গৌরটা সব কিছুতেই হড়বড়ে। হঠাৎ পিয়নের হাত থেকে তার খাতাটা নিয়ে পকেট থেকে কলম বার করে খস খস করে সই করতে লেগে গেল।
আরে! আরে! করছিস কী! আমরা সবাই হাঁ হাঁ করে উঠলাম, কার না কার চিঠি সই করে নিচ্ছিস?
কিন্তু ততক্ষণে সই হয়ে গেছে। গৌর চিঠিটা আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে অম্লান বদনে পকেটে ফেলে ওপরের সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বললে, ঠিকানা যখন ঠিক আছে তখন ও নামের গোলমালে কিছু আসে যায় না। ও আমাদেরই কারও। হবে।
এরপর আর আপত্তি কে করবে! একমাত্র যে করতে পারত সেই পিয়ন বাহাদুর ঝামেলা মিটে যাবার জন্যই বোধহয় খুশি মনে এই ব্যবস্থা মেনে নিয়ে তখন রওনা দিয়েছে।
গৌরের পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে কিন্তু থামতে হল।
কী ব্যাপার হে! নীচে হঠাৎ গুলতানি কেন এমন সময়ে?
কাণ্ডটা একটু বেমক্কাই হয়ে গেছে। জবাব দেবার খুব উৎসাহ বোধহয় কারও ছিল তাই। কিন্তু এ গলা অমান্য করবে কার ঘাড়ে এমন ক-টা মাথা!
স্বয়ং ঘনাদা তাঁর টঙের ঘরের ছাদের ফালি থেকে হাঁক দিয়েছেন।
আজ্ঞে, গুলতানি কিছু না। এ ব্যাপারের নাটের গুরু বলে গৌরই আমাদের হয়ে দায়টা সামলাল, একটা রেজেস্ট্রি চিঠি এসেছে।
এরপর সবাই একেবারে একসঙ্গে কেটে পড়া। আড্ডাঘরে যেতে গেলে বারান্দা দিয়ে যাবার সময় টঙের ছাদে পাহারায় খাড়া ঘনাদার নজর এড়ানো যায় না। সবাই তাই গুটি গুটি সিঁড়ির সামনেকার শিশির-গৌরের কামরাতেই গিয়ে ঢুকেছি প্রায় পা টিপে টিপে।
ঘনাদা আর যাই করুন, এ-ঘরে ঢু দিতে এসে নিজের মাথা কাটা যেতে দেবেন না।
ঘনাদাকে এড়িয়ে থাকার এত গরজ, কিন্তু কেন?
গরজ এই কারণে যে, মনে মনে সকলেরই একটা সন্দেহ তখন বেশ জোরে খোঁচা দিতে শুরু করেছে।
সন্দেহটা যে মিথ্যে নয় ঘরের ভেতর গিয়ে চিঠির খামটা খুলে ফেলার পরই টের পাওয়া গেল।
আমরা নেহাত আহাম্মক, তাই গোড়াতেই বুঝতে না পেরে অমন একটি দারুণ অপকর্ম করে ফেলেছি।
গানোসা মাডোস যে আসলে একমেবাদ্বিতীয় ধাশ্যাম দাস এইটুকু আমাদের কারও মাথায় এল না? এ তো সেই হরে কর কমবা জিওবা রুদে রকার খানার আরেক উদাহরণ। গানো সাম ডোস টাইপ করার দোষে হয়ে গেছে গানোসা মাডোস। আর আমরা ওই গানোসা মাডোস-এর ধোঁকায় পড়ে স্বয়ং ঘনাদার চিঠিই হাতিয়ে বসে আছি! – সব দোষ অবশ্য গৌরের। গানোসা মাডোসএর মানে না হয় বুঝিসনি, কিন্তু অমন হড়বড়িয়ে শুধু ঠিকানার জোরেই অন্যের নামের চিঠি সই করে নেবার কী দরকার ছিল? আর নিয়েছিলি নিয়েছিলি, সেটা সাত তাড়াতাড়ি খুলতে গেলি কী বলে?
চিঠিটা না খুললে তবু ঘনাদার হয়ে যেন সই করে নিয়েছি বলে তাঁর হাতে দেওয়া যেত। এখন কোন মুখে তাঁর কাছে যাব এ খোলা চিঠি নিয়ে?
