তখন আমি ঠিক কোথায়, তাই না? বার্মুডা, না বাহামা?
বাইরে না হোক, মনে মনে আমরা ঘনাদার মতোই নাসিকাধ্বনি করেছি। এসব পুরনো প্যাঁচ আমাদের খুব জানা আছে। এতেই কাবু হবার মতো কাঁচা ছেলে ভেবেছে নাকি আমাদের?
ঘনাদার কথার পিঠে চটপট চিমটিটুকু কেটেছি তাই।
ঘনাদার যেন কানে তুলো গোঁজা এমনইভাবে তিনি নতুন কী প্যাঁচ ছেড়েছেন তা তো আগেই বলেছি।
ঘনাদা যেন নিজের স্মৃতির ড়ুবুরি হয়ে হেঁয়ালির জট তুলেছেন, ফ্লোরা কি ভোরার দেখা অবশ্য তখনও পাইনি!
শিবু আর আমি এ ওর মাথায় বর্ষাতি ঘোমটার বোম এঁটে দিতে দিতে হেসে বলেছি, পেলে কী কেলেঙ্কারিই হত!
ঘনাদার কানটা হঠাৎ কী করে শুধরে গেছে কে জানে! আমাদের কথাটা এবার নির্ভুল শুনে তাতেই জোরের সঙ্গে সায় দিয়েছেন, কেলেঙ্কারি বলে কেলেঙ্কারি!
ওদের কারও সঙ্গে দেখা হওয়া মানে একেবারে দফা রফা!
ঘনাদার কথায় আর কান দেবারই দরকার কী? শিবুকে তাই ধাক্কা দিয়ে বলেছি, চল! চল!
দুজনে দরজার দিকে পা বাড়াবার সঙ্গে শিশিরের ভয়ে কাঁপা গলা শুনতে পেয়েছি, ওই ডোরা আর ফ্লোরা যা নাম করলেন, ব খুব সাংঘাতিক মেয়ে বুঝি!
তা সাংঘাতিক মেয়ে ছাড়া আর কী বলবে? দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে এসেও ঘনাদার কথাটা কানে এল, ডোরারটা ঠিক হিসেব নেই, কিন্তু ফ্লোরার হাতে গেছে অন্তত সাত হাজার একশো তিরেনব্বই জন।
সাত হাজার একশো তিরেনব্বই জন খুন! গৌরের শিউরে-ওঠা আধা-চিৎকারটা বারান্দা দিয়ে সিঁড়ির মুখটা পর্যন্ত আমাদের পিছু নিয়েছে, রাক্ষুসি নাকি?
রাক্ষুসি ছাড়া আর কী? ঘনাদার গলাটা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরের দ্বীপে ট্রিনিডাডের মাথার ওপর দিয়ে এসে গলা বাড়ানো হাইতির ছোট মুণ্ডুটা মাড়িয়ে কিউবার পুব কোণটা একটু ছুঁয়ে উত্তরমুখো হয়ে নিরুদ্দেশ হবার মধ্যেই ওই সাত হাজার একশো তিরেনব্বই জনকে সাবাড় করেছে। ফ্লোরা।
শিবুকে এবার ধমক দিতে হয়েছে, হাঁ করে আবার থমকে দাঁড়ালি কেন সিঁড়ির
মাথায়?
না, দাঁড়ালাম কোথায়?
শিবু সিঁড়িতে এক ধাপ নামতেই আমায় বলতে হয়েছে—দাঁড়া, দাঁড়া, কী যেন একটা ফেলে এলাম মনে হচ্ছে।
গৌর গলা ছেড়ে তখন জিজ্ঞাসা করছে শুনতে পাচ্ছি—নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে বলছেন, তার মানে ওই রাক্ষসি খুনে মেয়ে দুটোকে কেউ ধরতেও পারেনি!
সাধ্য কি তাদের কেউ ধরে! আর শুধু কি দুটো—ঘনাদা যেন সেই সর্বনাশী মেয়েদের কথা ভাবতেই খানিক গুম হয়ে গেছেন।
কই, কী ভুলে গেছিস মনে পড়ল? শিবু আমায় খোঁচা দিয়েছে সেই ফাঁকে।
ওঘরে না গেলে মনে তো পড়বে না ঠিক! বেশ ব্যাজার মুখেই বলেছি, কিন্তু গেলেই সে ভাববে লোভে লোভে ফিরে এসেছি!
ভাবুক না যা খুশি। শিবু বেপরোয়া হয়ে আমায় সাহস দিয়েছে, আমরা কারও ভাবনার পরোয়া করি নাকি? দরকার থাকলেও টিটকিরির ভয়ে ও-ঘরে যাব না?
