কিন্তু টাইগায় টহলদারিতে বার হবার পর কয়েকদিনের মধ্যেই সমশের সম্বন্ধে। সন্দেহটা আর উড়িয়ে দেওয়া গেল না। ওইমিয়াকন থেকে রওনা হয়ে তখন দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় খান্দিগার কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ ফার গাছের জঙ্গলের মাঝে একটা জায়গা চোখ দুটোকে যেন চুম্বকের মতো আটকে দিলে। বরফের মতো ঠাণ্ডা মাটির সঙ্গে প্রায় লেপটে এক রাশ কমলা রঙের খুদে খুদে পেরেকের মাথা যেন জটলা পাকিয়ে আছে।
নিজের চোখকে সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছি না তখন। তন্ময় হয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ সমশেরের কথায় চমকে ভেঙেছে।
কী দেখছেন এত?
অবাক হয়ে সমশের-এর দিকে খানিক চেয়ে থেকে তার কথাটা বিশ্বাস করতে না পেরে বলেছি, কী দেখছি, সত্যি জিজ্ঞাসা করছ?
হ্যাঁ, করছি তো! আমার গলার স্বরে একটু অস্বস্তি বোধ করে সমশের বলেছে, ওদিকে একটা মিঙ্ক ভাম চলে গেল কিনা, তাই ভাবছি কী এত দেখছেন।
আমিও একটা কথা ভাবছি, সেমেন! তার চোখে চোখ রেখে বেশ একটু কড়া। গলায় বলেছি, তুমি কি সত্যি ইয়াকুট?
কেন? কেন? সমশের বেশ একটু অস্থির হয়ে বলেছে, আমি ইয়াকুট নয়তো কী?
কী, তাই তো ভাবছি! ইয়াকুট হয়ে তুমি স্ট্রোগানিনা কাকে বলে জানতে না, এই ক-দিন টাইগায় ঘুরে দেখলাম তুমি এ-অঞ্চলের নদী-পাহাড় বন কিছুই ঠিকমতো চেনো না। এখন আবার আমি কী দেখছি জিজ্ঞাসা করলে অম্লান বদনে। তোমার পক্ষে ইয়াকুট হওয়া অসম্ভব। সত্যি করে বলো তো, সেমেন রুজনিকভ তোমার আসল নাম কি না?
আরও কিছুক্ষণ পরিচয় লুকোবার বৃথা চেষ্টা করে সমশের শেষ পর্যন্ত সব কথাই স্বীকার করেছিল। সেমেন রুজনিকভ নয়, নাম তার সমশের থাপা। এমনিতে বেশ ভাল ঘরের ছেলে। শিক্ষাদীক্ষাও অবহেলা করবার মতো নয়, শুধু পেশাটা যা বেছে নিয়েছে তা অত্যন্ত নোংরা। সমশের গুপ্তচর হিসেবে এ অঞ্চলে এসেছে। এখানকার আদিবাসীদের সঙ্গে চেহারায় মিল দেখে ভাষা ইত্যাদিতে যথাসম্ভব তালিম দিয়ে কোনও শত্রুপক্ষের শক্তি—তাকে ইয়াকুট সেজে ওখান থেকে সব রকম দরকারি খবর সংগ্রহ করে আনতে পাঠিয়েছে।
কাজ সে ইতিমধ্যে খুব কম করেনি। তার ওপর আমার কাছে চাকরি বাগিয়ে তার সুবিধে হয়েছে খুব বেশি। আমি যখন তাকে সহায়-সঙ্গী হিসেবে বহাল করেছি বলে ভেবেছি, তখন আসলে সে-ই আমায় বাহন করেছে তার কার্যোদ্ধারের জন্য। এ অজানা অঞ্চলে নিরাপদে নির্ভয়ে ঘোরাফেরার জন্য আমার মতো কাউকেই তার দরকার ছিল।
সব শুনে আমি তাকে দুটি রাস্তার একটি বেছে নিতে বলেছি। হয় তাকে গুপ্তচর হিসেবে ধরা পড়তে হবে, নয় এ পর্যন্ত যা কিছু সে সংগ্রহ করেছে সমস্ত আমার সামনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
সমশের থাপা শেষ পথটাই বেছে নিলে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিয়তিই তার সংকল্পে চরম বাদ সাধবে বলে ভয় হল।
টাইগা থেকে ফিরে ওইমিয়াকন-এর ভেতরে তখন ঢুকেই পড়েছি। আর পোয়া খানেক পথ গেলেই আমাদের আস্তানায় পৌঁছে যাই।
হঠাৎ আপনা থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে, নাক! তোমার নাক সামলাও, সমশের!
