যেমন করে হোক সমশেরের বেঁচে ওঠা তাই একান্ত দরকার। কিন্তু সেইটেই অসম্ভব মনে হয়েছে। ওইমিয়াকন-এর আধা হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর ভরসা না রেখে দুশো পঁচিশ মাইল দূরের আরও বড় ঘাঁটি খানডিগা থেকে ঘোড়ায় চড়িয়ে সত্যিকার বড় সার্জন এনেছি। যতদূর সম্ভব চেষ্টা করে তিনিও একদিন হাল ছেড়ে দিয়ে বলেছেন, না, আর আশা নেই। নাড়িই ছেড়ে যাচ্ছে!
সত্যিই চোখে অন্ধকার দেখেছি।
কিন্তু সেই অন্ধকারেই একটা ছবি যেন ভেসে উঠেছে। মাটির সঙ্গে প্রায় লেপটানো খুদে খুদে কমলা রঙের থোক থোক একরাশ যেন পেরেকের মাথা।
সমশেরের তারপর নাড়ি ফিরে এসেছে। শেষ পর্যন্ত সেরেও উঠেছে পুরোপুরি, একটা পা বাদে অবশ্য।
সারল বুঝি ওই আপনার জংশন-এ! আমি সবিস্ময়ে বললাম।
জংশন নয়, জিন-সেঙ–সংশোধন করলে শিশির।
ঘনাদা সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, ওই হল জিন-সে। নেহাত দৈবের দয়া না হলে ও বস্তুর দেখা পাওয়া যায় না। পেলেও চেনা শক্ত। ভাগ্যক্রমে যা পেয়েছিলাম সবটাই মাটি কেটে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। তা পরিমাণে খুব অল্প কী? প্রায় পাঁচশো গ্রাম। সাইবিরিয়ার টাইগায়, এমনকী জিন-সেঙের খাস মুল্লুক খাবারভস্ক অঞ্চলেও যেসব পেশাদার সন্ধানী এ জিনিস খুঁজে ফেরে, তাদের এক মরশুমের সংগ্রহও চারশো গ্রামের ওপর কখনও ওঠে না। চারশো গ্রাম তো চারটিখানি কথা নয়। সরেস মাল হলে চারশো গ্রামের দামেই দালান তোলা যায়। সত্যিই জিনিসটা সাতরাজার ধন কিনা! সব কিছুই তার শাহানশাহি চালের। বীজ থেকে কল বার হতেই দু বছর লাগে। বাড় এমন আস্তে যে বোঝাই যায় না। বছরে দেড় গ্রাম ওজন যদি বাড়ে তা হলেই যথেষ্ট। কিন্তু গুণ? তিল পরিমাণ বেটে খাওয়ালে একটা তাগড়া জোয়ান হার্টফেল করে মরে যায়। তিলের কণার কণা খাওয়ালে মরতে বসা রোগী জ্যান্ত হয়ে ওঠে। সমশেরও তাই হল।
কিন্তু, শিবু আমাদের সকলের মনের ধোঁকাটাই ব্যক্ত করলে, এক তিলের কণার কণাতেই যখন অমন কাজ হল তখন, আপনার কী বলে, পাঁচ-পাঁচটা আঁটি দাতব্য করতে গেলেন কেন? করলেনই বা কাকে?
কাকে আর? ওই সেমেন রুজুনিকভ মানে সমশের থাপাকেই! ঘনাদা যেন রাজা হরিশচন্দ্রের প্রক্সি দিয়ে বললেন, আমার বাসাতেই সমশেরের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম। সেরে-সুরে ওঠবার পর তার প্রতিজ্ঞাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললাম, এবার তা হলে লুকোনো মালগুলো কোথায় রেখেছ বার করে দেবে চলো। ওগুলো না পোড়ানো পর্যন্ত স্বস্তি নেই।
আজ্ঞে হ্যাঁ, তা তো বটেই! মুখে স্বীকার করলে সমশের। কিন্তু তবু তার নড়বার নাম নেই।
একটু অধৈর্যের সঙ্গে বললাম, তা তো বটেই যদি হয় তো চুপ করে বসে আছ কেন? বেশি দূর কোথাও যদি হয় তো খোঁড়া পায়ে তোমার যাবার দরকার নেই। শুধু
জায়গাটার হদিস দাও, আমি খুঁজে বার করে আনছি। আজ্ঞে না, আপনাকে অত কষ্ট করতে হবে না!
