একটু থেমে, পুরনো স্মৃতির একটু চমকেই যেন শিউরে উঠে ঘনাদা বলেছেন, কিন্তু ফ্লোরা, হিল্ডা, হেজেল, অড্রে এরা সব তো পাহাড়ি বিচ্ছুর কাছে ডেয়ো পিঁপড়ে! একেবারে ঠিক সময়ে না সামলালে লরা যে কী করত তা ভাবতেও গায়ে কাঁটা দেয়। আমেরিকার নিউ অরলিন থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত বংশে বাতি দিতে কাউকে বোধহয় রাখত না।
অ্যাঁ! এমন ভয়ংকর মেয়েএ লরাকে সময়মতো সামলেছিল কে? শিবুটা প্রথমে খানিক হাঁ করে থেকে, পরে আহাম্মকের মতো জিজ্ঞেস করে বসেছে, আপনি?
ঘনাদার বাঁকানো ঠোঁটে অসীম ধৈর্য আর ক্ষমার একটু হাসি। টেনজিং নোরকে-কে যেন কে প্রথম এভারেস্ট-এর চূড়ায় উঠেছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, প্রথমে কে একটানা প্লেনে আটলান্টিক পার হয়েছে জানতে চাওয়া হয়েছে লিন্ডবার্গ-এর কাছে!
শিবুর আহাম্মকিতে ঘনাদা চটুন না চটুন, আমার কী আসে যায়? আমরা তো যাচ্ছি জোকার ক্লাবে! নেহাত কী ভুল হয়েছে ভাববার জন্য একটু বসেছি, তাই শিবুকে একটু ধমক দিতে হয়েছে, জিজ্ঞেস করতে লজ্জা করল না তোর? ঘনাদা নয় তো লরাকে আর কে সামলাবে, শুনি?
শিবু অধোবদন হবার পর ঘনাদাকেই জিজ্ঞেস করেছি, ও মুণ্ডমালিনীকে কেমন করে সামলালেন, ঘনাদা?
কেমন করে? ঘনাদা তাচ্ছিল্যভরে বলেছেন, একটু ধুলো দিয়ে!
ধুলো দিয়ে! আমার শুধু একার নয়, আসরে যে যেখানে ছিল সবার চোখই ছানাবড়া। হ্যাঁ, ঘনাদা ব্যাখ্যা করেছেন, লরার চোখে একটু ধুলো দিতেই কাম ফতে হয়ে গেল।
চোখে ধুলো দিয়ে কাম ফতে? আমাদের হাঁ মুখ আর বুজতে চায়নি! হ্যাঁ, লরার অর্ধেক শয়তানি জারিজুরি তাতেই চোখের জলে গলে গেল বলতে পারো—ঘনাদা আর একটু বিশদ হয়েছেন—তারপর যাকে বলে কানা হয়ে দ্বিগ্বিদিক ভুলে আতলান্তিকের ওপরই উধাও হয়ে কোথায় মুখ থুবড়ে মরেছে কে জানে! কারি তাই বলত—দাস, কোথায় ছিলে তুমি উনিশশো চুয়ান্নতে? এক হাজার একশো পঁচাত্তর জনকে নিকেশ করার বদলে এই বাহামার মায়ামা দ্বীপে পৌঁছোবার আগেই হেজেল নিজে কাবার হয়ে যেত?
হেজেল বুঝি মায়াগুমা দ্বীপে হানা দিয়েছিল? জিজ্ঞাসা করেছে শিশির।
শুধু কি মায়াগুমা দ্বীপ! ঘনাদা দুঃখের হাসি হেসেছেন—ওইখানে তো তার উৎপাত সবে শুরু। সেখান থেকে সাগর পেরিয়ে আমেরিকার উইলমিংটন শহরের পাশ দিয়ে ফিলাডেলফিয়াকে ডাইনে রেখে সোজা সেই অনটারিও হ্রদ পর্যন্ত।
সত্যি, আপনি থাকলে তো আর এ সব হয় না! গৌর আফশোস করেছে ঠিকই বলত তো ওই, কী নাম বললেন যেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ কারি। ওই কারি কে?
