গৌর সঙ্গে সঙ্গে যেন আমার বেয়াদপির জন্য মাপ-চাওয়া মিহি গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল, সত্যি বেড়ানোটা বন্ধ করলেন কেন বলুন তো?
কেন করলাম? ঘনাদা আমাদের আর সেই সঙ্গে সমস্ত কলকাতা শহরের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে বিষোদগার করে বলেছিলেন, এ শহরে বেড়াবার জায়গা আছে কোথাও? ওই তো তোমাদের গড়ের মাঠের উঠোন থেকে লেকের খিড়কি পুকুর! তাও গিজগিজ করছে যত বেতো, হাঁপানি আর অম্বুলে রুগিতে। বুক ভরে দম নেবার, পায়ের খিল ছাড়িয়ে ছোটবার, আকাশ ছাড়িয়ে চোখ মেলবার আছে কোনও জায়গা?
ব্যস! আর কিছু শোনার দরকার হয়নি। ওইটুকু ইশারাই আমাদের যথেষ্ট।
তৎক্ষণাৎ কাজে লেগে গেছি। দুজনে এক কামরারই বোর্ডার বলে প্রথমে গৌরের সঙ্গেই পরামর্শটা হয়েছে। শিশির শিবুকে তারপর জানাতে গিয়ে খুঁজে পাইনি। না পেলেও ভাবনা হয়নি কিছু। এমন একটা মতলব শোনামাত্র তারা যে লুফে নেবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ তখন আমাদের নেই।
পছন্দমতো জায়গার নামটাও জলদি মাথায় এসে গেছে খবরের কাগজের পাতা ওলটাতে ওলটাতে, সেই ঝাউগাছ মার্কা ছবিটা দেখে।
দিঘা! এর চেয়ে জুতসই জায়গা আর হতে পারে না। শুধু ঘনাদাকে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেবার জন্যই যেন জায়গাটা এতদিন ধরে তৈরি হয়ে আছে।
বুক ভরে নিশ্বাস নেবেন ঘনাদা? তা নিন না! সমস্ত বে অফ বেঙ্গলের হাওয়াই তিনি ভরে নিন না ফুসফসে!
পায়ের খিল ছাড়িয়ে ছুটবেন? তা কেয়া আর ঝাউ ঝোপ বাঁচিয়ে ছুটুন না বালির চড়া ধরে সেই কন্যাকুমারী অবধি।
আর দিগন্ত ছাড়িয়ে চোখ মেলতে চান? তা বঙ্গোপসাগর ছাড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগরই পার হয়ে যাক না তাঁর দৃষ্টি।
না, দিঘা যেন আমাদের ওপর দৈবের দয়া!
টুরিস্ট অফিসের পুস্তিকা-টুস্তিকা জোগাড় করে টাইম টেবল দেখে-টেখে প্রথমেই টঙের ঘরে উঠে ঘনাদাকে সুসংবাদটা জানিয়েছি।
গড়গড়ার টান দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ঘনাদা বেশ মনোযোগ দিয়েই প্রস্তাবটা শুনেছেন। শুনে হুঁ হাঁ কিছু করেননি। অবশ্য তা করবেন-ই বা কেন? আনন্দ যতই হোক, তাতে ধেই-নৃত্য করা তো আর তাঁর সাজে না!
কবে কোন গাড়িতে রওনা হব তাঁকে জানিয়ে সঙ্গে কী কী নেওয়া হবে তারই একটা ফিরিস্তি করতে আমরা নীচে নেমে গেছি।
সেই নীচে নামতেই শিশির শিবুর সঙ্গে দেখা আর তারপর থেকেই গৃহযুদ্ধ শুরু—দার্জিলিঙ, না দিঘা!
শিশির-শিবু ঘনাদাকে নিয়ে যাবে-ই দার্জিলিঙ।
আমরাও নাছোড়বান্দা। তাঁকে দিঘায় না নিয়ে ছাড়ব না।
প্রথমে তর্কাতর্কি ঠাট্টা টিটকিরি, তারপর বাক্যালাপই বন্ধ।
দিঘা ছেড়ে যারা দার্জিলিঙ যেতে চায় তারা কি কথা বলার যোগ্য!
