রোভার-এর ড্রাইভারের সিট থেকে নেমে যে আমার দিকে এবার দাঁত কিড়মিড়িয়ে ছুটে এল, সে মানুষ না অকারণে-খুঁচিয়ে-খ্যাপানো খাঁচা-ভাঙা একটা মানুষখেকো বাঘ তা বলা শক্ত।
আমি তখন জিপের ড্রাইভিং হুইলটায় হাত রেখে মুগ্ধ চোখে মরু প্রান্তরের দৃশ্য দেখতে যেন তন্ময়।
আয়! নেমে আয় কালা নেংটি!
কানের পাশেই বজ্রগর্জন শুনে একটু যেন অবাক হয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে বললাম, আমায় কিছু বলছেন?
হ্যাঁ, তোকেই বলছি, শুটকো মর্কট! ইষ্টনাম যদি কিছু থাকে তো জপ করে নিয়ে নেমে আয় চটপট! আমার পিছু নেওয়ার মজা আজ তোকে বোঝাচ্ছি!
জোঁকটা বলে কী! আমি তার পিছু নিয়েছি! একটু হেসে বললাম, এ রকম শিক্ষা পাওয়া তো আমার সৌভাগ্য, কিন্তু কার পিছু নিয়ে সৌভাগ্যটা হল একটু যদি জানতে পারতাম!
কার পিছু নিয়েছিস তা তুই জানিস না? বিচ্ছু শয়তান! খ্যাপা বাঘ যেন তখুনি আমায় কামড়ে ছিঁড়ে খাবে, সেই নিউইয়র্ক থেকে কিছু না জেনে তুই এঁটুলির মতো সঙ্গে লেগে আছিস! না যদি জেনে থাকিস তো এই অন্তিমকালে জেনে নে। তোর সাক্ষাৎ শমনের নাম হল ক্যাপ্টেন ডোনাট। আজ তোর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করবার জন্যই এখানে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু তুই এসে যখন বিনা কারণে ধাক্কা দিয়েছিস তখন তোর নিয়তিই তোকে আজ ডেকেছে। নেমে আয় এখুনি, চিমসে চামচিকে, আজ তোকে নিংড়ে এই খাঁ খাঁ বালির তেষ্টা যেটুকু পারি মিটিয়ে যাব।
তা পারবেন কি? আমি যেন দরদ জানিয়ে বললাম, অত লম্বা মুখসাপাটি করলে রাগের আঁচই যে পড়ে যায়!
কী! গর্জন করে উঠলেন আবার জোঁক মশাই ক্যাপ্টেন ডোনাট। গর্জনটা একটু তবু ফাঁকা!
না, বলছিলাম, প্রতিজ্ঞা রাখবার পর আপনার একটু অসুবিধে হবে বোধহয়। গাড়িটা তো আপনার অচল হয়ে গেছে। যাবেন কী করে?
ধাক্কা-দিয়ে-ভাঙা গাড়িটার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াতে ক্যাপ্টেন ডোনাট উথলে-ওঠা শোকে সত্যিই নতুন করে খেপে উঠলেন। কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান হারিয়ে লাফ দিয়ে উঠে আমার হাত ধরে দিলেন এক প্রচণ্ড হেঁচকা টান।
সে টানে ডিগবাজি খেয়ে মাটিতে গিয়ে পড়লাম ঠিকই, কিন্তু ক্যাপ্টেন ডোনাট তখন আরও অনেক দূরে মরুর বালিতে উবুড় হয়ে যেন দণ্ডি কাটছেন।
কাছে গিয়ে একটার বেশি ধোবির পাট দেবার দরকার হল না। তারপর তাঁর ল্যান্ড-রোভারের গায়েই হেলান দিয়ে বসিয়ে জামার কলারটা ধরে বললাম, এবার বলুন তো, জোঁক মহাশয়, সেই নিউইয়র্ক থেকে আমার পেছনে কেন লেগে আছেন? কে-ই বা পাঠিয়েছে আপনাকে?
আমি লেগে আছি আপনার পেছনে? ক্যাপ্টেন ডোনাটের গলায় হতভম্ব একটা আন্তরিক সুরই যেন পাওয়া গেল, না, যার জন্য আমার এই হয়রানির টহল, সেই দাসের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার পর চরগিরি করবার জন্য আপনি গোড়া থেকে আমার পিছু নিয়েছেন? দাস যে এ পর্যন্ত আমায় দেখা দেননি, বুঝতে পারছি সে শুধু আপনার বাগড়ার জন্যই।
এবার হতভম্ব হওয়ার পালা আমার। প্রায় ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, কার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা বলছেন?
