ইগ্নাসিও থার্ড নয়, ফোর্থ ক্লাসের যাত্রী, তবে তার জায়গা আমারই সামনের সেকেন্ড ক্লাস কামরার মাথায়। সেখান থেকে উঠতে নামতে দিনে অনেকবারই তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়। কেমন একটা বোকা বোকা ভালমানুষ চেহারা। দেখা হলেই আমার দিকে চেয়ে হাঁদার মতো হাসে। যে দেশে ধলার চেয়ে আমার মতো কালাই বেশি সেখানে বিদেশি বলে চিনতে পারে বলে মনে হয় না। তবে আমার পোশাক-আশাক ঠিক থার্ড ক্লাসের সঙ্গে মিল খায় না বলেই বোধহয় একটু অভব্যের মতো যখন-তখন তার ফোর্থ ক্লাসের উচ্চাসন থেকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
দু-দশ ঘণ্টার যাত্রা তো নয়, সান্টাক্রুজ থেকে পুয়ের্তো সুয়ারেজ চারশো মাইলের বেশি না হলেও এ ট্রেনে লাগে চার দিন। সেটাও টাইম টেবলের ছাপা সময়। আমাদের লেগেছিল পাক্কা পাঁচ দিন।
এই পাঁচ দিনের যাত্রায় ইগ্নাসিওর সঙ্গে দ্বিতীয় দিনেই আলাপ হয়ে গেল। আলাপ করলে সে নিজে থেকেই। হাঁদার মতো হাসতে হাসতে হঠাৎ একবার জিজ্ঞাসা করে বসল, তুমি ফার্স্ট ক্লাসে যাচ্ছ না কেন! আমার বন্ধু ফার্স্ট ক্লাসে যাচ্ছে।
এই আলাপটুকুতেই ইগ্নাসিওর বুদ্ধির দৌড় বুঝে ফেলেছি। একেবারে হাঁদারাম যাকে বলে, কিন্তু ভারী সরল হাসিখুশি চেহারা। এরকম লোকের ওপর আপনা থেকে মায়া হয়।
হেসে তাই জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বন্ধু যাচ্ছে বলে আমি যাব কেন!
বাঃ! অকাট্য যুক্তি দিলে ইগ্নাসিও, তোমার পোশাক যে আহারার মতো। থার্ড ক্লাসে কেউ এ-পোশাকে যায়!
পোশাকের কথাটা চাপা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বন্ধুর নাম তাহলে আহারা! তা বন্ধু হয়ে সে একা ফাস্ট ক্লাসে যাচ্ছে কেন? তোমাকেও তো নিতে পারত!
কেমন করে নেবে? ইগ্নাসিও বন্ধুর হয়ে ওকালতি করলে, আমার কাছে টিকিটের পয়সা নেই, তাই তো গাড়ির ছাদে যাচ্ছি।
কোথায়, যাচ্ছ কোথায়? ইগ্নাসিওর বন্ধুর বিরুদ্ধে আর কিছু না বলে জিজ্ঞাসা করলাম।
যাচ্ছি পুয়ের্তো সুয়ারেজ-এ গর্বভরে জানালে ইগ্নাসিও, সেখানে আমাদের গাঁয়ের বাড়িতে একটা পুরনো দলিল আছে। সেটা কিনে নিয়ে বন্ধু আমায় অনেক টাকা দেবে। তখন আমি জামাকাপড় কিনে বন্ধুর সঙ্গে ফার্স্ট ক্লাসে ফিরব, জানো!
খুব ভাল কথা, উৎসাহ প্রকাশ করে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু দলিলটা কীসের?
