক শিবপদবাবুর পিছনেই মুখে তাঁর সেই মার্কামারা করুণা আর অবজ্ঞা-মেশানো হাসিটি আর হাতে চিরন্তন অবিচ্ছেদ্য ছড়িটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।
কখন তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন, কেউ যে লক্ষ করেননি, শিবপদবাবুর গল্প জমাবার সূর্য কাঁদলে সো না
আংশিক সাফল্য তা থেকে অন্তত প্রমাণিত হয়।
এখন তাঁকে দেখে সবাই কেমন একটু লজ্জিত হয়ে তাঁকে জায়গা দেবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
