রাউন্ডে আর নেই! পয়লা রাউন্ডেই যারা খসে পড়েছে তাদের গায়ে চিডবিডিনি ধরাবার এমন সযোগ আর ছাড়ি। উঠেছি সেমিফাইনালে।
ওঃ, সেমিফাইন্যালে! তাচ্ছিল্য করবার চেষ্টা করলে কী হবে, গৌরের গলাটা আফশোসে মিয়োনো।
শিশির হঠাৎ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যই ভাবিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এত ভিজেছিস, আবার এই বৃষ্টির মধ্যে অতদূর যাবি! বাসে ওঠাই তো এখন দায়।
বাসে যদি না হয় তাহলে ট্যাক্সিতে যাব। শিবু যেন একটানা মুখস্থ-পড়া পড়ে গিয়েছে, ট্যাক্সি না জোটে, রিকশ নেব। আর তাও যদি না পাই, হেঁটে যাব পাইকপাড়া। জোকার ক্লাবের অল বেঙ্গল ব্রিজ কমপিটিশনের শিল্ডটা আমাদের বাহাত্তর নম্বরের বসবার ঘরে মানাবে বলেই তো মনে হয়।
শেষ কথাগুলো হয়েছে ট্যাক্সিতে যেতে যেতে। মতি শীলের গলির ভাঁড়ের চা পেটে-ছ্যাঁকা-লাগানো দুটো করে চুমুকে শেষ করে মেট্রোর সামনে থেকে ট্যাক্সি ধরে তখন আমরা এসপ্ল্যানেড থেকে বনমালি নস্কর লেনে চলেছি।
ও! দেয়ালে শিল্ড টাঙাবার পেরেক পুঁতেই ফেলেছিস বুঝি! গৌর একটু বিদ্রুপ করবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু খোঁচাটাই ভোঁতা।
শিশির অন্য রাস্তা নিয়েছে। বাহাত্তর নম্বরের সামনে নেমে ট্যাক্সির ভাড়াটা নিজেই চুকিয়ে দিয়ে ভেতরে যেতে যেতে বলেছে, কিন্তু আজ হয়তো মিছিমিছি যাবি! খেলাই হয়তো আজ বন্ধ!
কেন? রেনি-ডে বলে! ওপরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আমি উপযুক্ত জবাব দিয়েছি, এ কি স্কুল পেয়েছিস? রেনি-ডে বলে ছুটি হবে কী? রেনি-ডে হলেই তো খেলা বেশি জমে। গিয়ে পৌঁছতে যে পারবে না সে দল বাতিল।
শিশির-গৌর আর একটা ছুতো পেয়ে গেছে এবার। গৌর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই চোখ বন্ধ করে নাকটা একটু তুলে গঙ্গদ স্বরে বলেছে, আঃ! গন্ধটা পাচ্ছিস?
শিশির ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছে, রামভুজ ডালপুরি বানাচ্ছে যে! এ যা পাচ্ছিস, এ তো শুধু ওর স্পেশ্যাল সবজির গন্ধ। এরপর যখন ডালপুরি ভাজবে তখন তো তর হয়ে যাবি। আর বড় জোর আধঘণ্টা লাগবে। তারপরেই গরমাগরম!
ততক্ষণে দোতলায় পৌঁছে নিজেদের ঘরের দিকে চলেছি। শিবু একেবারে বৈরাগী বিবাগীদের মডেল হয়ে বলেছে, গরমাগরম তোমরাই সেঁটো ভাই। আমাদের লোভ নেই।
নিজেদের ঘরের দিকে যেতে যেতে বসবার ঘরটার দিকে একবার চোখ না ঘুরিয়ে পারিনি অবশ্য।
বেশ একটু তাজ্জবই হতে হয়েছে, অস্বীকার করব না।
স্বয়ং ঘনাদা সেখানে তাঁর মৌরসি কেদারা দখল করে বসে আছেন।
তা থাকুন! মুনির মন টলতে পারে, কিন্তু আমাদের আজ টলায় দুনিয়ায় এমন কোনও কিছু নেই।
শুধু জোকার ক্লাবের কপিটিশনে যাওয়ার জেদ তো নয়—শিশির-গৌরের সঙ্গে এ এক মোক্ষম মনের জোরের পাঞ্জা লড়া।
অল বেঙ্গল ব্রিজ কমপিটিশনের শিল্ডটা আমরা জিতে নিয়ে আসব, আবার এই আসর-ঘরের দেওয়ালেই আমাদের কীর্তি দিনের পর দিন মনে করিয়ে দেবার জন্য তা চোখের ওপর ঝুলবে এতটা কি সহ্য হয়!
