এতদূর পর্যন্ত কোনও রকমে বরদাস্ত করেছি। থান ইট আর কোথায় পাব! হাতের কাছে একটা ডিকশনারিই তুলে শাসাতে হয়েছে। তাতে আমাদের মতো বর্বরদের প্রতি প্রায় ঘনাদার মতোই করুণার দৃষ্টিতে চেয়ে শিবু বলেছে, তাই বলছিলাম প্রত্যেকটি অক্ষরের হিসেব কষে এ ধাঁধার উত্তর বার করা অত সোজা নয়।
সোজা না হলে উলটোটাই হোক! নেহাত সস্তা কথার প্যাঁচ কষে শিশির হঠাৎ নিজেই চমকে উঠেছে! আরে! উলটো করলেই তো জবাব!
কী রকম? আমরা সন্দিগ্ধ হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি।
Ah ar-কে উলটে পড়ো, শিশির সোৎসাহে বলেছে, কী হয়—Raha তো?
রাহা! আমাদের সেই রাহা! শিবুর মাসতুতো ভাই?
আমাদের বেয়াদবির শাস্তি দিতে ঘনাদা যাকে বোমের কাসিম সাজিয়ে প্রায় কাঁদিয়ে ছেড়েছিলেন মহাশূন্যের ঢিল আমদানি করে?
আমাদের মুখগুলো হাই-পাওয়ার বালব-এর মতো জ্বলে উঠেই কিন্তু ফিউজ হয়ে গেল যেন হঠাৎ।
রাহা, সেই রাহা আমাদের কাছে দেওয়া কথা শেষ পর্যন্ত রেখেছে! কাজ যা করেছে তা জব্বর! ওই খুদে চিঠিতে মোক্ষম একটি যা ছেড়েছে তা চেহারায় ধানী পটকা, কিন্তু বহরে মেগাটন বোমা।
এই কথা-ই সে আমাদের দিয়েছিল। ঘনাদার কাছে সেদিনকার সেই নাজেহাল হওয়া সে ভোলেনি। বলেছিল, ঘনাদাকে সর্ষে ফুল দেখাবার মতো সেকালের শোধ সে নেবেই পরের বার কলকাতায় ফিরে।
কথা সে রেখেছে। কিন্তু আনন্দে ধেই নৃত্য করার বদলে আমরা যে চোখে। অন্ধকার দেখছি।
কেন, কী হল, বোঝাতে গেলে বলতে হয় যে বৈশাখের খাঁ খাঁ রোদে-পোড়া, ফটি-ফাটা মাঠের জন্য চাওয়া বৃষ্টি অঘ্রানের পাকা ধানের খেত ভাসালে যা হয় হয়েছে তা-ই। মৌ-কা মতো পেলে যা দিয়ে বাজি মাত করা যেত তাই আমাদের সব পাকা খুঁটি এমন কাঁচিয়ে দিতে বসেছে।
ঘনাদার সঙ্গে আমাদের যে আপাতত অটুট সন্ধি চলেছে।
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনে এখন সুবর্ণ শান্তির যুগ।
মধুর এই সম্পর্ক এক ফোঁটা সন্দেহের ছোঁয়াচেই যে বিষিয়ে উঠবে! ঘনাদা আর আমাদের ক্ষমা করবেন? তিনি তো ধরেই নেবেন এটা আমাদের বেশরম বেইমানি। মখমলের দস্তানার মধ্যে আমরা যেন বিষের ছুরি লুকিয়ে চালিয়েছি। মার্কিন চর যেন আঁতাতের সুযোগ নিয়ে ক্রেমলিন উড়িয়ে দেবার ফন্দি করেছে। কিংবা রুশ রাজদূত হোয়াইট হাউসের মেহমান হয়ে টাইম বোমা বসাবার তাল খুঁজছে।
না, আশা-ভরসা আর কিছু নেই। বাহাত্তর নম্বরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আহ্ আর-এর চিরকুট চিঠিটি প্রকাশ পেলেই কালাপানিতে আবহাওয়ার নিম্নচাপ শুরু হয়ে যাবে, তারপর তুমুল তুফান।
অথচ আমাদের অবস্থা এখন এগুলে গর্দান, পেছুলে জান! ঘনাদাকে এ চিঠি দিলেই তো সর্বনাশ। আর জোর করে লুকোতে চাইলেও তাই। ঘুণাক্ষরে যখন জেনেছেন তখন আর কি এ চিঠি তাঁর হাতে তুলে না দিয়ে পার পাব!
