মেসের জন্য নতুন বাড়ি কোথাও— শিবু কথাটা শুরু করতেই আমরা তাকে এই মারি তো সেই মারি।
আবার বাড়ি, আবার মেস! লজ্জা করে না?
আমি তো দেশ ছেড়েই চলে যাব ঠিক করলাম! শিশির তার অটুট সংকল্প জানায়।
কোথায় যাবি? আমি শিশিরের সঙ্গী হবার জন্য তৈরি হই—কটক, না কাটামুণ্ডু?
কটক, না কাটামুণ্ডু?–শিশির যেন অপমানে জ্বলে ওঠে—তার বদলে বেহালা বঁড়শে বললেই পারতিস। ওর নাম দেশ ছেড়ে যাওয়া? যাব কঙ্গো কি কটোপাক্সি।
এই? আমিই বা কম যাই কেন? তোকে একটু পরীক্ষা করে দেখলাম। দেশ যদি ছাড়তেই হয় তা হলে কঙ্গো আর কটোপাক্সি কেন? যাব আঙ্গারা বেসিন কি কুইন মড রেঞ্জ!।
ও আর এমন কী!—শিশির হালে পানি না পেলেও, ভাঙে তবু মচকাতে চায় —আরও দূর গেলেই হয়!
আরও দূর এ পৃথিবীতে যাবার কোথাও নেই যে! ঘনাদাকে তাতাবার আশায় সেদিন সকালেই ভূগোল হাটকানো বিদ্যের জোরে আমি শিশিরকে পেড়ে ফেলি—
আঙ্গারা বেসিনটা হল উত্তর মেরুতে, আর কুইন মড রেঞ্জ দক্ষিণ মেরুতে।
বেশ একটু থমথমে অবস্থা। ঘনাদার অভাবের শোকটা এমন একটা মোক্ষম টেক্কা দেওয়ার বাহাদুরিতে একটু যে হালকা করব তার কি জো আছে তবু?
ও মেরু-টের কিছু নয়!—গৌর বিদ্যে জাহির করবার আর যেন সময় পেল না—যেতে হলে যাও আল আজিজিয়া, নয়তো নর্থ ভোস্টক!
আমরা সবাই কি একটু ভ্যাবাচাকা?
ভেতরে যা-ই হই, বাইরে ধরা দেবে কে?
আমি ঘনাদার নাসিকাধ্বনির অক্ষম অনুসরণ করে অবজ্ঞাভরে বলি, তা ওর চেয়ে ভাল জায়গা ভেবে না পাও তো ওই দুটোর একটাতেই যাও।
ভাল নয়, সবচেয়ে খারাপ জায়গা বলেই যেতে চাইছি! গৌর আমার। খোঁচাটাকে ভোঁতা করে দিয়ে বলে, একেবারে জ্বলন্ত চুলোয় ঝলসাতে চাও তো যাও লিবিয়ার আল আজিজিয়া। থার্মোমিটারের পারা ১৩৬.৪ ফারেনহাইটে গিয়ে পৌঁছয়, আর মাইনাস ১২৬.৯-এ যদি জমে বরফের চাঁই হতে চাও তো যাও দক্ষিণ মেরুর নর্থ ভোস্টক এ দুনিয়ার সবচেয়ে ঠাণ্ডা জায়গা।
ওইমিয়াকন!
হৃদ্যন্ত্রগুলো লাফ দিয়ে প্রায় মুখের হাঁ দিয়েই বেরিয়ে যায় আর কী! ক্ষীণ হলেও গলাটা শুনেই চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখি বৈঠকঘরের দরজায় সশরীরে স্বয়ং ঘনাদা। কিন্তু যেভাবে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, এখুনি পড়ে যাবেন যে! কী যেন কোনও মিঞার সম্বন্ধে ভুলও বকছেন তো।
ধরাধরি করে এনে তাঁর মৌরসি কেদারায় বসিয়ে পাখাটা ফুল স্পিডে চালিয়ে দেবার পর আসল কথাটা খেয়াল হয়। আরামকেদারা আর হাওয়ায় কী হবে? দরকার তো এখন অন্য কিছুর!
আপনার পথিাগুলো এখানেই আনতে বলি, ঘনাদা? ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করি।
পথ্যি শুনে ঘনাদার মুখে ক্ষণেকের জন্য একটু যদি ছায়া নেমে থাকে তো গৌরের ব্যাখ্যাতেই তা কেটে যায়!
