অমৃত! আমায় ভেংচি কাটতে হয়েছে।
ঘনাদার তক্তপোশের ধারে মেঝেতে নামানো প্লেটে দুটো হলদে গুঁড়ো দেখে আমাদের আগেই শিশির-শিবুর ঘুষটা কী ছিল খানিকটা অনুমান করে মুখ বেঁকিয়ে তারপর বলেছি, বনস্পতি-তে ভাজা ওই অখাদ্য খাবারগুলো যারা আপনাকে এনে খাওয়ায় তারা অমৃতের জানে কী! ওদের দৌড় তো ওই পচা অমৃতি অবধি!
দিঘার জলের মাহাত্ম কীর্তনেই মেতে উঠেছে এবার গৌর। দিঘার জলের মর্ম ওরা কী বুঝবে! কোথা থেকে এ জল উঠছে ওরা জানে? একেবারে হাজার ফুটেরও বেশি গভীর টিউবওয়েল থেকে পৃথিবীর বুকের ভেতরকার লুকোনো জল ওখানে উথলে উঠছে। অমৃত যদি কিছু থাকে তো সে ওই জল। আর জলের জন্য যদি কোথাও যেতে হয় তো সে দিঘা।
দিঘার কাছে দার্জিলিঙের জল! আমায় আবার ধুয়া ধরতে হয়েছে, পায়েসের কাছে আমানি!
দার্জিলিঙ আর তার ঝরনার জলের আদ্যশ্রাদ্ধ করে যা কিছু রোজ দুবেলা তারপর বলি, ঘনাদা যেরকম মনোযোগ দিয়ে তা শোনেন, তাতেই আমাদের দিঘা-ভ্রমণ সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছি।
সে নিশ্চিন্ত বিশ্বাস একটু চিড় খেয়েছে একেবারে শনিবার দিন সকালবেলাই।
ট্রেনের জন্য সেই দশটায় বেরুলেও চলবে। তবু সাবধানের বিনাশ নেই বলে বনোয়ারিকে সকাল সাড়ে আটটাতেই হুকুম করেছি ট্যাক্সি ডাকবার জন্য।
জবাবে বনোয়ারি যা বলেছে তাই শুনেই আমরা তাজ্জব।
তব তো দো ট্যাক্সি বোলাকে লাবে!
দো ট্যাক্সি! দুটো ট্যাক্সির কথা কী বলছে আহাম্মকটা?
দুটো ট্যাক্সি কী হবে আমাদের? ধমক দিয়েছি বনোয়ারিকে, তোকে দুটো ট্যাক্সির কথা বলেছি? বলেছি একটা ট্যাক্সি চট করে নিয়ে আসতে!
হাঁ, হাঁ, একঠো আনবে আপলোগের জন্যে, বনোয়ারি আমাদের ধমকে বিচলিত হয়নি, আউর একঠো উ বাবুদের লিয়ে।
উ বাবুলোগ? তার মানে তো শিশির-শিবু? উ বাবুরা আবার ট্যাক্সি আনাচ্ছে নাকি? হঠাৎ এই সকালে ওদের আবার ট্যাক্সির দরকার হল কেন?
ঘনাদাকে বাগাতে না পেরে মনের দুঃখে আগে থাকতেই কোথাও সরে পড়ার ব্যবস্থা করছে? তাদের লবডঙ্কা দেখিয়ে আমাদের চলে যাওয়াটা যাতে চোখে দেখতে না হয়?
কোথায় যাচ্ছে বনোয়ারির কাছে জেনে বেশ একটু খটকা কিন্তু লেগেছে। শিয়ালদা যাবার জন্য ওরা নাকি ট্যাক্সি ডাকাচ্ছে!
মনের দুঃখে যদি যেতেই হয় কোথাও তো শিয়ালদা কেন? ঝাঁকড়দা মাকড়দাও তে গেলে পারত, কিংবা বনবাসের শামিল আর কোনও জায়গা।
তা প্রাণের জ্বালা জুড়োতে যাক যেখানে খুশি। আমাদের আর দেরি করবার সময় নেই।
বনোয়ারিকে তাই তাড়া লাগিয়েছি, শিয়ালদা-টিয়ালদা নয়, আগে তুই হাওড়ার ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে আয়।
কথাটা আর শেষ করতে হয়নি, তার আগেই কানের মধ্যে কে যেন বিষ ঢেলে দিয়েছে।
এখনও দাঁড়িয়ে আছিস, বনোয়ারি? দার্জিলিং মেল শেষকালে ফেল করাবি নাকি? তোর বড়বাবু ওদিকে তৈরি হয়ে বসে আছেন।
দার্জিলিঙ মেল! বড়বাবু! ওরা এসব বলে কী? বড় আশায় ছাই পড়ে সত্যিই খেপে গেল নাকি? ঘনাদাকে এখনও দার্জিলিঙ নিয়ে যাবার খোয়াব দেখছে!