সমশেরের এই ভুয়ো তোয়াজের কথায় জ্বলে উঠলাম এবার, আমায় যদি কষ্ট না করতে হয় তো তুমি-ই করো! যেখানে যেতে হয় যাও তাড়াতাড়ি!
আজ্ঞে যাব আর কোথায়! বলে সমশের যেখান থেকে তার লুকোনো মাল বার করে আনল তা দেখে আমি তাজ্জব!
সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে সমশের কোন সুযোগে আমার কামরায় আমারই বিছানার পুরু গদির নীচে তার সব কিছু লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন?
বেশ সুশীল সুবোধ হয়ে বার করে দিলেও তার লুকোনো পুঁজি পোড়াতে যাবার সময় সমশের প্রায় কাঁদো কাঁদো।
সত্যিই এগুলো পোড়াবেন?
পোড়াব না তো কি এখানকার পুলিশকে উপহার দেব? আমি কামরা গরম করার চুল্লিতে এক এক করে সেগুলো ফেলতে শুরু করলাম।
কিন্তু আমার কথা একবার ভেবেছেন! সমশের আকুল আবেদন জানালে।
তোমার কথা ভেবেছি বলেই তো গুপ্তচর বলে ধরিয়ে না দিয়ে তোমায় ভালয় ভালয় দেশে ফেরার সুযোগ দিচ্ছি!
কিন্তু ফিরে আমি করব কী! সমশের এবার প্রায় ড়ুকরে উঠল। এই খোঁড়া পা নিয়ে আমায় তত তিলে তিলে উপোস করে মরতে হবে। তার চেয়ে এখানে মরাই ভাল ছিল। ও ধন্বন্তরীর গুঁড়ো দিয়ে কেন আমায় বাঁচাতে গেলেন?
সমশেরের আক্ষেপের মধ্যেই মনঃস্থির আমি করে ফেলেছি।
কিট ব্যাগ খুলে কাগজের প্যাকেটটা তার সামনে ধরে নিয়ে বললাম, নাও।
নেব? প্যাকেটটা খুলেই সমশের কিন্তু আঁতকে উঠল ভয়ে, এ কী! এ তো মমি দেখছি! পেটের ভেতর জন্মাবার আগে যেমন থাকে তেমনই সব বাচ্চার মমি!
মমি নয়। অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে হল, এই হল সাতরাজার ধন জিন-সেঙের শেকড়। এই পাঁচ আঁটি নিয়ে দেশে চলে যাও, সারা জীবন খাবার ভাবনা আর তোমায় ভাবতে হবে না। আর এগুলোও যদি নেহাত ফুরোয় কি হারায়, তখন তোমাদের নেপালেরই রিন-সেন খুঁজে বার কোরো। জিন-সেঙ যে জানে রিন-সেন চিনতে তার অসুবিধা হবে না।
সমশের আমার কথা যে ভোলেনি আজ তার বড় প্রমাণ পেলাম। জিন-সেঙ ফুরিয়ে ফেলে তার ছেলে বিক্রম থাপাই এখন বাপের হয়ে রিন-সেন-এর ব্যবসা করছে। না জেনেশুনে ন্যায্য দামই চেয়েছিল আমার কাছে। সমশের থাপার নাম করে পুরনো দুটো কথা বলতেই একবারে অন্যমূর্তি। একটু পরিচয় পেতেই একেবারে জোড়হস্ত হয়ে রিন-সেনের গুঁড়ো আমায় সেবন করিয়ে তবে ছেড়েছে। তা
হলে তোমাদের ওই সর্বনাশা মুলোর বিষক্ষয় আজ হয়, না আমি আর ফিরে আসি?
কত বড় ফাঁড়া যে আমাদের গেছে তা ভাল করে বোঝবার সময় দেবার জন্যই ঘনাদা টঙের ঘরে এবার চলে গেছেন। শিশিরের সিগারেট টিনটাও সেই সঙ্গে গেছে
