রহস্যটা কিন্তু বোঝা গেছে পরের দিনই। আমরা যথারীতি সকালে নিষ্ফল হাজিরা দিয়ে ফিরে এসেছি।
খানিকবাদেই ওপর থেকে সেই পেটেন্ট গলা শুনে উৎসুক হয়ে কান খাড়া করতে হয়েছে।
ঘনাদা বনোয়ারিকে ডেকে ডেকে কী বলছেন। কথাটা জনান্তিকেই বলা হচ্ছে। নিশ্চয়, তবে বাহাত্তর নম্বরের বাইরের গলি ছাড়িয়ে সদর রাস্তা পর্যন্ত কারও কাছে তা অশ্রত থাকা উচিত নয়।
হ্যাঁ, বলবি ডাক্তারখানায় যাচ্ছি, বুঝলি! ঘনাদা তারস্বরে তাঁর গোপন সংবাদটা জানিয়েছেন, যারা সব আসবে তারা যতই কাকুতি-মিনতি করুক, বড়বাজারে যে গেছি তা বলবি না। তাতেও যদি না শোনে তো আর দেখা হবে না বলে বিদেয় করবি, বুঝেছিস?
আমাদের হাত-পা প্রায় ভেতরে সেঁধিয়ে যাবার অবস্থা।
না, ঘনাদার দর্শনপ্রার্থীদের ভিড়ের ভয়ে নয়, বড়বাজার ডাক্তারখানা এইসব গোলমেলে কথা শুনে।
হঠাৎ তাঁর ডাক্তারখানায় যাবার কী দরকার পড়ল?
টঙের ঘর থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তাই তাঁকে ঘিরে ধরি।
ডাক্তারখানায় কেন, ঘনাদা? কী হয়েছে!
মানুষের শরীরের কথা কিছু বলা যায়! নীরব না থেকে আমাদের ওপর কৃপা করে ঘনাদা উদাসীন দার্শনিক হয়ে ওঠেন, শরীর থাকলেই ব্যাধি আছে!
ও বাবা! আমরা সেখানেই প্রায় বসে পড়ি আর কী! এর চেয়ে কথা বন্ধ যে ভাল ছিল, কিংবা জ্বলন্ত গলার বকুনি! এ মূর্তিমান বৈরাগ্যশতককে সামলাব কী করে?
তবু যা তোক একটা চেষ্টা করতেই হয়।
অসুখ করেছে আপনার? আমরা শশব্যস্ত হয়ে উঠি, তা আপনি ডাক্তারখানায় যাবেন কী! আর সেই বড়বাজারে। আমরা এখুনি ডাক্তার ডেকে আনছি!
ডাক্তার! ঘনাদা এমন একটা গলার স্বর আর মুখভঙ্গি করেন যেন নতুন হাওড়া ব্রিজ বানাতে আমরা নাপিত ডাকবার কথা বলেছি।
কেন? আমরা অপ্রস্তুত হয়ে নিজেদের মূঢ়তার কৈফিয়ত হিসেবে বলি, ডাক্তার কিছু করতে পারবে না? ডবল এম আর সি পি, এফ আর সি এস ডেকে আনব।
না, তাতে লাভ নেই। ঘনাদা পরম তিতিক্ষার সঙ্গে জানান, ওদের গাল ভরা ডিগ্রিই আছে, আসল যা জিনিস তা পাবে কোথায়! দেখি জোগাড় হয় কি না! পারি যদি তো ফিরব।
অ্যাঁ! আমরা একেবারে আঁতকে উঠি ভয়ে। ঘনাদা বলেন কী?
আপনার সঙ্গে তা হলে যাই? আমরা আকুল আগ্রহ জানাই।
কিন্তু ঘনাদা যেন শিউরে ওঠেন। সঙ্গে যাবে। তার মানে মুলো খেয়ে যে সর্বনাশটা হয়েছে তা একেবারে মোক্ষম করতে চাও? সঙ্গে কেউ থাকলে ও জিন-সেঙের সন্ধান আর পাব! এমনিতেই এক কণা যদি পাই তা হলে বুঝব নেহাত পরমায়ুর জোর।
এরপর বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় কী!
