বিস্ময়ের সঙ্গে সন্দেহটা সেই জন্যই।
কী অবাক চিজ খাওয়াবি! গৌর মুখ টিপে হেসে জিজ্ঞাসা করেছিল, তেরো হাত বীচির বারো হাত কাঁকুড়!
না, না! শিশির সে ঠাট্টায় যোগ দিয়েছিল, নতুন ফসল বলছে যে! নির্ঘাত তা হলে কচু শাক! বর্ষার শেষে মাঠ বন এখন ছেয়ে গেছে না!
এখন কচু বলো ঘেঁচু বলল শিবু নিজের সাফল্যে নিশ্চিত থেকে বলেছিল, খাওয়ার সময় দুবার চেয়ে খাবে!
বটে! আমাকে এবার ফোড়ন কাটতে হয়েছিল, এমন আজব মাল কী নতুন উঠেছে বাজারে! পুঁই মেটুলি নাকি?
না, ব্রকোলি!
আমরা চমকে যথাস্থানে চোখ তুলেছিলাম।
হ্যাঁ, এ সরল সমাধান আর কারও নয়, স্বয়ং ঘনাদার। শিশিরের দেওয়া জ্বলন্ত সিগারেট হাতে আসর ঘরের বিশেষ আরামকেদারায় অর্ধ নিমীলিত চোখে শায়িত তাঁর উপস্থিতির কথাটা ভুলে যাওয়া আমাদের উচিত হয়নি।
কিন্তু ব্রকোলি? সে আবার কী!
আমাদের প্রায় সকলেরই মনের প্রশ্নটা মনের মধ্যেই চাপা থেকেছে।
গৌর ওর মধ্যে একটু ওয়াকিবহাল হবার চাল দেখিয়ে মুরুব্বির মতো বলেছে, ব্রকোলি কী জানিস তো? এক রকম কী বলে–কী বলে—
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই তো যাকে বলে–আমি বিজ্ঞের মতো গৌরের পন্থাই ধরেছি।
শিশির আর এক ধাপ এগিয়ে ঘনাদাকেই যেন সমর্থন করে জানিয়েছে, ঠিক ধরেছেন, ঘনাদা! শিবু হাঁ করতেই বুঝেছি যে ব্রকোলি ছাড়া আর কিছু নয়। বাজারে এখন তো ব্রকোলিরই ওঠবার সময়।
ঘনাদার ভুরু জোড়া একটু কি কুঁচকেছে।
শিবুকে হার মানাবার উৎসাহে অতটা লক্ষ করিনি তখন। তার বদলে শিবুর চেহারাটাই যেন কেমন কেমন লেগেছে। নতুন সওদার তার চমকে দেওয়ার প্যাঁচটা ধরা পড়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু তাইতেই মুখোনা কি অমন ভ্যাবাচাকা দেখায়।
দুপুরবেলা খেতে বসে ব্রকোলি হঠাৎ মুলো হয়ে যাওয়ায় হতাশ কিন্তু খুব হইনি। পালংশাক দিয়ে নতুন মুলোর ঘণ্ট বেশ তৃপ্তি করেই খেতে খেতে শিবুকে তারিফ করেছি।
তা, তোর ব্রকোলি তো সত্যি খাসা দেখছি, শিবু!
শিবু ডাইনে বাঁয়ে না চেয়ে নিজের থালাটার ওপরেই অখণ্ড মনোযোগ দেওয়ায় আরও তাতিয়ে বলেছি, এরকম ব্রকোলি রোজ রোজ এখন আনিস।
ব্রকোলি! ভাতের তালের ওপর মুলো-পালং-ঘণ্টর একটি ছোট পাহাড় সাফ করতে করতে ঘনাদা আমাদের দিকে ভ্রুকুটিভরে চেয়ে বলেছেন, কই, ব্রকোলি কোথায়?
কোথায় আর! আপনার পাতে! শিশির বাঁকা হাসির সঙ্গে জানিয়েছে, শিবুর ব্রকোলির ঘণ্টই তো খাচ্ছেন?
ব্রকোলির ঘণ্ট খাচ্ছি! ঘনাদার গলা ভারী হয়ে উঠেছে, এ-ঘণ্টে ব্রকোলি
আছে!
আছে বই কী! গৌরের হঠাৎ বেয়াড়া রসিকতার ঝোঁক চেপেছে। এখন শুধু অন্য নামে আছে মর্ত্যলোকে! আপনার যা ব্রকোলি তাই এখানে মুলো!
