দিঘা নয়, দার্জিলিঙ! শিশির দেরি করলে না সংশোধন করতে।
বেশ সেইটেই আগে ঠিক হোক! গৌরের গলায় রসকষ নেই, দিঘা, না দার্জিলিঙ কোথায় উনি যাবার কথা দিয়েছেন, ঘনাদা নিজের মুখেই বলুন।
জবাবের বদলে ঘনাদার মুখ থেকে ধোঁয়াই বার হল। সেই সঙ্গে যেন চাপা হাসির মতো গড়গড়ার ভুরুক! ভুরুক!
কিন্তু এবার আমরা নাছোড়বান্দা।
দিঘা, না দার্জিলিঙ বলতেই হবে ঘনাদাকে! গৌরের সঙ্গে শিবুও যেন শমন ধরাবার গলা ছাড়ল।
বলতেই হবে? আমাদের আজগুবি আবদারে ঘনাদার ধৈর্যের বাঁধ বুঝি ভেঙে পড়ে, কিন্তু বলে লাভটা কী? তাতে লাভ হবে কিছু? এখন এখান থেকে আমার নড়বার উপায় আছে?
নড়বার উপায় নেই? কেন? সমস্বরে আমরা জানতে চাইলাম।
টেলিগ্রামটা যদি আসে! ঘনাদার গলায় এবার অজানা কোনও ভয়ংকর সম্ভাবনার আভাস!
কীসের টেলিগ্রাম? কোথা থেকে? বিস্মিত যেমন আমরা সবাই তেমনই বেশ সন্দিগ্ধও।
কোথা থেকে জেনে আর কী হবে! ঘনাদা যেন নিয়তির বিধান মেনে নেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, কিন্তু এলে যেমন আছি সেই অবস্থায় তৎক্ষণাৎ রওনা হতে হবে।
এমন জরুরি টেলিগ্রাম? শিবুর গলার সুরটা একটু বাঁকা, নিকসন কি ব্রেজনেভের বোধহয়।
সে যারই হোক, চুনি গোস্বামীকে যেন কোন টিমের জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। এমনই একটু করুণার হাসি হেসে ঘনাদা বললেন, ও টেলিগ্রাম অমান্য করবার তো উপায় নেই। যদি আসে, কখন আসবে, তারই অপেক্ষায় তটস্থ হয়ে থাকতে হচ্ছে তাই।
তা হঠাৎ টেলিগ্রামের এমন জরুরি তলব কী জন্যে? আমরা আজ সহজে ছাড়বার পাত্র নই, কী করতে হবে আপনাকে?
কী করতে হবে? ঘনাদা যেন সদ্য জঙ্গল-থেকে-ধরে-আনা গণ্ডাখানেক বাঘের খাঁচায় একলা শুধু হাতে ঢুকতে যাবার মতো মুখ করে বললেন, খোঁজ করতে হবে, বেশি কিছু নয়, শুধু এক ফোঁটা জলের।
এক ফোঁটা জলের খোঁজ! আমাদের হাসি চাপাই তখন দায় হল, তার জন্য এত ভাবনা?
দিঘায় চলুন না। পাতাল থেকে অফুরন্ত জলের ফোয়ারা উঠছে সেখানে! গৌর জপাবার সুযোগ ছাড়লে না।
দার্জিলিঙ রয়েছে কী করতে! শিশির ঝটপট উলটো গাইলে, পাহাড়ি ঝরনায় অনর্গল হিমালয়ের চূড়ার তুষারগলা জল!
হুঁ, জল! ঘনাদা একটু যেন দুঃখের নিশ্বাস ছাড়লেন, জল হলে তো সত্যিই ভাবনার কিছু ছিল না। এ ঠিক জল নয়, বরং টল বলা যায়!
টল? আমাদের সকলের চোখ এবার সত্যি ছানাবড়া।
হ্যাঁ জল-টল থেকে টল শব্দটা নিলে দোষ নেই। ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন একটু, টল হল জলের একেবারে আপন জাতভাই, গাঞী গোত্র পর্যন্ত সব এক। তফাত শুধু চেহারা-চরিত্রে।
তার মানে ভারী জল! আমার বিদ্যে জাহির করলাম, যার নাম ডিউটেরিয়াম অক্সাইড? যা থেকে হাইড্রোজেন বোমা হয়?
