জিন-সেঙের সস্তা বদলি! ঘনাদা যেন একটু মাত্রা ছাড়াচ্ছেন। গৌরের উচ্চারণের ধরনে সেই সন্দেহটা একেবারে লুকোনো রইল না।
হ্যাঁ, জিন-সেঙের বিকল্প রিন-সেন! ঘনাদা কিন্তু নির্বিকারভাবে জানালেন, তাও দাঁও বুঝে চার আঙুলের দাম চাইল চার হাজার!
চার হাজার টাকা! চার আঙুল মাপের জিনিসের দাম!
তার মানে এক আঙুল পরিমাণ হাজার টাকা?
আমাদের চোখগুলো তখন যেমন কপালে, গলাগুলো তেমনই আর খুব মোলায়েম নয়। সন্দেহের বদলে তাতে শঙ্কাটাই প্রধান হয়ে উঠছে।
জিন-সেঙ না রিন-সেন ওই ছাইপাঁশ কিছু সত্যি খেয়ে থাকুন বা না খেয়ে থাকুন, ঘনাদার মাথাটাতে হঠাৎ একটু গোলই বাধল নাকি!
ফিরে এসে আসরঘরে ঢোকার মুখেই তাঁর প্রথম আবোল-তাবোল কথাটাও মনে পড়ে গেল। প্রলাপ বকা তখনই তো শুরু হয়ে গেছে মনে হয়!
তবু অবস্থাটা ঠিক মতো বোঝবার জন্য একবার জিজ্ঞাসা করলাম, তা, ওই হাজার টাকা আঙুল মানে ইঞ্চির রিন-সেন-ই কিনলেন? ওই কোন মিঞার কথা বলছিলেন তার কাছেই বুঝি!
মিঞার কথা বলছিলাম! ঘনাদা ক্ষণেক একটু হকচকিয়ে গিয়ে তারপর অনুকম্পার হাসি হাসলেন, না, কোনও মিঞার কথা বলিনি, শুধু ওইমিয়াকন-এর নাম করেছিলাম।
আমাদের হতভম্ব মুখগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে করুণ স্বরে তারপর ব্যাখ্যা যা করলেন, তাতে অবস্থা আরও কাহিল-সবচেয়ে ঠাণ্ডা জায়গার কথা কী হচ্ছিল না তোমাদের? তাই শুনে ওইমিয়াকন-এর কথা মনে পড়ল। পাঁচ-পাঁচটি আঁটি সেখানে যদি অমন দাতাকর্ণ হয়ে না দিয়ে আসি তা হলে আজ বিক্রম থাপাকে তার বাবার কথাটা মনে করিয়ে দিতে হয়!
জিন-সেঙ, রিন-সেন, পাঁচ আঁটি, দাতাকর্ণ, ওইমিয়াকন, বিক্রম থাপা, আবার তার বাবা-সব মিলিয়ে মাথাগুলো যে আমাদের তখন চক্কর খাচ্ছে তা নিশ্চয় বলবার দরকার নেই।
তারই মধ্যে একটু সামলে উঠে গৌরই প্রথম জিজ্ঞাসা করলে, কীসের আঁটি দান করে এসেছিলেন? ওই জিন-সেঙের? ওখানে কারখানা আছে বুঝি?