তাই যা করে তোক আমাদের ব্রিজ খেলতে যাওয়াটা বন্ধ করতেই হবে।
বাহাত্তর নম্বরে ডালপুরির জোগাড় জেনেও শিশির-গৌরের আগবাড়িয়ে এ সময়ে এসপ্ল্যানেড টহল দিতে যাওয়ার মানেটা কি আর এতক্ষণে বুঝিনি!
ওখান থেকেই বাগড়া দেওয়া যাতে শুরু করা যায় সেই আশাতেই ওই টহলদারি। ওখানে না পেলে মেসে এসে পর পর চালবার সাজানো খুঁটি তো আছেই। এখন যা চালছে।
যে প্যাঁচই খাটাক, আমরা কেটে বার হবার জন্য তৈরি।
বসবার ঘরটা পেরিয়ে যাবার সময় একটু বেকায়দায় অবশ্য পড়তে হয়েছে।
আরে! শিবু সুধীর যে! তপস্যা করে যাঁকে পাওয়া যায় না সেই ঘনাদা নিজে থেকে সেধে ডেকেছেন,কোথায় ছিলে এতক্ষণ! আসর ঠাণ্ডা হয়ে যায় যে! শিগগির এসে তাতাও।
হ্যাঁ, তাতাচ্ছি এই যে! মনে মনে বলেছি। শিবুর সঙ্গে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে মুখে বলেছি, হ্যাঁ, আসছি কাপড় ছেড়ে।
ছেড়ে আসতে মিনিট কয়েক মাত্র লেগেছে। শুধু পোশাক বদলেই নয়, গায়ে ওয়াটারপ্রুফগুলো গলাতে গলাতে হুড দুটো হাতে করে নিয়ে আসরঘরে ঢুকেছি।
তা, একটু চমকে দিতে পেরেছি বইকী! আমাদের ডাকছিলেন তখন? বেশ, একটু শুকনো গলায় জিজ্ঞাসা করে নেহাত যেন অনিচ্ছাভরে ঘরে এসে দাঁড়াবার পর আর সকলের তো বটেই, ঘনাদারও ভুরু দুটো একটু যে উঠেছে তা লক্ষ করেছি।
নাসারন্ধ্র দুবার একটু নীরবে বিচ্ছুরিত করে তিনি বলেছেন, তোমরা বেরুচ্ছ এখন।
উক্তিটা বিস্ময়ধ্বনিও নয়, প্রশ্নও না।
শিবু আর আমি ততক্ষণে ওয়াটারপ্রুফ দুটো গায়ে গলিয়ে ফেলে বোতাম পর্যন্ত এঁটে ফেলেছি।
না, বেরিয়ে আর করি কী! এদিক ওদিক কিছু একটা খোঁজার জন্য তাকিয়ে একটু অন্যমনস্কভাবেই ঘনাদাকে জবাব দিয়ে আবার বলেছি, একটা ছাতা শুধু খুঁজছিলাম!
ছাতা! একটু আশার আলো পেয়ে গৌরের গলায় সহানুভূতি উথলে উঠেছে যেন, সত্যিই তো, ছাতা একটা না হলে আজকের এই বৃষ্টি শুধু ওয়াটারপ্রুফে কি আটকায়! কিন্তু বাহাত্তর নম্বরে ছাতা কোথায়? সেই উল্টো নামের শ্রীমান সুশীলের ছাতা ঘনাদা রাস্তায় দান করে আসার পর থেকে বাহাত্তর নম্বরে ছাতা আর কেউ কি দেখেছে?
কিন্তু ছাতা একটা না হলে তোরা বেরুবি কী করে? শিশির গৌরের চেয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।
এই—এমনই করে! বলে হুডগুলো এবার মাথায় চাপিয়েছি।
ঘনাদা যেন হঠাৎ আমাদের কথা ভুলেই গেছেন। তাঁকে ঘিরে যারা বসেছে তাদের দিকে চেয়ে স্মরণশক্তিটা উসকে নেবার চেষ্টায় বলেছেন, হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম?