নাক! সমশের চমকে উঠে নাকে হাত লাগাল।
চমকে উঠলাম আমরাও। নাকে হাত হঠাৎ? কী সামলাতে?
নাক চুরি যাচ্ছিল নাকি? গৌরের বেয়াড়া প্রশ্ন।
গোঁফ চুরির মতো নাক চুরিও যায় বোধ হয়! শিশিরের তার ওপর ফোড়ন।
অন্য দিন হলে এই বেয়াদবিটুকুতেই বৈঠক বানচাল হয়ে যেতে পারত। আজ পথ্যিগুলোর পয়ে ঘনাদার খোশমেজাজে চিড় ধরল না।
নাক চুরিই বলতে পারো, আমাদেরই একরকম সমর্থন জানিয়ে ঘনাদা গলায় যেন ভয়ের কাঁপুনি তুললেন, তার চেয়েও বুঝি সাংঘাতিক।
দু সেকেন্ড আমাদের মনে কথাটা বসবার সময় দিয়ে ঘনাদা আবার শুরু করলেন, চুরি গেলে তবু ফেরত পাবার আশা থাকে। এ একেবারে জন্মের মতো লোপাট হবার ভয়। অস্থির হয়ে তাই সমশেরকে প্রাণপণে নাক ঘষতে বললাম। প্রাণপণে ঘষে ঠাণ্ডায় জমে সাদা হয়ে যাওয়া নাকটায় যদি রক্ত চলাচল করাতে পারে। তা না হলে ও নাক আর বাঁচানো যাবে না, পচে খসে যাবে। সাইবেরিয়ার টাইগার ঠাণ্ডার এই এক বিভীষিকা।
সমশেরকে আর দুবার বলতে হল না। রাস্তার ধারে পিঠের বোঝা নামিয়ে দাঁড়িয়ে সে তখন খ্যাপার মতো নাক ঘষতে শুরু করেছে।
নাকটা তাতে বাঁচল, কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যতক্ষণ নাক ঘষেছে তাতে একটা পা-ই গেছে ঠাণ্ডায় জমে। সে পা-টা শেষ পর্যন্ত কেটে বাদই দিতে হল। তাতেও সমশেরকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি।
সে টানাটানির মধ্যে তার গুপ্তচরগিরির কীর্তিগুলো নম্বন্ধেই দারুণ ভাবনায় পড়লাম। কথা ছিল ওইমিয়াকন-এ পৌঁছেই তার সে গোপন কাগজপত্রের পুঁজি সে আমার হাতে তুলে দিয়ে আমার সামনেই জ্বালিয়ে দেবে। রাস্তায় নাক জমে যাওয়ার পর থেকে সে পুঁজি কোথায় যে লুকোনো তার বলবার ফুরসতই কিন্তু সে পায়নি। বলবার মতো অবস্থাও তার ছিল না।
তার মরণ-বাঁচন-দোলার অসুখের মধ্যে নিজেই একদিন তার ডেরায় গিয়ে জিনিসপত্র থেকে শুরু করে তার কামরায় খুঁজতে কিছু বাকি রাখিনি। তখন ওখানকার সব বাড়িই ছিল কাঠের বড় বড় গাছের রোলা কেটে তৈরি। সে কাঠের কামরায় চোরা ফোকর কোথাও থাকতে পারে ভেবে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ঠুকে ঠুকে হয়রান হয়ে গেছি। কোনও হদিসই মেলেনি।
সমশেরকে যদি না বাঁচানো যায়, শেষ পর্যন্ত তার গোপন পুঁজির খবর সে যদি না দিয়ে যেতে পারে, তা হলে কী হওয়া সম্ভব তাই ভেবেই বুকটা কেঁপে উঠেছে বার বার। আমি এখন সন্ধান না পেলেও, পরে কোনওদিন কোনও লুকোনো জায়গা থেকে সমশেরের গুপ্তচরগিরির কীর্তি বার হয়ে পড়া কিছুমাত্র আশ্চর্য নয়। সমশেরের সঙ্গে আমার নামটাও তখন এই কুৎসিত জঘন্য ব্যাপারের সঙ্গে যে জড়িয়ে ভাবা হবে! সমশের আমার কাছেই কাজ করেছে, তাকে নিয়েই আমি টাইগা অঞ্চলের দুর্গম সব জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি। আমিই যে খোদ চক্ৰী নই কে বিশ্বাস করবে তখন সে কথা! বিশেষ করে সমশের তো তখন সব ধরাছোঁয়ার ওপরে চলে গেছে।