আলবত যাব। আমি বীরবিক্রমে এগিয়ে গেছি।
পেছনে শিবু।
খোঁচার বদলে পাল্টা খোঁচার সঙ্গিন উঁচিয়ে তৈরি হয়েই আসরঘরে ঢুকেছি। কিন্তু কই, টিটকিরি তো দূরের কথা, কেউ যেন খেয়ালই করেনি।
ঘনাদা তখনও বুঝি তাঁর সর্বনাশীদের ধ্যানে ভোম মেরে আছেন। গৌর তা ভাঙবার জন্যই তখন বলছে, স্তম্ভিত গলায়, দুটো নয় কী বলছেন! আরও আছে?
আছে না? ঘনাদা দুঃখের হাসি হেসে আবার একটু চুপ।
শিবু তখন খালি একটা চেয়ারে বসেই পড়েছে।
বললাম, বসলি যে?
চাপা গলাতেই বলেছি অবশ্য।
তা বসলামই বা! শিবুও গলা নামিয়ে বলেছে, তুই তো এখন কী ভুলে গেছিস মনে করবি!
শিবুর যুক্তির বিরুদ্ধে কলবার কিছু নেই। কী ভুলে যাচ্ছি ভাববার জন্য আমাকেও একটু বসতে হয়েছে।
চেয়ার আর নেই, কিন্তু হোট চৌকিটায় গৌর নিজে থেকেই নীরবে একটু সরে বসেছে জায়গা করে দেবার জন্য।
যা হোক একটু জায়গা হলেই হল। কতটুকুই বা আর বসব! শুধু ভুলটা মনে পড়ার ওয়াস্তা।
কিন্তু ঘনাদা বসে বসেই ঘুমোলেন নাকি!
আর যারা সব তারাও ওই ফ্লোরার মতোই খুনে? শিশির ঘনাদার চটকা ভাঙতে নাড়া দিয়েছে।
কম যায় না বড়ো! ঘনাদা বাহামা না বার্মুডা থেকে বনমালি নস্কর লেনে ফিরে এসে বলেছেন, ফ্লোরা খতম করেছে সাত হাজারের ওপর তেষট্টি সালে আর তার আগে উনিশশো আটাশ-এ আর একজনের হাতে সাবাড় হয়েছে চার হাজার। তার আবার নামও কেউ জানে না। নামই হয়নি হয়তো। নামকরাদের মধ্যে হ্যাটি, ডোনা, হিল্ডা, হেজেল-শতমারির নীচে কেউ নয়। হেজেল দফা নিকেশ করেছেন এক হাজার একশো পঁচাত্তর জনের, হিল্ডা পঞ্চান্নতে ছশো, ডোনা ষাটে একশো পঁয়ষট্টি আর হ্যাটি একষট্টিতে দুশো পঁচাত্তর। এ ছাড়া ক্লিও, অড্রে আর ছোটখাটো আরও তো আছে। মানুষকে প্রাণে যারা কম মেরেছে তারা সুদ সুদ্ধ পুষিয়ে নিয়েছে ধনে। ডোনা এমনিতে ওদের দলে যাকে বলে লক্ষ্মী মেয়ে বলা যায়। জান নিয়েছে মাত্র একশো পঁয়ষট্টি জনের, কিন্তু যেখান দিয়ে গেছে সেখানে কমসে কম সাতশো কোটি টাকার ধন দৌলত লোপাট!
এত খুনোখুনি লুটপাটের কথার মধ্যে মাথা ঠাণ্ডা করে কিছু ভাবা যায়! কী ভুলে গেছি মনেই করতে পারিনি এতক্ষণে। ডোেরা ফ্লোরার জন্য আমার কীসের মাথাব্যথা! নেহাত বিদঘুটে আলোচনাটা থামাবার জন্যই বলতে হয়েছে, ওই খুনে মেয়েগুলো সব বুঝি আপনি যেখানে ছিলেন সেই বার্মুডা, না বাহামার?
বার্মুডা নয়, ছিলাম তখন বাহামায়। এখন মনে পড়েছে। ঘনাদা আমায় খুশি মুখেই জবাব দিয়েছেন, আর ওরা সবাই ঠিক বাহামার না হলেও, ওই অঞ্চলের বলা যায়। ছোট অ্যান্টিলিজ দ্বীপপুঞ্জের পুবদিকে উত্তর আটলান্টিক সমুদ্র। সেখান থেকে এসেছে অনেকে। কারও কারও আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ-এর দক্ষিণে ক্যারিবিয়ান সাগরেই জন্ম। উনিশশো সাতান্নতে তিনশো নব্বই জনকে যমালয়ে পাঠিয়ে অন্তত একশো কোটি টাকার সম্পত্তি যে লোপাট করে দেয়, সেই অড্রে তো দূর-দূরান্তর কোথাও থেকে আসেনি। মেক্সিকো উপসাগর থেকে মাত্র আমেরিকার লুইসিয়ানা স্টেট-এর সীমানা ছাড়িয়ে মিসিসিপির চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছেই অড্রে নিপাত্তা। কিন্তু ওইটুকুর মধ্যে যেখানে সে চোখ দিয়েছে সেখানেই শ্মশান।
