কী নোটিশ আবার? আমিই কৌতূহলটা প্রকাশ করে প্রসঙ্গটা চালু রাখি।
এই বলে নোটিশ যে, গৌর আমাকে বোঝাবার জন্যে গলাটা প্রায় গলির ওপার পৌঁছোবার মতো ছড়িয়ে দিয়ে বলে, বাহাত্তর নম্বরের এজমালি কোনও জিনিস কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
ওপক্ষের পালটা জবাবটা সঙ্গে সঙ্গেই শোনা যায়।
শিশির যেন শুধু শিবুকে শোনাতেই মাইক-ফাটানো গলায় বলে, ক-দিন ধরে ভাবছি বাহাত্তর নম্বরের একটা নতুন নিয়ম করলে কী রকম হয়।
নিশ্চয়! নিশ্চয়! শিবু সমর্থনের উৎসাহে সজোরে টেবিল চাপড়ে আমাদের থালাবাটিগুলো ঝনঝনিয়ে তোলে, একটা কেন! এখানে সব নিয়ম এবার নতুন হওয়া দরকার!
টেবিল চাপড়ে থালা-বাটি কাঁপানোর জবাবে চোখা চোখা ক-টা বাক্যবাণ জিভের ডগায় এলেও শিশিরের প্রস্তাবিত নিয়মটা জানবার কৌতূহলে নিজেদের সামলে রাখতে হয় তখনকার মতো।
তেলে-বেগুনে জ্বালিয়ে তোলবার মতো নতুন নিয়মটা ঘোষণা করতে শিশিরের। দেরি হয় না। যেন তেঁড়া পেটার মতো গলায় সে ঘোষণা করে, বাহাত্তর নম্বরে ঠুটোদের জায়গা নেই!
গৌর ও আমি দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। আমাদের বলে কিনা ঠুটো! মানে— নুনের বাটিটা হাত বাড়িয়ে নেবার ক্ষমতা আমাদের নেই?
অ্যাপলোর বদলে একটা ভোস্টক ছাড়বার পায়তাড়াই তারপর কষতে হয়। মাঝে থেকে খাওয়ার পালাটাই মাটি। পাতে কী পড়ে আর পেটে কী যায় তা খেয়ালই থাকে না।
এমনই চলছে আজ প্রায় এক হপ্তা। হিসেব করে বললে, পাক্কা ছ-দিন। এই শনিবারেই হপ্তা ঘুরে আসবে।
আরম্ভ হয়েছিল কীসে?
কীসে আর? শিশির-শিবুর একগুঁয়ে আহাম্মকিতে।
আমরা তো কাজ প্রায় পনেরো আনা হাসিল করে এনেছিলাম। শুধু টিকিট কটা কিনলেই হয়। টাইম টেবল দেখে ক-টার ট্রেন স্টেশনে কখন পৌঁছবে, নেমে কী করব, কোথায় যাব সব ঠিক করা হয়ে গিয়েছিল। যাঁর জন্য এত তোড়জোড় তিনিও
তো সায়ই দিয়েছিলেন বলা যায়।
চুপ করে থাকা মানেই তাই নয় কি? তিনি মুখ বুজে ভুরু-টুরু কুঁচকে বেশ মন দিয়েই সমস্ত পরিকল্পনাটা শুনেছিলেন। ভুলেও একবার কই উলটো কিছু তো বলেননি।
শিবু-শিশির কী কাজে কে জানে বেরিয়েছিল। তারা ফিরে আসতেই বিজয়গর্বে আহ্লাদে আটখানা হয়ে খবরটা তাদের শুনিয়েছিলাম।
এমন একটা সুসংবাদে কোথায় নেচে উঠবে আনন্দে, না দুজনেই চোখ পাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, কী? কোথায় যাবেন ঘনাদা?
দিঘা! সমস্বরে সোল্লাসে জানিয়েছিলাম আমি আর গৌর।
দিঘা! দিঘা যাবেন ঘনাদা তোমাদের সঙ্গে? শিশির-শিবু হেসেই খুন হয়েছিল। এমন আজগুবি মজার কথা কেউ যেন কখনও শোনেনি।
মেজাজ এতে গরম হয় কি না!
তবু নিজেদের সামলে যথাসাধ্য গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঘনাদা আমাদের সঙ্গে দিঘা যাচ্ছেন তাতে হাসবার কী আছে?