মুলো! ঘনাদা মুলো-পালঙের শেষ গ্রাসটা যথাস্থানে পাঠিয়ে যেন শিউরে উঠে বললেন, ব্রকোলি আর মুলো এক! জানো ব্রকোলি কাকে বলে? জানো বাঁধাকপির গাঞী আর ফুলকপির মেল মিলিয়ে ব্রকোলির বিবর্তন ঘটাতে কত যুগের সাধনা লেগেছে? জানো–
অত জানাজানির দরকার কী, ঘনাদা! ঘনাদাকে তাঁর ভাষণের মধ্যে থামিয়ে দিয়ে শিশির সবচেয়ে মারাত্মক ভুলটি এবার করে ফেলেছে, যার নাম ভাজা চাল তার নামই মুড়ি। ও মুখে যখন ভাল লাগছে তখন ব্রকোলিও যা মুলোও তাই ধরে নিন না।
ধরে নেব? ব্রকোলি আর মুলো এক বলে ধরে নেব! ঘনাদার ধাপে ধাপে ওঠা গলায় মেঘ-গর্জন শোনা গেছে, তার মানে ব্রকোলির নামে আমায় মুলো খাওয়ানো হয়েছে! মুলো!
শেষ কথাটা যেন চাপা আর্তনাদের মতো বেরিয়েছে ঘনাদার গলা থেকে।
আমরা এইবার প্রমাদ গনেছি। শিবু কাতর হয়ে বলেছে, কেন ঘনাদা, মুলোগুলো তো খারাপ ছিল না।
বলছিলাম কী, ঘনাদা! গৌরও অনুতপ্ত হয়ে শান্তির সাদা পতাকা উড়িয়েছে, খাওয়া যখন হয়েই গেছে তখন আজকের মতো ক্ষমা-ঘেন্না করে নিন।
ঘনাদার কানে যেন এসব কথা পৌঁছোয়ইনি। আমাদের উপস্থিতিই ভুলে গিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে তিনি ডাক দিয়েছেন, রামভুজ!
রামভুজ ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসে সভয়ে বলেছে, হ্যাঁ, বোলিয়ে বড়া বাবু!
কী বলবেন আর কী করবেন এবার ঘনাদা? আমরা দুরু দুরু বুকে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে ইষ্টনাম জপ করেছি। ঘনাদা কি খাওয়া ছেড়ে উঠে যাবেন? সেই কথাই বলতে ডেকেছেন রামভুজকে?
না, তা নয়। মুলোর ঘণ্টের চাঁছাপোঁছা থালাটা শুধু বদলে দিতে বলেছেন ঘনাদা।
তারপর নিঃশব্দে সব খাওয়া শেষ করে সেই যে টঙের ঘরে উঠে গেছেন, আর আমাদের সঙ্গে বাক্যালাপই নেই বললেই হয়।
চেষ্টার ত্রুটি আমরা কি কিছু করেছি? মোটেই না। সকালে বিকেলে গিয়ে ধন্না দিয়েছি তাঁর দরজায়।
তাতে ঘনাদার আবাহনও নেই বিসর্জনও নেই। আমাদের যেন দেখেও দেখেননি। নেহাত আমরা নাছোড়বান্দা বলে হু হাঁ দিয়ে সেরেছেন।
বালাখানা থেকে এই সবচেয়ে সরেস অম্বুরি তামাক আনলাম, ঘনাদা! আমরা স্বস্ত্যয়নের নৈবেদ্যটা তাঁর সামনে ধরে দিয়েছি কখনও।
হুঁ, তিনি সেটার দিকে একবার দৃকপাত করে আবার নোটবুকের মতো ছোট কী একটা বই-এর পাতা উল্টোতে তন্ময় হয়ে গেছেন।
কী এমন বই-এ ঘনাদার হঠাৎ মনোযোগ? সকালে বিকেলে বার কয়েক তাঁকে সেই বই-এ ড়ুবে থাকতে দেখে অনেক চেষ্টা করেও সেটার মর্ম উদ্ধার করতে পারিনি।
সংক্ষিপ্ত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিশ্চয়! ঘনাদার ঘর থেকে ফেরার পর শিবুর অনুমানটা আমাদের মনে লেগেছে। কিন্তু ঘনাদার হঠাৎ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় এত আঠা কেন?