না। ঘনাদা করুণাভরে মাথা নাড়লেন, ভারী জল নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু। ভারী জলের সঙ্গে টল-এর আকাশপাতাল তফাত। এমন তফাত যে দুনিয়ায় মাত্র একটি কি দুটি ফোঁটাই হয়তো এখন কোথাও কেউ জমাচ্ছে সন্দেহ করে পৃথিবীর বড় বড় চাঁইদের চোখে আর ঘুম নেই।
টেলিগ্রাম এলে এই টলের ফোঁটা খুঁজতে আপনাকে ছুটতে হবে? আমাদের সবিস্ময় প্রশ্ন, খুঁজে পেলে করবেন কী?
সেবার প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে যা করেছিলাম! ঘনাদা গড়গড়ার নলে একটা লম্বা টান দিয়ে তাঁর কথার নমুনা হিসেবেই যেন এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, শুরু করেছিলাম খোদ নিউইয়র্কে, সেখান থেকে প্লেন-এ পেরুর লিমা হয়ে ভাড়া করা সুলুপ-এ গ্যালাপ্যাগস দ্বীপ। গ্যালাপ্যাগস থেকে একটা স্কুনার-এ হাওয়াই, হাওয়াই থেকে ব্রিগ্যানটাইন-এ সামোয়া, সামোয়া থেকে একটা কেচ-এ রারাটোঙ্গা, রারাটোঙ্গা থেকে একটা ইয়ল-এ ফিজি, ফিজি থেকে আবার একটা.সুলুপ-এ নিউগিনির পোর্ট মোরেস-বি।
ঘনাদা দম নিতে একটু থামতেই শিবু ফোড়ন কাটলে, গোটা প্রশান্ত মহাসাগরটাই ঘোল-মওয়া করে ফেললেন যে, যা কিছু জলে ভাসে তাই দিয়ে!
হ্যাঁ। ঘনাদা নিজেই স্বীকার করলেন, জেলে ডিঙি থেকে যাত্রী জাহাজ, প্রায় সব কিছুতে সমস্ত প্যাসিফিক এসপার ওসপার করে অস্ট্রেলিয়ার উত্তরের ডারউইন বন্দরে নেমে সেখান থেকে একটা জিপে দক্ষিণের আধা মরুর দেশ অ্যালিস ম্প্রিংস-এর দিকে রওনা হয়েও দেখি জোঁকটা ঠিক সঙ্গে লেগে আছে। পেরুর লিমা থেকে গ্যালাপ্যাগস যাবার সময়ই তাকে প্রথম লক্ষ করেছিলাম। তাকে ছাড়াবার জন্যই পাসিফিকটা তারপর অমন এলোমেলোভাবে ঘুরতে হয়েছে। কিন্তু লাভ কিছু, হয়নি।
ডারউইন থেকে বেরিয়ে আধা মরুর মধ্যে বিশ মাইল না যেতে যেতেই ধুধু তেপান্তরের ওপর একটা ছোট ধুলোবালির ঘূর্ণিকে ছুটে যেতে দেখে বুঝেছি, জোঁকটা-ই সঙ্গে লেগে আছে এতদূর পর্যন্ত।
তবে এবার চালটা একটু বদলে পেছনে নয়, সামনেই আছে অপেক্ষা করে।
খানিক বাদে ধুলোবালির চলন্ত মেঘটা থিতিয়ে যাবার পর জোঁকের বাহনটাও দেখা গেছে। আমার মার্কিন জিপ, আর তার বিলেতি ল্যান্ডরোভার। কায়দা করে আগে থাকতে একটু এগিয়ে গিয়ে, আমার জন্য এই নির্জন তেপান্তরে সে যে অপেক্ষা করছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
আমার কাজ যা জরুরি আর গোপন তাতে তাকে আর-একবার এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করাই উচিত ছিল। কিন্তু এবারে আমার চালও আমি বদলালাম।
সোজা জিপটা ফুলস্পিডে চালিয়ে নিয়ে গিয়ে তার রোভারটায় দিলাম ধাক্কা।
কাছাকাছি যাবার পর আমার একবগ্ন খ্যাপার মতো চালাবার ধরনে মতলবটা বুঝে ফেলে রোভারটায় স্টার্ট দিয়ে সে যতদূর সম্ভব ধাক্কাটা বাঁচাবার চেষ্টা অবশ্য করেছিল। কিন্তু তখন একটু দেরি হয়ে গেছে। সাংঘাতিক দুর্ঘটনা কিছু না ঘটলেও দুটো গাড়িই জখম হল বেশ। ল্যান্ডরোভারটাই বেশি।