আচ্ছা, চলি! বলে ঘনাদা যেন ফাঁসিকাঠে উঠতে যাওয়ার মতো করে উদাস মুখে বিদায় নিয়ে যান।
বারান্দায় সিঁড়ির মাথাতেই একবার শুধু ফিরে দাঁড়ান।
দেখো, নেহাতই যদি ফিরি, ঘনাদা নিরাশ শুকনো গলাতেই বলেন, তা হলে জোরালো একটু পথ্যির দরকার হতে পারে। জিন-সেঙের ধাক্কা সামলানো তো সোজা কথা নয়।
আর আমাদের কিছু বলতে হয়?
জিন-সেঙ কী চিজ জানি না। তাতে কী হয়েছে। জোরালো পথ্যি বলতে যা কিছু মাথায় আসে সব কিছুরই জোগাড় রাখতে ত্রুটি করি না।
জোরালো পথ্যি মানে কী? নিজেদেরই জিজ্ঞাসা করি।
উত্তরটাও নিজেরাই দেবার চেষ্টা করি: গরম দুধ, শিঙি, মাগুর, কই-এর ঝোল?
মনটা খুঁতখুঁত করে। ওসব তো দুবলা পাতলা পেট-রোগাদের পথ্যি। তেমন জবরদস্ত কিছুর ধাক্কা কি ওই পানসে পথ্যিতে সামলানো যাবে? তার জন্য তন্দুরি নান, মটনের রগন জোস গোছের কিছু না হলে চলে? অন্তত মটন দোপেঁয়াজা, চিকেন কাটলেট তো বটেই।
বড় ফাঁপড়েই পড়তে হয়। কোনটা ছেড়ে কোনটা রাখব? শেষ পর্যন্ত মীমাংসায় হার মেনে জল-সাবু থেকে শুরু করে শিককাবাব, শোহন হালুয়া পর্যন্ত সব কিছুর জোগাড়েই লেগে যাই।
জোগাড়ের সঙ্গে সঙ্গে হা-হুতাশ আর পরস্পরের দোষ ধরা চলে।
আর ঘনাদা ফিরবেন? কোনও আশাই নেই! যাবার সময় মুখটা কেমন ফ্যাকাশে মেরে গেছে দেখলি না! কিন্তু হঠাৎ হলটা কী? দিব্যি তো বহাল তবিয়তে ছিলেন!
হবে আর কী? হয়েছে ওই মুলো! ওই মুলোই সর্বনাশ বাধিয়েছে।
হ্যাঁ, মুলোতে নিশ্চয় অ্যালার্জি!
তা অ্যালার্জির ওষুধ খেলেই তো হয়। শিবু নিজের অপরাধটা একটু হালকা করবার চেষ্টা করে।
তুই আর তোর ওই মুলোই তো সব নষ্টের মূল! আমরা তার ওপর খেঁকিয়ে উঠি, মুলো আনবার কী দরকার ছিল? আবার কী চিজ খাওয়াব বলে বাহাদুরি!
তা মুলো উনি খেলেন কেন? শিবু দুর্বলভাবে একটা তর্ক তোলে।
খেলেন, মানে ব্রকোলি ভাবতে ভাবতে ভুলে খেয়ে ফেলেছেন নিশ্চয়–
আমরা শিবুর বেয়াড়া প্রশ্নটাকে আমলই দিই না—আর ওই ভুল করে খেয়েই আরও সাংঘাতিক হয়েছে বোধহয় অ্যালার্জি!
আমার তো ভয় হচ্ছে রাস্তাতেই মুখ থুবড়ে না পড়েন।
আমাদের সঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু যেতে দিলেন কই? কেউ সঙ্গে থাকলেই নাকি, সেই জংশন না কী, আর পাওয়া যাবে না।
জংশন নয়, জিন-সেঙ! শিশির সংশোধন করে।
জংশন বা জিন-সেঙ যাই হোক–হতাশ হই আমরা—ও জিনিস কি আর পাওয়া যাবে! শুনলি না, এক কণার জন্য সারা বড়বাজার চষে ফেলতে হবে।
তা হলে?—আমাদের গলা ধরে আসে—তা হলে ওই এক কণা জিন-সেঙ পাওয়া মানে তো ঘনাদার আর না ফেরা! মানে এ বাহাত্তর নম্বর অন্ধকার!
অন্ধকার আবার কীসের? বাহাত্তর নম্বরে আর থাকছি নাকি!
হ্যাঁ, বাহাত্তর নম্বর তো ছার, এ বনমালি নস্কর লেনেই আর ঢুকতে পারব না।