কী-সব টিনের খনি-টনির, ইগ্নাসিও তাচ্ছিল্যভরে বললে, ঠাকুরদাদার কোন ঠাকুরদাদার নাকি ছিল বলে গল্পই শুনেছি শুধু। এক দামড়িও কখনও পাইনি। হ্যাঁ, আমার নাম ইগ্নাসিও ব্যারোসো, তা জান? এই দেখো আমার কার্ড। আমার বয়স আঠারো।
কার্ডটা সে আমার হাতে গুঁজেই দিল।
মাথা নেই মুণ্ডু নেই বেমক্কা এই নিজের পরিচয় দেওয়ার ঘটায় আমি অতি কষ্টে হাসি চেপে কার্ডটা দেখলাম। ছেঁড়া ময়লা একটা ফিকে গোলাপি কার্ড। এই আইডেন্টিফিকেশন কার্ড না থাকলে বলিভিয়ায় কেউ চাকরি-বাকরি পায় না, ভোট দিতে পারে না, এমনকী বিয়ে পর্যন্ত আটকে থাকে। কার্ডটা দেখলাম সাত বছর আগেকার। তখনকার বয়স লেখা আছে আঠারো। তারপর থেকে ভদ্রলোকের এক কথা।
এই ইগ্নাসিও ব্যারোসো। তার বন্ধু আহারার সঙ্গেও আলাপ হল সেই দিনই। নাম শুনে যেমন চেহারা দেখেও তেমনই তাদি জাতের পরিচয়টা ঠিক বোঝা যায় না। বলিভিয়ায় নানা দেশের লোকের মধ্যে চিনা ও জাপানিরাও কয়েক পুরুষ বসত করে আসছে। আহারার চেহারায় চিনের ছাপই একটু যেন বেশি।
বেঁটে খাটো ইস্পাতের গোলার মতো চেহারা। ব্যবহারে অমায়িক ভদ্র শুধু নয়, বেশ একটু মিশুক। ইগ্নাসিওর কী দলিল কিনতে যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করায় প্রথমে একটু চমকে ভুরু কোঁচকালে, তারপর হেসে বললে, ইগ্নাসিও এর মধ্যে সব বলেছে বুঝি! ছেলেটার পেটে কোনও কথা থাকে না। আমি না থাকলে কবে কোন ঠগবাজের হাতে পড়ত!
হ্যাঁ, আপনাকে তো ও বন্ধু বলে! তারিফ জানিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু কী যেন টিনের খনির দলিলের কথা বলছিল?
যার দলিল সে-খনি এতদিন আছে কিনা তারই ঠিক কী! তাচ্ছিল্যভরে বললে আহারা, তবে পুরনো দলিল বলছে, তাই একবার দেখে ওকে কিছু দাম ধরে দেব বলেছি।
আহারা খুব সরল আন্তরিকভাবেই কথাটা বলেছিল। মানুষটার ওপর একটু বিশ্বাসই জন্মেছে তাতে। সে বিশ্বাস একটু চিড় খেয়েছে তার পরদিন।
যেমন লঝঝড় লাইন তেমনি ফঙ্গবেনে ইঞ্জিন। পরের দিন ঘোর এক জঙ্গলের মাঝে ট্রেনটা হঠাৎ মাঝ রাস্তায় বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ ভয়াবহ অবস্থা। এদিকে ওদিকে একশো মাইলের মধ্যে কোনও স্টেশন তো নেই, কোনও বসতিও না। ওই রেল লাইনটুকুই শুধু ভরসা। ট্রেন অচল হলে যাকে বলে একেবারে অকূল পাথারে, লাইন ধরে হাঁটা ছাড়া কোনও উপায় নেই।
সেই আলোচনাই করছিলাম। এমন সময় আহারা হঠাৎ একটু যেন উপহাসের সুরেই জিজ্ঞাসা করেছে, ধরুন এ লাইনটাও যদি না থাকত, এ অজানা জঙ্গলের মধ্যে ছেড়ে দিলে বার হতে পারতেন?
আহারার আসল মতলব তখনও সত্যিই বুঝিনি। হেসে বলেছি, তা বাজি রাখলে পারতাম বোধহয়।
বেশ! রাখলাম বাজি! আহারা নিজের বাঁ হাতটা চিত করে তাতে একটা ঢাপড় দিয়েছে।
কিন্তু আমি রাখছি না। আমি একটু অবাক আর বিরক্ত হয়ে বলেছি, খামোকা ওরকম বাজি রাখতে যাব কেন?
মুখ দিয়ে যখন উচ্চারণ করেছেন বাজি আপনাকে রাখতেই হবে! আহারা জুলুমবাজের মতো বলেছে।
না, রাখব না। আমি সত্যি চটে গিয়ে শক্ত হয়ে মাথা নেড়েছি।