কারখানা? ওখানে জিন-সেঙের কারখানা! অ্যাপোলো ইলেভন-এর আর্মস্ট্রংকে চাঁদে চিনেবাদামের দর যেন জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, ঘনাদা গৌর আর সেই সঙ্গে আমাদের মূঢ়তায় সেই রকম যেন ব্যথা পেয়ে বললেন, ওইমিয়াকন বলতে কী বোঝায় তা জানো? ওইমিয়াকন হল একটা শহরের নাম। পৃথিবীর সবচেয়ে ঠাণ্ডা শহর। তখন দুনিয়ার সবচেয়ে ঠাণ্ডা জায়গার কথা বলছিলে না? সে জায়গা অবশ্য অ্যান্টার্টিক মানে দক্ষিণ মেরুর নর্থ ভোস্টক। সেখানে এক দশমিক কম মাইনাস একশো সাতাশেও থার্মোমিটারের পারা নামে, কিন্তু সে জায়গা তো ধু-ধু তুষারের তেপান্তর। মানুষের পাকা বসতি আছে এমন শহর তো নয়। সে রকম শহর হল সাইবিরিয়ায় এই ওইমিয়াকন। আর্কটিক সার্কল যাকে বলে সেই সুমেরু বৃত্তের বাইরে ও দক্ষিণে হলেও এ শহরে শীতকালে থার্মোমিটারের পারা মাইনাস ছিয়ানব্বইও ছোঁয়। আর সে শীত তো আমাদের মতো পৌষ মাসেই কাবার নয়। বছরের আট মাসই যা কিছু তরল সব জমে পাথর হয়ে থাকে।
ওইমিয়াকন-এই সমশের-এর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তখন তার নাম অবশ্য সমশের নয়, সেমেন রুজনিকভ। তাকে ও অঞ্চলের আদিবাসী ইয়াকুট বলেই ধরে নিয়ে সাইবেরিয়ায় অজানা অসীম টাইগা অঞ্চলের গাইড ও সঙ্গী হিসেবেই সবে বহাল করেছি।
খটকা লেগেছে অবশ্য গোড়াতেই। ওইমিয়াকন শহর হিসেবে এমনও কিছু নয়। কম-বেশি হাজার তিনেক লোকের সেখানে বসতি। যাকে রুপোলি শেয়াল বলা হয়, মহামূল্য পশমি ছাল ফার-এর জন্য উত্তর মেরু অঞ্চলের সেই প্রাণীটি পোষবার একটা ফার্ম-ই ও শহরের প্রাণ বলা যায়।
যখনকার কথা বলছি তখন শেয়াল পোষা ফার্ম-এর সবে পত্তন হয়েছে। মেরু অঞ্চলের ফার শিকারি আর বল্গা হরিণের পাল অসীম টাইগায় যারা চরিয়ে বেড়ায় সেই ইয়াকুট রাখালদের ওটা একটা সময়-অসময়ের মেলবার আস্তানা মাত্র।
আধ-পোষা বল্গা হরিণের থেকে শুরু করে টাইগা অঞ্চলের পশু-পাখির বিস্তারিত খোঁজ নেবার জন্য ওইমিয়াকন-ই ক-দিনের জন্য প্রধান ঘাঁটি করেছিলাম। অভিযানে বার হলে নাগাড়ে অন্তত দু-তিন হপ্তা টহল দেবার মতো রসদ সঙ্গে রাখা দরকার। সেই ব্যবস্থা করতে গিয়েই সেমেন মানে সমশের-এর ওপর প্রথম সন্দেহ জাগল একটু। আমার নির্দেশ মতো কয়েকটা জিনিস সেমেন সেদিন ওইমিয়াকন ঘুরে সওদা করে এনেছে। সেগুলো দেখতে দেখতে অবাক হয়ে বললাম, তুমি তো আসল জিনিসই ভুলে গেছ দেখছি! কই, স্ট্রোগানিনা কই?
কী বললেন?
না, প্রশ্নটা সেমেন ওরফে সমশের-এর নয়। আমাদেরই।
একটু অনুকম্পার হাসির সঙ্গে ঘনাদা আমাদের অবজ্ঞার প্রতি করুণা কটাক্ষ করে বললেন, সমশের-এর চোখেও সেই প্রশ্নই দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম।
স্ট্রোগানিনার কথা কি ভুলে গিয়েছিলে নাকি?মনের ক্ষীণ সন্দেহটাকে তবু প্রশ্রয় না দিয়ে সমশেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, শুধু তো দুটো জিনিসই আনতে দিয়েছি চোখন আর-স্ট্রোগানিনা। তারই আসলটা ভুলে গেলে?
আজ্ঞে? এবারও কাতর বিহ্বল প্রশ্নটা আমাদেরই, ওগুলো কী খাবার-দাবারের নাম?
হ্যাঁ, আমাদের এইটুকু বুদ্ধির পরিচয়েও যেন কৃতার্থ হয়ে ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন, চোখনকে মালাই চিজ-এর একরকম কুলপি বলতে পারো। তবে নোনতা। আর স্ট্রোগানিনা হল বরফে জমানো কাঁচা মাছ।
ইয়াকুট হয়ে তাদের সবচেয়ে পেয়ারের খাবার স্ট্রোগানিনা জানবে না! এমনটা হতেই পারে না। ভুলে যাবার কারণ তাই অন্য কিছু বলে ধরে নিয়েছিলাম।