অত পথ্যি আবার এখানে ধরানো মুশকিল! গৌর বেশ চিন্তিত হয়ে বলে, মটন আর চিকেনের ক-টা প্লেটেই তো এ ছোট টেবিল ভরে যাবে?
সব প্লেট আবার দরকার কী? শিশির সুযুক্তি দেয়, বাছাই করে গোটা কয়েক আনলেই তো হয়। ঘনাদা তো আর সব খাবেন না।
শিশিরের প্রস্তাবটা শেষ হতে না হতেই ঘনাদার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা যায়, না, না, খাবার ঘরেই চলল। এতটা যখন এসেছি তখন এটুকুও পারব?
গলাটা সাত দিনের সাবু খাওয়া রগির মতো চিচি করলেও ঘনাদা আমাদের সমর্থনের অপেক্ষায় না থেকে নিজে নিজেই ইজিচেয়ার থেকে উঠে বেশ চটপটে পা বাড়িয়ে দেন।
পিছু পিছু গিয়ে খাবারঘরে তাঁর সঙ্গে এবার বসতে হয়।
তা টেবিলটা যে ভালই সাজানো হয়েছে ঘনাদার চোখ দেখেই তা বোঝা যায়। ঘনাদা কোন দিকে যে প্রথম হাত বাড়াবেন যেন ঠিক করতে পারেন না। গলাটা অবশ্য তাঁকে এখন চামচিকের মতোই রাখতে হয়।
এত সব খাবার করতে গেলে কেন আবার? ঘনাদার করুণ গলার মৃদু অনুযোগ।
তা হলে দু-একটা তুলে রাখি! গোর যেন সে অনুযোগে লজ্জা পেয়ে ভুল শোধরাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
আহা! আবার তোলাতুলির কী দরকার! চিঁচিঁ গলা প্রায় চিঁহি হয়ে ওঠে ঘনাদার। খালার আগলাতে টেবিলের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েন বুঝি!
তা, সাজানো টেবিলের মান ঘনাদা রাখলেন। খাওয়া শেষ করে শিশিরের দেওয়া সিগারেট ধরিয়ে যখন তিনি আবার আসরঘরের আরামকেদারার শোভা বাড়ালেন তখন টেবিলের প্লেটগুলোয় পিঁপড়ে কেঁদে যাচ্ছে বললে খুব বাড়িয়ে বলা হয় না। তাঁর চিচি গলাও তখন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অবশ্য।
বনোরিকে খাবার জল দিয়ে যাবার হাঁকে গলার এই উন্নতি দেখেই ভরসা পেয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারলাম, শেষ পর্যন্ত জংশন তা হলে পেলেন?
জংশন নয়, জিন-সেঙ, শিশির সংশোধন করলে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই জংশন-ই হোক, আমি সংশোধনটায় এমন কিছু দাম না দিয়েই বললাম, আর জিন-সে-ই বলি, ঘনাদা যে পেয়েছেন এই আমাদের ভাগ্য।
কিন্তু কই আর পেলাম! ঘনাদা আমাদের মুখের হাঁ-গুলো খানিক বুজতে না দিয়ে বললেন, জিন-সেঙ কলকাতা শহরে তো ছার, ইন্ডিয়াতেই কোথাও আছে কি না বলতে পারি না।
কিন্তু জিন-সেঙ না পেলে তো আপনার—
শিবু ঘনাদার দিকে চেয়ে উদ্বেগে আশঙ্কায় কথাটা আর শেষ করতে পারলে না।
জিন-সেঙ না পেয়ে থাকলে ঘনাদা এক টেবিল খানা সাফ করে কীসের ধাক্কা সামলালেন সে প্রশ্নটাও তখন আমাদের মনে উঁকি দিচ্ছে।
ঘনাদা সব উদ্বেগ আশঙ্কা কৌতূহলই ঠাণ্ডা করলেন।
বনোয়ারির নিয়ে আসা জলের গেলাসটা প্রায় এক চুমুকেই খালি করে কোঁচার খুঁটে জলের সঙ্গে মুচকি হাসিটাও যেন মুছে বললেন, হ্যাঁ উপায় নেই, তাই জিন-সেঙের সস্তা বদলি দিয়েই কাজ সারতে হল।
