জায়গাটা কোথায়? আমাদের সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসা।
নকশায় যদি ভুল না করে থাকে, ঘনাদা আমাদের প্রতি যেন কৃপা করে বললেন, তাহলে বাহাত্তর নম্বরকে ঘাঁটি ধরে সকাল নটায় সূর্যের সঙ্গে অবটিউস অ্যাঙ্গল-এ নীলমণির বাজারটাই হবে। সেইখানেই পরের রবিবার সকালে ন-টায় কারও অপেক্ষা করার কথা।
ঘনাদা কি গুল মারতে মারতে নিজের মাথায় সত্যিই গোল বাধিয়ে বসলেন! সূর্যের সঙ্গে অবটিউস অ্যাঙ্গল। এ সব কী প্রলাপ?
ওই নকশার মধ্যে এত কাণ্ড? আমরা একটু কড়া হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, এ নকশার হদিস তো বলিভিয়ায় আপনার সেই ফেলে দিয়ে আসা চিরকুট থেকেই আপনার আহারা পেয়েছে। কিন্তু আপনি পেলেন কোথায়? সেই মৌচাক থেকে! তা থেকে মধু খেতে গিয়ে নকশা করলেন কী আর তা থেকে পালাবার পথের হদিস বা পেলেন কী করে?
নকশা করলাম–নাচ! ঘনাদা আমাদের দিকে অনুকম্পাভরে চাইলেন।
নাচ?
হ্যাঁ, নাচ, মৌমাছিদের! ঘনাদা ধৈর্য ধরে ব্যাখ্যা করলেন, মৌমাছিরা রোঁদে। বেরিয়ে কোথাও মধুর সন্ধান পেলে চাকের আর সবাইকে তা জানায় নানা ধরনের নাচ দিয়ে। এক এক নাচের নকশায় এক এক রকম ইঙ্গিত। যেমন কাছাকাছি চারিদিকেই মধুভরা ফুল থাকলে এই নাচ।
আর অন্তত একশো গজের চেয়ে বেশি দূর-দূরান্তরের ফুলের হদিস দিতে তারা যে নাচ নাচে, তখনকার আকাশে সূর্যের অবস্থানের সঙ্গে তাদের নাচের নকশায় মাঝের রেখা আর গতির অ্যাঙ্গল অর্থাৎ কোণ মেপে তা বুঝতে হয়। যেমন এই নাচের বেলা মাঝখানের ফুটকি দেওয়া রেখাটাকে সূর্যের বলে ধরে নিয়ে জোড়া ডিমের মতো নকশার তির মার্কা লাইনটার সঙ্গে তার অ্যাঙ্গলটা দিয়ে ফুলের মাঠের হদিস মেলে। ওই নকশা অনুসারে ফুলের খেত হবে মৌচাক থেকে এই দিকে মৌমাছিরা যত ধীরে ধীরে নাচবে ফুলের মাঠ তত দূর বলে বুঝতে হবে।
যেখানে আমায় বন্দী করেছিল তার চারিদিকেই প্রায় অপার জলা। কিন্তু মৌমাছিদের নাচ থেকেই আমি বুঝেছিলাম এক দিকে কোথাও শক্ত ডাঙা আছে। নাচ থেকে কোন দিকে তা খুঁজতে হবে তারও হদিস পেয়েছিলাম।
ঘনাদা আমাদের হতভম্ব মুখগুলোর দিকে করুণাভরে চেয়ে সিগারেটের টিনটা নিয়ে উঠে গেলেন এবার। যেতে যেতে আসল কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যেতে ভুললেন না, আমার ঘড়িটার কথা ভুলো না শিশির।
হাতঘড়ি কি দেওয়াল ঘড়ি নয়—নিজের মর্যাদার উপযুক্ত একটি ট্যাকঘড়ির শখ হয়েছে ঘনাদার। আমাদের সেটি খুঁজে এনে দিতে হবে।
ঘনাদার সঙ্গে আমাদের বর্তমান সুদীর্ঘ সন্ধির এই হল রহস্য।
হ্যাঁ, পরের রবিবার সকাল নটায় নীলমণির বাজারে গিয়ে আহারা নয়, রাহাকে পেয়েছিলাম।
সে যেমন, আমরাও তেমনই তাজ্জব!