তবু যদি আমাদের ভাগ্যে ভুলে গিয়ে থাকেন এই ক্ষীণ আশায় ভর করে বিকেলের আড্ডাঘরে গিয়ে ধুকধুকে বুক নিয়ে জমায়েত হলাম। যথাসময়ে ঘনাদার আবির্ভাব ও মৌরসি পাট্টার আসন গ্রহণ। শিশিরের সিগারেট নিবেদন, লাইটার প্রজ্বলন, ও ঘনাদার টাটানগরকে লজ্জা দেওয়া ধূম উদগীরণ।
তারপরই সেই অমোঘ বজ্রপাত।
কার রেজিষ্ট্রি চিঠি এল হে আজ দুপুরে?
যতক্ষণ সম্ভব, ঠিক ঝোপে কোপ না পড়তে দিয়ে আসল প্রশ্নটা এড়িয়ে বলা হল—আজ্ঞে রেজেস্ট্রি নয়। পিয়ন-বই দিয়ে পাঠানো একটা চিঠি।
আমিও তো তাই ভাবি—ঘনাদার মুখে যা ফুটে উঠল অন্য কারও বেলা সেটাকে মুচকি হাসি বলা হত—রবিবারে রেজেস্ট্রি চিঠি পাঠাচ্ছে, আমাদের ডাক বিভাগের এত কাজের আঠা কবে থেকে হল।
ঘনাদা থামলেন। সিগারেটে আর-একটা টান পড়ল। ট্রেনটা অ্যাকসিডেন্ট বাঁচিয়ে লাইন পালটাল কি?
বৃথা আশা। একমুখ ধোঁয়ার সঙ্গেই মারাত্মক প্রশ্নটা বেরিয়ে এল, চিঠিটা কার তা তো বললে না!
ঘরে যেন ভ্যাকুয়াম। আমরা সব বোবা কাঠের পুতুল। কারও নিশ্বাস পড়ছে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুখ খুলতেই হল।
আজ্ঞে, আপনারই চিঠি! গৌরই পকেট থেকে চিঠিটা প্রায় আড়ষ্ট হাতে বার করে ঘনাদার সামনের টেবিলে ধরে দিয়ে একটু সাফাই গাইবার চেষ্টা করলে, আজেবাজে কার বাঁদরামি বলে এ-চিঠি দিয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি।
গৌরের সাফাইটা ধবধবে সাদার বদলে আমাদের কাছেই ম্যাড়মেড়ে পাঁশুটে ঠেকল।
আমারই চিঠি! ভুরু দুটো একটু বেশি রকম কুঁচকে ঘনাদা তখন পকেট থেকে বার করে চশমা জোড়া চোখে লাগিয়ে ফেলেছেন।
টেবিল থেকে চিঠিটা তিনি তুলে নিলেন, আমাদেরও নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। চোখের পাতা পর্যন্ত না ফেলে আমরা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে। বিস্ফোরণ তো হবেই, কিন্তু সেটা কোন মাপের? চীন কি ফ্রান্সের, না রুশ বা মার্কিন বোমার? তার ফল-আউট, মানে তেজ-ঠাসাছাই বা ছড়াবে কতদূর?
প্রচণ্ড ধাক্কাটা একটু ভোঁতা করবার জন্য যতদূর সম্ভব পুরু নরম গদির ব্যবস্থা অবশ্য করে রেখেছি। বারান্দায় একটু আড়ালে ট্রের ওপর প্লেট সাজিয়ে বনোয়ারি এক পায়ে খাড়া আছে। এ-ঘরে ঘনাদার গলা এক পর্দা উঠতে না উঠতে ঘরে ঢুকে তাঁর টেবিলে সবচেয়ে বড় প্লেটটা নামিয়ে দেবে। তাতে জোড়া চিংড়ির কাটলেট যেন হাসছে! সে হাসির মায়ায় ঘনাদার মেজাজের পারা কিছুটা কি আর নামবে না?
কিন্তু এ কী তাজ্জব ব্যাপার! জোড়া কাটলেটের আগে ঘনাদা-ই যে হাসছেন। প্রথমে মুচকে, তারপর বেশ একটু দন্ত বিকশিত করে।
