এবার আর হাসতে পারলাম না। গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ভোরের আগেই প্রভিডেন্স প্রণালীতে পৌঁছোতে পারবে?
কারি বললে, পারব।
সুলুপে একটা হারপুন ছোড়ার বন্দুক আছে না? জিজ্ঞাসা করলাম তারপর।
হ্যাঁ, আছে। কারি অবাক হয়ে বললে, কিন্তু হারপুন ছুড়ে এ ডাকিনীকে তুমি ঘায়েল করবে?
করব। জোর দিয়ে বললাম, তবে শুধু হারপুন ছুড়ে নয়, হারপুনের কামানে এ ডাকিনীর চোখ নিশানা করে ধুলো ছুড়ে তাকে কানা করে।
কী বলছ কী, দাস! কারি মাথা নেড়ে বললে, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে! নিশ্বাসে যে প্রলয় ঘটায় সেই তুফানকে তুমি ধুলো ছুড়ে জব্দ করবে!
তোমার হাড়ের খবর যদি ভুল না হয়, আর ভোরের আগে প্রভিডেন্স প্রণালীতে যদি পৌঁছে দিতে পারো এ সুনুপে, তা হলে চেষ্টা করে তো একবার দেখতে পারি। এবার ইচ্ছে করেই সুরটা একটু নামিয়ে বললাম, এ সব তুফানের একটা এবং একটিমাত্র চোখ থাকে, জানো তো?
জানি। কারি আমার কৌশলটা বোঝবার চেষ্টা করে বলল, সে চোখ তোমায় দেখাতেও পারব।
তা হলেই হবে। তাকে আশা দিলাম।
হলও তাই। প্রভিডেন্স প্রণালীতে পৌঁছোলাম ভোর হবার আগেই।
তুফান ডাকিনী তখন থমথমে সমুদ্রে ঘূর্ণি হাওয়ার সঙ্গে জাগতে শুরু করেছে।
কারি সভয়ে বলল, এখন হালকা কথার সময় নয়। তবু ওই ঘূর্ণি দেখে আমার লরা বলে এক নাচিয়ে মেয়ের কথা মনে পড়ছে। সে-ও সর্বনাশী মেয়ে হাজার বুক ভেঙেছে।
বেশ, তা হলে এ ডাকিনীর নামও থাক লরা। আমি হেসে বললাম, এবার তৈরি থাকো হারপুন কামান নিয়ে। আমি ধুলোয় ঠাসা গোলা তাতে ভরে রেখেছি।
দেখতে দেখতে লরা ভয়ংকরী হয়ে উঠল। আর তার চোখ তাগ করে ছুড়লাম সেই ধুলো-ভরা গোলা!
ব্যস! খানিকক্ষণের মধ্যেই অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ধারায় ঝরে পড়া লরা নেতিয়ে পড়ে কাত।
ঘনাদা থামলেন।
এক-একজনের মুখে তখন এক-এক রকম বিস্মিত প্রশ্ন।
ও! লরা ফ্লোরা মানে সব তুফান-ঝড়?
ঘনাদা একটু মুচকে হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
কিন্তু ধুলোর গোলা যে ছুড়লেন, সে ধুলোটা কী?
হলদে রঙের একরকম ধুলোর মতো গুঁড়ো।—ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন—তার চিহ্ন হল English, আর নাম সিলভার আইওডাইড!
সিলভার আইওডাইড!—এবার আমি মৌ-কা পেয়ে চেপে ধরলাম—কিন্তু সে তো বৃষ্টি নামাবার জন্য সাধারণ মেঘের ওপর ছড়ানো হয়। তাতেও তেমন কাজ হয় না। সিলভার আইওডাইডে ফ্লোরা-ডোরার মতো প্রলয়ঙ্করী হ্যারিকেন থামানো যায়?
কাকে বলছি?
ঘনাদা তখন ঘরের দরজা দিয়ে তাঁর টঙের ঘরের দিকেই চলেছেন। হাতে তাঁর গোটা একটা সিগারেটের টিন। এখনও খোলাই হয়নি।
এটা যেন ঘুষ মনে হল!