বেচারাদের দিবাস্বপ্নটা ভাঙবার ব্যবস্থা এবার করতেই হয়। গৌরের দিকে চেয়ে হেসে তাকেই যেন শুনিয়ে দিলাম, দিঘায় ঘনাদার সমুদ্র স্নানের জন্যে যা একটা সুইমিং ট্রাঙ্ক নিয়েছি!
কিন্তু আহাম্মকদের শিক্ষা কি সহজে হয়! সুশীল সুবোধ হয়ে হারটা কোথায় মেনে নেবে, না শিশির-শিবু সংবাদ শুরু করে দিলে তৎক্ষণাৎ। শিবু যেন ব্যস্ত হয়ে শিশিরকে জিজ্ঞাসা করলে, ঘনাদার কানঢাকা টুপিটা কিনতে ভুলিসনি তো? পাহাড়ি ঠাণ্ডা থেকে মাথাটা আগে বাঁচাতে হয়।
দিঘায় ওয়েদার এখন চমৎকার! পালটা ঘা দিলে গৌর, আমাকেই যেন শুনিয়ে, ঘনাদাকে ফিরিয়ে আনাই শক্ত হবে।
কিন্তু বনোয়ারি এখনও অমন হাঁদারামের মতো দাঁড়িয়ে কেন?
দু জোড়া গলার ধমক খেয়ে সে কাঁদো কাঁদো গলায় জানতে চাইলে, এক সঙ্গে দুটো ট্যাক্সি যদি না পায় তা হলে আগে কোথাকার জন্য আনবে—হাওড়া না শিয়ালদা?
কোথাকার জন্য আবার? হাওড়া! হাওড়ার জন্য!
শিয়ালদা! ট্যাক্সি পেলেই শিয়ালদার জন্য আনবি।
হাওড়া!
শিয়ালদা!
হাওড়া!
শিয়ালদা!
ঘনাদা শিয়ালদা থেকে ট্রেনে দার্জিলিঙ যাচ্ছেন।
দার্জিলিঙ! ছছাঃ! ঘনাদা যাচ্ছেন দিঘা।
দিঘা! ফুঃ! ঘনাদা দার্জিলিঙ যাবেন নিজে কথা দিয়েছেন!
বিলকুল ঝুট। এবার সরাসরি রুখে দাঁড়াতে হল—ঘনাদা দিঘা ছাড়া কোথাও যাবেন না, নিজে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন।
অসম্ভব! শিশির-শিবুর প্রায় হাতের আস্তিন গুটোবার অবস্থা, তিনি আমাদের কথা দিয়েছেন।
না, আমাদের! গৌর আর আমার গর্জন।
বেশ, হাতে পাঁজি মঙ্গলবার কেন? চলো ঘনাদার কাছে? শিশির-শিবুর তর্জন। চলো? আমরা কি পেছপাও?
কিন্তু সিঁড়ি কাঁপিয়ে টঙের ঘরে গিয়ে ঢুকে চারজনেই হতভম্ব। আমরা যখন দিঘা দার্জিলিঙ যাওয়ার তাড়ায় মাথা ফাটাফাটি করতে যাচ্ছি, ঘনাদা তখন স্রেফ ফতুয়াটি গায়ে দিয়ে তক্তপোশের ধারে বসে গড়গড়ায় কলকেতে টিকে সাজাচ্ছেন!
আমাদের ঝড়ের মতো ঢুকতে দেখে মুখ তুলে একটু শুধু যেন আগ্রহ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এল?
কার কথা বলছেন? কে আবার আসবে? আমরা ভ্যাবাচাকা।
কেটে নয়, আসবে একটা টেলিগ্রাম। এখনও তা হলে আসেনি বুঝতে পারছি। ঘনাদা সাজানো শেষ করে টিকে ধরানোতে মন দিলেন।
কোখেকে টেলিগ্রাম আসবে?? গৌর মেজাজটা খুব ঠাণ্ডা রাখতে পারলে না, আর যেখান থেকেই আসুক, আপনাকে এখন তো দিঘা যেতে হবে।
