হতভাগা!
হাসি মুখ থেকে বেরিয়েছে বলেই বাঁচোয়া। তবু চমকে উঠতে হল। কিন্তু এ স্নেহের ভৎসনা কাকে? আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। না, আমাদের কারও সে ভাগ্য নয়। তাহলে এ কি রাহা-রই প্রাপ্য? রাহার সব চালাকি ধরে ফেলে তিনি তাকে চিনেও ফেলেছেন!
হতভাগার চ্যালেঞ্জের সাধ এখনও মিটল না! ঘনাদার মুখে প্রশ্রয় আর করুণার হাসি।
না, এ তো রাহা বলে মনে হচ্ছে না! কে তবে?
যে-ই হোক, ব্যাপারটা আমাদের কাছে তো হঠাৎ মরা নদীতে বান, বাঁজা ডাঙায় ধান, ভরাড়ুবি হতে হতে একেবারে মানিক মুক্তোর চড়ায় ঠেকা।
বনোয়ারিটাএখনও করছে কী? তারই বা কী দোষ? ঘনাদার গলাও চড়েনি, সেও নড়েনি।
নিজে থেকেই সুতরাং ডাক দিয়ে আনাতে হয়। স্টাইলের একটু খুঁত থাকে বটে, কিন্তু লক্ষ্য ভেদ হয় ঠিকই। টেবিলের ওপর প্লেটটা ঘনাদা যেন দেখেও না দেখতে পেয়ে শুরু করেন।
বিছানা থেকেই হেলিকপ্টারটার আওয়াজ পেলাম। রোটর অর্থাৎ চরকি-পাখা চালিয়ে উঠতে শুরু করেছে। হেলিকপ্টার তো আর চুপি চুপি চালানো যায় না। গেলে তাই চালাত আহারা। তবে ভয় তার কিছু নেই। যেখানে আমায় বন্দি করে রেখে গেছে সেখান থেকে বার হওয়াই আমার পক্ষে অসম্ভব, তা আওয়াজ পাবার পর হেলিকপ্টার নামা-ওঠার মাঠ পর্যন্ত ছুটে গিয়ে ধরা!
ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু আওয়াজ শুনেই হেলিকপ্টারটা কতদূর উঠে কোন দিকে যাচ্ছে বোঝবার চেষ্টা করলাম—
বোঝবার চেষ্টা করতে করতে ঘনাদার অন্যমনস্কভাবে একটা প্লেটে যেন ভুলে হাত পড়ে যায়। দেড়খানা কাটলেট সেখান থেকে উধাও হবার পর হেলিকপ্টারটা কোন দিকে গেছে বুঝে তিনি যেন তাঁর সেই বন্ধ করা ঘরেই ছোট একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলেন, যা বুঝলাম তাতে আশা করবার আর কিছু নেই।
হতাশ হয়েই ঘনাদা একেবারে চুপ। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে আমরাও ব্যাকুল উদ্বিগ্ন।
শিবুই নিদানটা বার করে ফেলে বলে, আরেকটা কাটলেট দেবে, ঘনাদা!
আরেকটা?—ঘনাদা যেন বর্তমান মর্ত্যভূমিতে নেমে এসে প্লেটের দিকে প্রথম দৃষ্টি দেন—তিন শত্তুর বলে না?
