কথা দিয়ে বাজি না রাখলে আমরা কী করি, জানেন? মুখে হাসি আর গলায় হিংস্র শাসানি নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছে আহারা।
কী?
এই! বলে আহারা হঠাৎ এসে আমায় ধরেছে আর দুটো ডিগবাজি খেয়ে আমি সাত হাত দূরে ছিটকে চিৎপাত হয়ে পড়েছি।
আহারা আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে এবার বলেছে, এর নাম জুদো! কেমন, বাজি এবার রাখবেন?
নাঃ, লোকটার যেন বড় বেশি গরজ! ব্যাপারটা তাই তলিয়ে দেখা উচিত মনে হয়েছে।
যেন ভাঙা হাড়গোড় নিয়ে অতি কষ্টে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ককিয়ে বলেছি, আর বাজি না রেখে পারি! হাড়গোড়গুলো তাহলে যে আর খুঁজে পাব না।
এই তো মরদের মতো কথা। আহারা আমার পিঠে একটা চাপড় মেরে ধনুক করে দিয়ে বলেছে, পুয়ের্তো সুয়ারেজ-এ পৌঁছেই আমি আপনাকে আমার হেলিকপ্টারে এক জায়গায় নিয়ে যাব, সেখানেই পরীক্ষা হবে।
যে কথা সেই কাজ। পুয়ের্তো সুয়ারেজ-এ পৌঁছে ইগ্নাসিওর ভিটেবাড়ির পুরনো দলিলটা একবার দেখতে পর্যন্ত না দিয়ে আহারা আমায় নিয়ে তার হেলিকপ্টারে রওনা হয়েছে। ইগ্নাসিওকে বলে দিয়েছে তার দলিল নিয়ে সে যেন সুয়ারেজ-এ অপেক্ষা করে।
আমার সঙ্গে কড়ার যা হয়েছে তা এই—আমায় অজানা এক জঙ্গলের মাঝে নামিয়ে হাত-পা বেঁধে এক জায়গায় ফেলে রেখে সে হেলিকপ্টার নিয়ে কাছেই এক জায়গায় সাতদিন অপেক্ষা করবে। সাতদিনের মধ্যে আমি যদি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সবচেয়ে কাছের বড় জনপদে পৌঁছোতে পারি তাহলে আমার জিৎ। জিতি বা হারি হেলিকপ্টার নিয়ে সে আমার ওপর নজর রাখবে ও শেষ পর্যন্ত আমায় তুলে নিয়ে ফিরে যাবে।
আহারা তার বদলে গোড়াতেই বেইমানি করেছে। কেন যে করেছে তা তখন জানতে আমার বাকি নেই। অতিরিক্ত উৎসাহে হাত-পায়ের বাঁধন তাই খুলতে আমার দেরি হয়নি।
কিন্তু তারপর? হেলিকপ্টারে নামবার সময় ওপর থেকে জায়গাটার একটা ধারণা করে নিতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শূন্য থেকে দেখা ছবি মাটির ওপর অনেক সময়ে ভুল হদিসই দেয়। এ চরম নির্বাসন থেকে মুক্তি পাব কেমন করে?
মুক্তির উপায় হল একেবারে আশাতীতভাবে। হতাশ হয়ে দ্বীপের মতো চরটার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ক-টা মৌচাকের সন্ধান পেয়ে গেছি। খিদের জ্বালায় তারই একটা খুঁচিয়ে ভাঙতে গিয়ে ভাঙা আর হয়নি। তার বদলে পকেট থেকে নোটবই আর পেনসিল বার করে নকশা কাটতে শুরু করেছি পাগলের মতো।
কী ভাগ্যি, নোটবই আর পেনসিলটা পকেটে ছিল। ঘণ্টা কয়েক ধৈর্য ধরে গোটা দুয়েক নকশা একেবারে নিখুঁত করে এঁকে ফেলেছি।
খিদের কথা ভুলে আপনি নকশা আঁকলেন? আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি, কী সে নকশা?