না, হাসবার আর কী আছে! শিবু ব্যঙ্গ করেছিল, টালার ট্যাঙ্কে ইলিশের গাঁদি লেগেছে বললেও হাসবার কিছু নেই।
তার মানে কী, বলতে চাও কী? এবার গলা না চড়িয়ে পারা যায়নি, ঘনাদা দিঘা যাচ্ছেন না?
না, যাচ্ছেন না। শিশির মুচকে হেসে যেন সরকারি গেজেট থেকে পড়ে শুনিয়েছিল, কারণ তিনি যাচ্ছেন দার্জিলিঙ।
দার্জিলিঙ! ঘনাদা যাচ্ছেন দার্জিলিঙ! এবার আমাদের হাসবার পালা! তোমাদের সঙ্গে নিশ্চয়! ব্রেজিলের পেলে খেলচেন বেনেপুকুরের বি টিমে!
হাসাহাসি তো নয়, একেবারে আদা-জল-খাওয়া রেষারেষি।
ঘনাদাকে যেমন করে তোক আমাদের সঙ্গে দিঘা নিয়ে যেতেই হবে।
মৌ-কাটা খুব ভাল পাওয়া গিয়েছিল। ছুটি-টুটির সময় নয়, কিন্তু কী সব বোমা ফাটাফাটি হয়ে স্কুল কলেজের পরীক্ষা-টরিক্ষা সব বন্ধ। রাস্তার হাঙ্গামা সামলাতে পুলিশ বাড়ন্ত বলে খেলার মাঠের রেফারি লাইনসম্যানেরা সব মার খেয়ে খেয়ে ধর্মঘট করেছে। কলকাতা শহরের অরুচির মুখটা ক-দিনের জন্য বদলে আসার এই সুবর্ণ সুযোগ।
ঘনাদার নিজের মুখেই তার একটু ইশারা একদিন পেয়ে উৎসাহটা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
কাগজ খুললেই তো এখানে বোমা, ওখানে কাঁদানে গ্যাস, সেখানে গুলি। কোন এলাকায় কখন যে কী বাধবে কেউ জানে না।
ঘনাদা ক-দিন ধরে তাঁর সান্ধ্যভ্রমণটি বাতিল করেছেন।
সকালবেলা খবরের কাগজটির প্রথম পাতার শিরোনামা থেকে শেষ পাতার তলায় মুদ্রাকরের নাম ঠিকানা পর্যন্ত খুঁটিয়ে পড়া তাঁর প্রতিদিনের রুটিন।
সন্ধেবেলার বেড়ানো হঠাৎ বন্ধ করার সঙ্গে সকালের কাগজ পড়ার বিশেষ সম্পর্ক আছে বলেই আমাদের সন্দেহ।
ঘনাদা বিকেল না হতে কদিন ধরে আমাদের বৈঠকি ঘরই অলংকৃত করছেন। কিন্তু ওই দর্শন দেওয়া পর্যন্তই। আমাদের কপালে কণ্ঠসুধা বর্ষণ কিছু হয়নি। টঙের ঘর থেকে যে গড়গড়াটা বনোয়ারিকে দিয়ে নিত্য নীচে বয়ে আনিয়ে আবার যথাসময়ে ওপরে তোলান, শুধু তারই তরল ধ্বনি বেশির ভাগ আমাদের শুনতে হয়।
বুঝেসুঝে মাত্রা মতো একটু খোঁচা দিলে ঘনাদার কণ্ঠ থেকে তার চেয়ে সরস যদি কিছু ঝরে এই আশায় সে দিন একটু বাঁকা সুরেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বিকেলের বেড়ানো বুঝি ছেড়ে দিলেন, ঘনাদা? তা, যা দিনকাল, বাড়ি থেকে বেরুবার বিপদও আছে।
বিপদ! ঘনাদার মনে গিয়ে লেগেছিল কথাটা। বেশ একটু চিড়বিড়িয়ে বলেছিলেন, বিপদ আছে তো হয়েছে কী? বিপদের জন্য কি বেড়ানো ছেড়েছি?
ঠিক! ঠিক! শিবু-শিশিরের দু জোড়া চোখ আমায় যেন ঘৃণায় ভস্ম করতে চেয়েছিল, বিপদের ভয় করবেন ঘনাদা? কলম্বাসের ভয় নালা ডিঙোতে! নেপোলিয়ন কাঁপবেন ঘোড়ায় চড়তে!