একটা নয়, দুটো কাটলেট অগত্যা আনতে হয় বনোয়ারিকে। এরকম ইমারজেন্সির জন্য আমাদের অবশ্য মজুত করাই ছিল।
বাকি আড়াইখানা কাটলেট আর তার সঙ্গে দু পেয়ালা কফি শেষ করার আগে ঘনাদার হেলিকপ্টার চলে যাওয়ার হতাশা কাটে না।
বনোয়ারি প্লেট সরিয়ে নিয়ে যাবার পর শিশিরের ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত টিন থেকে নিজেই একটি সিগারেট বার করে ধরিয়ে ঘনাদা তাঁর বন্দিদশায় ফিরে যাবার ফুরসত পান।
নিজের অবস্থাটা বোঝবার চেষ্টা করলাম। অজানা ছোটখাটো দ্বীপের মতো একটা চর। তার চারিদিকে যোজনের পর যোজন বান-ভাসা নদীর অগাধ থই থই জল। মৈমনসিংহের হাওড়ের রাজসংস্করণের মতো সে বিশাল জলকে ঘিরে আবার সম্পূর্ণ অচেনা অজানা এমন বিরাট দুর্ভেদ্য ভয়ংকর জঙ্গল যে, সভ্য মানুষের পা পড়া দূরে থাক, তার মাপজোখ পরিচয় মানচিত্রেও ওঠেনি এখনও।
এই চরের মাঝে একটা যেমন-তেমন করে কাদা-মাটিতে ভোলা খুপরি গোছের জংলা আগাছায় ছাওয়া ঘরে মাথা আর পায়ের দিকে পোঁতা দুটো মোটা খুঁটিতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমি পড়ে।
দেশটা হল দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়া, জায়গাটা তারই উত্তর-পুবের বেনি নদীর জলা বাদার অজানা অগম্য অঞ্চল-শুধু বলিভিয়ার নয়, ব্রেজিল-এরও গহন গভীর অরণ্য যাকে ঘিরে রেখেছে।
আহারা এই জায়গার মাঝখানে এমনই নিরুপায় অবস্থায় আমায় বেঁধে রেখে চলে গেল! নিরুপায় অবস্থায় বেঁধে রাখা নিয়ে কিছু বলবার নেই, কারণ শর্তটা তাই ছিল। কিন্তু তার চলে যাওয়াটা অবিশ্বাস্য শয়তানি। সে রকম কোনও কড়ারই ছিল না।
আহারার সঙ্গে মাত্র কিছুদিন আগে পরিচয় হয়েছে। যাচ্ছিলাম বলিভিয়ার আজব ট্রেনে সান্টাক্রুজ থেকে পুয়ের্তো সুয়ারেজ-এ। সে ট্রেন আমাদের হাওড়া-আমতা রেলওয়েরই নিকটজ্ঞাতি।
ইচ্ছে করলে বলিভিয়ার জাতীয় এয়ারলাইন লয়েড এইরিও বলিভিয়ানোর প্লেনেও যেতে পারতাম। ভাড়া আমাদের দেশের হিসেবে শ-খানেক টাকা। কিন্তু তার চেয়ে এই লঝঝড় রেলপথই পছন্দ করেছি দেশটা আর দেশের মানুষকে ভাল করে চেনার সুবিধের জন্য শুধু নয়, এই সস্তা মোেট মাত্র কুড়ি টাকা ভাড়ায় ঢিমে তালের ট্রেনের টহলেই দুরন্ত উত্তেজনার খোরাক অনেক বেশি মিলতে পারে বলে।
মিললও তাই। ট্রেনে আমি থার্ড ক্লাসের যাত্রী। থার্ড ক্লাস হল খোলা একটা ওয়াগন গোছের। রোদ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে চাও তো নিজেই ওপরে কাপড় কি ক্যাম্বিস টাঙিয়ে ছাউনি করে নাও। আলো হাওয়ার অভাব নেই। প্রাণ ভরে দুধারের দৃশ্য দেখারও কোনও বাধা নেই। এর ওপর আর সামান্য কিছু দিলেই সেকেন্ড ক্লাসের বন্ধ বুক-চাপা একটা খুপরি কামরায় দুঃখভোগের চালিয়াতি দেখানো যেত, আর তার ওপর টাকা দশ দিলেই ফার্স্ট ক্লাসের কাঠের কামরায় স্রেফ কাঠের বেঞ্চির আরাম। সব দিক দিয়ে তাই থার্ড ক্লাসই সেরা বোধ হয়েছে, অবশ্য ফোর্থ ক্লাস বাদে। সেটার আবার টিকিটও লাগে না, একটু শুধু হুশিয়ার থাকতে হয় ঘুমের ঢুলুনিতে পড়ে না যাওয়ার জন্য। হাওড়া-আমতার খেলনা-ট্রেনে গাড়ির ছাদে এ ফোর্থ ক্লাসের নমুনা আমাদের দেখা আছে।
থার্ড ক্লাসে যাওয়া শুধু যে নিজে থেকেই বেছে নিয়েছিলাম তা বোধহয় নয়, তার পেছনে নিয়তির অলক্ষ্য হাত নিশ্চয় ছিল, ইগ্নাসিওর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবার জন্যই।