আহারা-ই তাকে পাঠিয়েছে কি না, প্রায় জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম।
মুলো
হ্যাঁ, মুলো। আর কিছু নয়, মুলো।
তাই নিয়েই তুমুল কাণ্ড!
আমাদের শিবু নেহাত মরমে মরে আছে তাই, তা না হলে তার অনুপ্রাসের বাতিকে নিশ্চয় বলত, মুলোবানানটা হ্রস্ব উ দিয়েই করলাম—তা থেকেই আমাদের বাহাত্তর নম্বরের আমূল পরিবর্তন। কিংবা এখান থেকে আমাদেরই নির্মূল হবার অবস্থা।
সামান্য মুলোর বাজারে নতুন উঠেছে। শিবু তাই খুব খুশি মনে গণ্ডা দুয়েক কিনে এনে আড্ডা ঘরে তাই নিয়ে আবার একটু জাঁক করেছিল।
আজ একটা জিনিস যা খাওয়াব! মরশুমের একেবারে প্রথম ফলন!
আমরা সকলেই একটু অবাক হয়ে শিবুর দিকে চেয়েছিলাম। সেই সঙ্গে একটুও সন্দিগ্ধও।
শিবুর মুখে বাজার সম্বন্ধে এরকম বাহাদুরির দাবি বেশ অস্বাভাবিক! বাজার করার নাম শুনলেই আগে সে তো ব্যাজার হয়ে থাকত। বাজারের পালা পড়লে প্রথমে সে নানা অজুহাতে এ দায় এড়িয়ে আর কারও ঘাড়েই চাপাবার চেষ্টা করত। তাতে সফল হলে এমন বাজার করে আনত যে আমাদের পাঁচক চূড়ামণি রামভুজের রান্নার জাদুর হাতেও সে সব জিনিস মুখে তোলবার যোগ্য হত না।
একটা দিন ঘনাদার মুখ আষাঢ়ের মেঘ হয়ে থাকত। সে মেঘ কাটাতে পরের দিন আমাদের বাজার খরচটা বাধ্য হয়েই যে ডবল করতে হত তা বলাই বাহুল্য।
নিজেদের খাওয়া নষ্ট হওয়া আর এই উপরি খরচার সমস্ত গায়ের ঝাল শিবুর ওপর গিয়ে পড়ত।
কিন্তু সব গাল-মন্দ দাঁত-খিচুনি শিবু ঠেকাত করুণ মুখের একটি ছোট্ট জবাবে আমি কি বাজার করতে জানি! কিছু যে চিনি না!
ওই এক বাজারের ধাক্কাতেই তার পর পারতপক্ষে শিবুর ওপর বহুদিন ওভার দেওয়া হত না।
কিন্তু সম্প্রতি হঠাৎ শিবুর এক অদ্ভুত পরিবর্তনে আমরা বেশ একটু অবাক অবশ্য হয়েছি। ক-দিন হল শিবু নিজে থেকেই বাজারের ভারটা নিতে এগিয়ে আসছে!
এ-সুমতির রহস্যটা শিশিরের কাছেই জানা গেছে। শিবু নাকি কোথায় শুনেছে বা পড়েছে যে, ভীমসেনের স্বাস্থ্য নিয়ে মার্কণ্ডেয়-র পরমায়ু পেতে হলে নিজে হাতে বাজার করতে হয়। সব দীর্ঘজীবী বড় বড় লোকেরা নাকি তাই করেছেন ও করেন।
এই কিছুকাল আগেই স্যার যদুনাথ সরকার পর্যন্ত।
তা শিবুর বাজারে আমরা খুব কষ্টে আছি এমন কথা বলতে পারব না। এই সেদিন পর্যন্ত পোকা ধরা বেগুন, পাকা তেঁড়স, পচা আলু আর বাসি মাছ ছাড়া বাজারে আর কিছু যে খুঁজে পেত না, এখন তার পছন্দর তারিফই করতে হচ্ছে মনে মনে। বাজারের টাটকা সওদা আর তার সঙ্গে এটা-ওটা নতুন কিছু প্রায় রোজই আমাদের ভাগ্যে জুটছে।
বাজার নিয়ে তার হামবড়াইটা কিন্তু এই প্রথম।