কারি আমার বন্ধু একজন কংক। ব্যাখ্যা করেছেন ঘনাদা—তার সঙ্গে স্ত্রমবস গাইগাস, মানে, পঞ্চমুখী শাঁখের খোঁজে তখন বেল দ্বীপে একটা সুলুপে থাকি, আর সেই সুলুপেরই একটা ডিঙি নিয়ে তাতে কারি আর আমি পঞ্চমুখী শাঁখ খুঁজে ফিরি সমুদ্রের তলায়। ডিঙিতে আমার হাতে থাকে তলায় কাচ আঁটা একটা বালতি আর কারির হাতে হাল। কাচ আঁটা বালতির মতো চোঙটা সমুদ্রের জলের ভেতর ড়ুবিয়ে ধরে আমি তার ভেতর দিয়ে কোথায় অ্যালজির ওপর পঞ্চমুখী চরে বেড়াচ্ছে দেখি, আর দেখতে পেলে আঁকশি লগি দিয়ে তা বোটে তুলে নিই। আমার লোভ পঞ্চমুখী শাঁখের ওপর, কারির লোভ শাঁখের শাঁসালো মাংসে। শাঁখের শাঁসই তাদের প্রধান খাদ্য বলে এই শাঁখ শিকারিদের একটা নাম কংক। বেশির ভাগ শাঁখ শিকারিই নিগ্রো বলে তাদের এ নামটা অবজ্ঞাভরেই দেওয়া হয়েছে।
যারা তা দিয়েছে একজন কংক-এর দৌলতেই কত বড় ভয়ংকর পরিণাম থেকে যে তারা রক্ষা পেয়েছে তা কোনওদিন বোধহয় জানবে না।
চোখে ধুলো দিয়ে কানা করে লরার জারিজুরি আমি ভেঙে দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু কারি আমার সঙ্গে না থাকলে লরা কখন কোথায় যে রাক্ষুসি মূর্তি ধরছে তা আমি জানতেও পারতাম না।
কারিরা প্রায় চৌদ্দপুরুষ ধরে বাহামাতেই আছে। বাহামার মাটি-জল-হাওয়ার সঙ্গে তাদের নাড়ির যোগ। কারির আবার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা এই যে, সাইজমোগ্রাফে যেমন ভূমিকম্প, ব্যারোমিটারে যেমন হাওয়ার চাপ, কারি তেমনই তার হাড়ের ভেতরে ঝড়-তুফানের সব হদিস আগে থাকতে টের পায়।
সারাদিন শাঁখ শিকারের পর রাত্রে সুলুপের ডেক-এ তারার আলোয় ঝলমল আকাশের তলায় শুয়ে গল্প করতে করতে হঠাৎ কারি ধড়মড় করে তার বিছানায় উঠে বসেছে সেদিন।
কী হল, কারি? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি যেন ভূত দেখলে মনে হচ্ছে!
ভূত নয়, ডাকিনী! ধরা গলায় বললে কারি, আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছি, সে জাগছে। হাজার বুদ্ধিমান বিচক্ষণ হলেও বাহামায় শাঁখ শিকার করে জীবন কাটিয়েছে। আমি তাই ব্যাপারটা কারির অন্ধ কুসংস্কার ভেবেছি। বিশ্বাস করিনি। তাকে শুধু ক্ষুণ্ণ না করার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, জাগছে কোথায়?
এই কাছেই! কারি সভয়ে বলল, প্রভিডেন্স প্রণালীতে।
এবার একটু হেসে ঠাট্টা করে বললাম, কী বলছ কী, কারি? প্রভিডেন্স প্রণালীতে ডাকিনী জাগছে আর তুমি এখানে শুয়ে শুয়ে তা টের পেলে! ও তোমার গেটে বাত-টাত হবে। কাল অমাবস্যা—তাই একটু চাগাড় দিয়েছে।
না, না, বাত নয়, দাস! কারি ব্যাকুল হয়ে উঠল আমায় বোঝাতে, আমি সত্যি আমার হাড়ের ভেতর এসব টের পাই। হেজেল-এর বেলা ঠিক এই রকম টের পেয়েছিলাম। তখন জানাবার কেউ ছিল না। তুমি আছ বলে তাই জানাচ্ছি। এ ডাকিনী হেজেল-এর চেয়ে শতগুণ সর্বনাশী। প্রভিডেন্স প্রণালীতে কাল ভোরের আগেই জেগে উঠে সৃষ্টি ছারখার করে দেবে।