পারতপক্ষে এক জায়গায় এক সঙ্গে থাকি না। খাবারঘরে মাঝে মাঝে যা বাধ্য হয়ে পরস্পরের সঙ্গ সহ্য করতে হয়। ঠারেঠোরে ঠোকাঠুকিটা তখনই বাধে।
তা না হলে এ জোট ও জোটের ছায়াই মাড়ায় না। আসরঘরে ওরা ঢেকে তো আমরা বেরিয়ে যাই। টঙের ঘরের সিঁড়ি দিয়ে ওরা নামে তো আমরা উঠি।
হ্যাঁ, টঙের ঘরে সুবিধা পেলেই গিয়ে হাজিরা দিতে হয় বই কী!
শুধু হাতের হাজিরা নয়, সঙ্গে থাকে এবেলা ওবেলা হরেক রকম প্রণামী। সকালে যদি হিঙের কচুরির থালা হয় তো বিকেলে জিরের জলের বাটি বসানো ফুচকার কাঁসি।
প্রণামী আবার বাজারের হাওয়া বুঝে বদলাতেও হয়। ওরা কড়া পাক আমদানি করেছে বলে যদি আঁচ পাই তো আমরা তালশাঁসের রেকাবি সাজিয়ে তার ওপর টেক্কা দিই। ওদের কবিরাজি কাটলেটকে কানা করতে আমরা খোদ পার্ক স্ট্রিটের সেরা দোকানের সসেজ-রোল না আনিয়ে ছাড়ি না।
তা, এমন তোয়াজ না পেলে ঘনাদা ঘাড় কাত করবেন কেন? বাজিমাত আমরা তাইতে এক রকম করেই ফেলেছি। শনিবার সকালে শুধু তাঁকে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে তোলার অপেক্ষা।
শিশির-শিবুর মুখজোড়ায় তখন কেমন ছাই মেড়ে দেয় শুধু তাই দেখবার আশাতেই প্রহর গুনছি।
দার্জিলিঙ! দিঘা ছেড়ে ঘনাদাকে কেমন দার্জিলিঙে নিয়ে যেতে পারে এবার দেখব! দার্জিলিঙ লে দূর, শিয়ালদাতেই নয়, ট্যাক্সি যখন যাবে সোজা হাওড়ায় তখনই ওদের চক্ষু সব কী চড়কগাছ-ই না হবে!
ঘনাদাকে সমস্ত প্রোগ্রামটা ক-দিন ধরেই শুনিয়ে দিয়েছি। প্রোগ্রাম আর সেই সঙ্গে দিঘা-প্রশস্তি।
একেবারে স্বপ্নের রাজ্য, বুঝেছেন ঘনাদা! গৌর নিজেই মধুর আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে বর্ণনা করতে গিয়ে, ঝাউ বনগুলো যেন কোনও রূপকথার দেশের নার্শারি থেকে স্পেশ্যাল অর্ডার দিয়ে আনানো। আর সমুদ্রের তীরের বালি? সে তো বালি নয়, যেন পরীদের হাসি-গুড়োনো ট্যালকম পাউডার।
হুঁ-উ? ঘনাদা বনোয়ারির সযত্নে বয়ে আনা চায়ের ট্রের রং-বেরং-এর পেষ্ট্রি সাজানো প্লেট থেকে পুরুষ্টু ক্রিম রোলটিই প্রথম তুলে অর্ধেক মুখে পুরে গৌরের দিকে যেন সবিস্ময়ে তাকিয়েছেন।
উৎসাহিত হয়ে গৌর আরও অনেক কিছুই বলে গেছে তারপর। জন্মে কখনও দিঘার ধারে কাছে যায়নি বলে তার কল্পনাকে হোঁচট খেতে হয়নি কোথাও।
ক্রিম রোলের পর প্লেটের অর্ধেক পেস্ট্রি সাবাড় করে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ঘনাদা কোনওবার হয়তো বলেছেন, কিন্তু দীঘার জল নাকি ভাল নয়!
জল ভাল নয়! আমরা একেবারে আকাশ থেকে পড়েছি। তারপর উঠেছি। চিড়বিড়িয়ে, কে বলেছে? ওই ওরা বুঝি? ওই দার্জিলিঙওয়ালারা?
খানিকক্ষণ ঘনাদার কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। প্লেটের বাকি পেষ্ট্রিগুলোর সদগতি করে চায়ের পেয়ালাটিতে শেষ চুমুক দিয়ে যেন নেহাত বৈরাগ্যের সঙ্গে ট্রে-টা একটু সরিয়ে রেখে তিনি বলেছেন, হ্যাঁ। ওরা বলছিল দার্জিলিংঙের পাহাড়ি ঝরনার গলানো রুপোর মতো জল যেন স্বর্গের অমৃত!