কার সঙ্গে যেন আপনি জানেন না? ক্যাপ্টেন ডোনাট এই অবস্থাতেও এবার খেঁকিয়ে উঠলেন, দাসের সঙ্গে, জি দাস!
জি দাস-কে আপনি চেনেন? দেখেছেন কখনও? তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ক্যাপ্টেন ডোনাটের দিকে তাকালাম।
দেখিনি কখনও।ক্যাপ্টেন ডোনাট একটু যেন লজ্জিত হয়ে বললেন, তবে তাঁর। কীর্তিকলাপ অনেক শুনেছি। পৃথিবীর এক আশ্চর্য মানুষ!
শিশির ধমকাল গোরাকে, গোরা আমাকে, আমি শিবুকে, শিবু আবার শিশিরকে।
তা হঠাৎ ওরকম ছোঁয়াচে কাশির প্রাদুর্ভাবে পরস্পরকে ধমকাতেই হয়।
কাশি থামলে ঘনাদা কিন্তু নির্বিকারভাবেই আবার শুরু করলেন।
ক্যাপ্টেন ডোনাটকে কড়া গলাতেই এবার জিজ্ঞাসা করতে হল, দাসের সঙ্গে দেখা হলে কী করতেন?
তা আপনাকে বলব কে? ভাঙলেও ক্যাপ্টেন ডোনাট মচকাতে রাজি নয়।
হেসে এবার বললাম, যদি বলি—এক ফোঁটা জল, তবুও কি আমায় বলবেন না?
দাস! আপনিই তা হলে দাস? আমার মুখে কোডওয়ার্ড শুনে ক্যাপ্টেন ডোনাট যেমন উচ্ছ্বসিত তেমনই লজ্জিত হয়ে উঠলেন, ছি, ছি, কী ভুলই করেছি!
এরপর আর বেশি কিছু বলার নেই। যে ধান্ধায় বেরিয়েছিলাম আরেক তরফের পাঠানো ক্যাপ্টেন ডোনাটের কাছে তার আরও নতুন হদিস পেয়ে শেষ পর্যন্ত এক ফোঁটা জল মানে টল সত্যিই খুঁজে বার করলাম মধ্য অস্ট্রেলিয়ার বাঁজা পাহাড় ম্যাকডোনেল রেঞ্জের একটা চোরা উপত্যকায়। জলের ফোঁটাই পেলাম, কিন্তু আসল পাপী তখন পালিয়েছে। জলের ফোঁটা টুল যা পেয়েছিলাম তার উপযুক্ত ব্যবস্থাই করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও শান্তি তো নেই। ফেরারি সেই পাপী আর কোথাও লুকিয়ে একটি ফোঁটা টল-ও যদি জমিয়ে ফেলে, পৃথিবীর তা হলে কী সর্বনাশ যে হতে পারে কেউ জানে না।
এক ফোঁটা জল, থুড়ি আপনার ওই টল-এ পৃথিবীর একেবারে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে! কী সর্বনাশ? আমরা রীতিমত সন্দিগ্ধ।
কী সর্বনাশ বুঝতে গেলে টল বস্তুটা কী তা বুঝতে হবে। ঘনাদা আমাদের প্রতি করুণা করে একটু বিস্তারিত হলেন, টল আমাদের জলেরই জাতভাই, তবে জলের চেয়ে শতকরা চল্লিশ ভাগ ভারী আর দশ গুণ আঠালো। রাসায়নিক ফরমুলা তার H2 ০-ই বটে, কিন্তু তার অণুগুলি এমন লম্বা শেকল বাঁধা যে তার চেহারা-চরিত্র একটু তরল গোছের আঠালো রবারের মতো। বৈজ্ঞানিকদের অনেকেরই ভয় যে, কোনওরকমে মেশামেশির সুযোগ থাকলে আমাদের সব সাধারণ জল ওই ছোঁয়াচ লেগে টল হয়ে উঠে পৃথিবীকে শুক্রগ্রহের মতো এমন অসহ্য গরম করে তুলবে যে তাতে প্রাণের অস্তিত্বই হবে অসম্ভব। টল সম্বন্ধে এত ভাবনা তাই। এ-জল প্রথম তৈরি করেন দুজন রুশ বৈজ্ঞানিক। সেই ১৯৬১-তে। তারপর এতদিন বাদে অস্ট্রেলিয়ার দুজন বৈজ্ঞানিক হঠাৎ ঘটনাচক্রে এ-জল তৈরি করে ফেলেছেন। এঁদের কাছ থেকে নয়, ভয় পাছে উটকো কোনও বৈজ্ঞানিক হঠাৎ এ-জলের ফোঁটা জমিয়ে ফেলে সারা দুনিয়াকে ব্ল্যাকমেল করে। সে-বিপদের জন্য সজাগ পাহারায় তাই থাকতেই হয়।