কিন্তু গানো সাম ডোস বলে হঠাৎ এ চিঠি ঘনাদাকে লিখলই বা কে? লিখেছেই বা কী?
খোলাই যখন হয়েছে তখন চিঠিটা আর না পড়ে পারা যায়?
নিজেদের বিবেককে একটা করে কড়া ধমক শুধু দিলাম—পরের ভাঁড় যদি ভুলে ভেঙেই থাকি, তার রস দু-ফোঁটা গলায় গেলে কসুর কি আর বাড়বে।
কিন্তু চিঠি দেখে তো চক্ষুস্থির। এমন আজগুবি চিঠি ঘনাদাকে পাঠাবার মানে কী? তাও আবার পিয়ন বই মারফত!
চিঠিটা ইংরেজিতে লেখা। আসলে চিঠিই তাকে বলা যায় না। ওপরে শুধু ডিয়ার ভস বলে সম্বোধন। তার নীচে আবোল-তাবোল একটা যেন নকশা কেটে তার পাশে সংকেত চিহ্নের মতো নাইন এ এম অর্থাৎ, সকাল নটা আর পরের রবিবার চ্যালেঞ্জ লেখা। সব শেষে সই হল Ah ar! চিঠিটা সবসুদ্ধ এই–
এ নির্ঘাত কোনও পাগলের কাণ্ড ভাবতে পারতাম, কিন্তু ঘনশ্যাম দাসকে গানো সাম ভোস শুধু নয়, গানোসা মাডোস করে লেখায় আমাদের বাহাত্তর নম্বর সম্বন্ধে একটু-আধটু ওয়াকিবহাল কারও যেন কারসাজি এ চিঠির পেছনে আছে বলে সন্দেহ হল। বিশেষ করে এই চ্যালেঞ্জ কথাটায় একটা বেয়াড়া ইশারা যেন লুকিয়ে আছে।
কিন্তু কেন, কীসেরই বা এ আজগুবি চ্যালেঞ্জ! এমন চ্যালেঞ্জ করেছেই বা কে?
সই করা নাম তো দেখা গেল Ah ar!
এ আবার কী রকম নাম? নামের ধাঁধা নাকি? ওই আহ আর-এর ভেতরেই নামের হদিস দেওয়া আছে?
আকাশ-পাতাল ভেবে তো সে হদিস পেলাম না। সবাই এবার চেপে ধরলুম শিবুকে। রোজ তো সে কাগজ পেন্সিল ডিকশনারি নিয়ে ক্রসওয়ার্ড পাজল অর্থাৎ শব্দ চৌকি নিয়ে বসে, এই আহ্-আর-এর মানেটা আর বার করতে পারবে না!
পারবে নিশ্চয়। কাগজ পেন্সিল আর গোটা তিনেক ডিকশনারি সাজিয়ে নিয়ে শিবু যে-রকম তন্ময় হয়ে বসে মাথার চুলগুলো আঙুলে জড়িয়ে টানতে শুরু করল, তাতে মাস দুয়েকের মধ্যে উত্তরটা সে যে ঠিক বার করে ফেলবে এ আশা অনায়াসে করা যেতে পারে। অবশ্য ততদিন তার মাথায় টানবার মতো চুল যদি কিছু বাকি থাকে!
শিবু নয়, ধাঁধার ভেদ করল হঠাৎ শিশির।
পেন্সিল চোষা আর চুল টানার ঘটা দেখে শিবুকে তখন আমরা তাড়া লাগাচ্ছিলাম। কী রে, এখনও হল না?
শিবু তাতে প্রায় অক্ষর-তত্ত্ব নিয়ে একটা বক্তৃতাই শুরু করে ফেলেছিল, এক-একটা অক্ষরের কী গভীর মানে আর কী লম্বা ইতিহাস তা জানিস? এই A অক্ষরটাই ধর না। রোম্যান হরফটা এসেছে গ্রিক থেকে, গ্রিকরা নিয়েছে সেই আদি ফিনিসীয়দের আলেফ গোছের উচ্চারণের অক্ষর থেকে! সে অক্ষর ঠিক আরবি আলেফ নয়। ফিনিসিয়ানদের স্বরবর্ণ ছিল না, সব ব্যঞ্জন। গ্রিকরা তাকে স্বরবর্ণ বানিয়ে নাম দিয়েছে আলফা—