ওই তোমাদের পিয়ন বই-এ পাঠানো চিঠির মতোই! ঘনাদা হেসে বললেন, তবে একটু আলাদা।
ঘনাদা আমাদের হাতের চিঠিটাই টেনে নেন। তারপর শিশিরের কলমটা চেয়ে নিয়ে দুটো এই রকম নকশা–

ঘন ঘন করে এঁকেই ফেলে দেন আমাদের সামনে।
এ নকশায় হল কী? আমাদের গলা প্রায় ধরা।
হল আর কী! ঘনাদা যেন উদাসীন, সাত দিনের জায়গায় দুদিনে সে নির্বাসনের চর থেকে বেরিয়ে মাদ্রে দে দিয়স আর বেনি নদী যেখানে মিলেছে। সেখানকার মোরেনো শহরে পৌঁছে সেখান থেকে সরকারি প্লেনে পরের দিনই পুয়ের্তো সুয়ারেজ পৌঁছে গেলাম।
যা ভেবেছিলাম তাই। শহর থেকে ইগ্নাসিওর বাড়ি গিয়ে দেখি, আহারা তাকে নিয়ে তার হেলিকপ্টারে সান্টাক্রুজ রওনা হবার জন্য প্রায় তৈরি।
আমায় দেখেই যেমন তাজ্জব তেমনই খাপ্পা।
আপনি! আপনি তাহলে বার হতে পেরেছেন? তা এখানে এসেছেন কেন? আহারার গলার আওয়াজে দাঁতের ঘর্ষণের শব্দ মেশানো।
এখানে আসতে হল বাজির টাকাটা নিতে! মোলায়েম করে বললাম।
টাকার কথা কিছু হয়নি, কথাগুলো আহারা প্রায় যেন গুলির মতো ছুড়ে মেরে হেলিকপ্টারটা চালাতে গেল।
টাকার কথা না হয়ে থাকলে, আরও ভাল! আমি আহারাকে ধরে ফেলে হাসি মুখে বললাম, বাজি জিতে একটা অন্য কিছু লাভ তো হওয়া চাই। টাকার বদলে ইগ্নাসিওর দলিলটা দেখলেই আমি সন্তুষ্ট হব।
তাহলেই সন্তুষ্ট হবি! জুদোর শিক্ষাটা বড় তাড়াতাড়ি ভুলে গেছিস মনে হচ্ছে! আহারা জুদোর কড়া প্যাঁচ কষল।
গজ দশেক দূর থেকে যত্ন করে তুলে থুবড়ে-পড়া মুখের ধুলোমাটি রুমাল বার করে ঝেড়ে দিতে দিতে বললাম, এর নাম কারাটে। জুদোর বাবা বলে জাপানে। এখন ইগ্নাসিওর দলিলটা দেখাতে আর আপত্তি আছে?
আপত্তি কেন থাকবে?আহারা এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে আর-এক মানুষ। আমার হাতে দলিলটা চটপট দিয়ে বলতে লাগল, বোকা পেলে কে না ঠকাতে চায়। ওর বংশের প্রায় ভুলে যাওয়া টিনের খনিটা জলের দরে কিনে নেবার তালে ছিলাম। আপনি যখন ওর মুরুব্বি হয়েছেন তখন ন্যায্য দামই দেব।
তা-ই দিয়েছিল আহারা। সই-সাবুদ হবার পর শুধু মিনতি করে জিজ্ঞেস করেছিল, কেমন করে সেই চর থেকে পথ খুঁজে বার হলাম!
হদিস সেই চরেই রেখে এসেছি। তাকে বলেছিলাম—খুঁজলে পেতে পারো।
হন্যে হয়ে তারপর সে খুঁজেছিল নিশ্চয়। পেয়েও ছিল সেই ফেলে আসা নকশা-আঁকা চিরকুটগুলো।
অনেক বছর ধরে মাথা খুঁড়ে সে চিরকুটের মানে সে বার করতে পেরেছে মনে হয় তার এই চিঠি থেকে। আমার কাছে সে বাহাদুরি জাহির করতে আর এতদিন বাদে আমার কতটা খেয়াল আছে একবার বাজিয়ে নেবার জন্য এ নকশা-আঁকা চিঠি পাঠানো। চালাকি করে আবার নকশার ভেতরে চাকের ছ-কোনা খোপগুলোও এঁকে দিয়েছে। তবে চিঠি তারই লেখা হলেও নিজে সে যাচাই করতে এ শহরে এসেছে। বলে মনে হয় না। বলিভিয়া ছেড়ে আর একবার কারাটের সুখ পেতে এখানে আসবার শখ কি সাহস তার হবে না। তার কোনও সাকরেদ-টাকরেদই এ চিঠির হদিস দেওয়া জায়গায় হাজির থাকবে মনে হয়।