শিশির গৌরের দিকে চাইলাম। তাদের মুখে যেন দুষ্টু দুষ্টু হাসি। বলল, বোসো, ডালপুরি আসছে।
ডালপুরি তোমরাই খেয়ো। যথাসাধ্য গলায় অবজ্ঞা ফোটাবার চেষ্টা করে শিবুর দিকে ফিরে বললাম, কই, ওঠ!
তাড়া দিয়ে শিবুকে ওঠালাম। গেলামও সেই পাইকপাড়ায় কাদা-জল ভেঙে। লাভ হল না।
সময়ে না পৌঁছোবার দরুন কমপিটিশন থেকে আমাদের দলের নাম কাটা গেছে।
নাচ
রবিবারের দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল।
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের ওপর থেকে নীচের ঘর কটিতেও এখন সবাইকার একটু গড়িয়ে নেবার সময়।
রবিবারের দুপুরের খ্যাটিটা নেহাত মন্দ হয়নি। অন্তত অ্যাকিউট অ্যাঙ্গল-এ শুরু করে একেবারে পুরো অবটিউস না হোক, রাইট অ্যাঙ্গল-এ শেষ করতে হয়েছে। সবাইকে।
এরপর, এই থেকে-থেকে দমকা বৃষ্টির দিনে একটু গা-হাত-পা ছড়িয়ে নেওয়া ছাড়া আর কী করা যেতে পারে!
এমন একটা মধুর ঘুমের আমেজের সময় নীচে ওই বেয়াড়া কড়া নাড়া কীসের? একটা সাইকেলের বেলের আওয়াজও যেন পাওয়া গেছে তার আগে।
টেলিগ্রাম নাকি! গৌরই প্রথম উঠে বসল।
টেলিগ্রাম! টেলিগ্রাম আবার কার আসবে?
না, সাইকেলের বেল নয়, নীচে কড়া-ই নাড়ছে কেউ। সুতরাং টেলিগ্রাম বোধহয় নয়। কী তাহলে?
বারান্দায় গিয়ে রেলিং-এর ধার থেকে উকি দেবার আগেই হাঁকটাও শোনা গেল, রেজেস্টিরি আছে, বাবু!
রেজেস্টিরি মানে রেজেস্ট্রি চিঠি! কার নামে আবার রেজেস্ট্রি চিঠি এল? পিয়নকে ওপরে ডাকলেই হয়, কিন্তু তার তর সইল না। বাহাত্তর নম্বরে রেজেস্ট্রি করা চিঠি আসা প্রায় একটা আজব ঐতিহাসিক ঘটনা। সুতরাং কার নামে এল জানবার আগ্রহে হুড়মুড় করে সবাই নীচে নেমে গেলাম।
রেজেস্ট্রি নয় ঠিক, পিয়ন বই দিয়ে পাঠানো চিঠি। গুরুত্ব বোঝাতে পিয়ন রেজিস্টিরি বলেছে। তা রেজেস্ট্রির চেয়ে পিয়ন দিয়ে পাঠানো চিঠি তো বাহাত্তর নম্বরের পক্ষে আরও তাজ্জব ব্যাপার! ব্যস্ত হয়ে তাই চিঠিটা কার জানতে চাইলাম।
কার? কার নামে চিঠি?
গানোসাবাবু? পিয়ন বেশ একটু দ্বিধাভরে জানাল।
গানোসাবাবু? গানোসাবাবুর চিঠি এখানে কী জন্য?
আমরা একটু কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করতেই পিয়ন থতমত খেয়ে বললে, নেহি নেহি, সির্ফ গানোসাবাবু নেহি, গানোসা মাডোস বাবু।
আমাদের, না পিয়নের, কার মাথা সত্যি খারাপ হয়ে গেছে? বেছে বেছে আমাদের এই বাহাত্তর নম্বরেই কি যত উদ্ভুট্টে কাণ্ড ঘটে!
কী বলছ কী? একটু ধমক দিয়েই বললাম, মাডোসবাবু-টাবু এখানে কেউ নেই। কোথাকার কার চিঠি এখানে এনে হাজির করেছ?
লেকিন ঠিকানা তো হিয়েকে লিখা হ্যায়!—পিয়ন তার ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়,—দেখিয়ে না!
লেফাফাটা হাতে করে দেখলাম।
পিয়ন ঠিক কথা বলেছে। ঠিকানায় কোনও ভুল নেই। একেবারে স্পষ্ট বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন।
