পরের দিন সামান্য কিছু লটবহর নিয়ে বেলমন্টো আমার সঙ্গে তার মোটর লঞ্চে আরাগুইয়া নদী দিয়ে রওনা হল। আমার পাগলামি বাড়লে সামলাতে পারবে কিনা সেই ভাবনায় বেশ একটু ভয়ে ভয়েই গেল বেলেম বন্দর পর্যন্ত সারা পথ।
ঘনাদা থামলেন।
ব্যস! গল্প শেষ? বিদ্রুপের সুর লাগাবার চেষ্টা করলেও আমাদের আগ্রহটা ঠিক বোধ হয় চাপা দেওয়া গেল না।
হ্যাঁ, শেষই বলতে পারো। ঘনাদা উদাসীনভাবে বললেন, আমাজনের মোহনায় বেলেম বন্দর থেকে ব্রেজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়া পর্যন্ত এখন পাহাড় জঙ্গল জলা ফুড়ে দু হাজারেরও বেশি কিলোমিটারের সড়ক বেরিয়েছে। ও অঞ্চল তো এখন সোনার দেশ আর বেলমন্টোর র্যাঞ্চ দুনিয়ার অদ্বিতীয় বললে ভুল হয় না।
সব আপনার ওই প্যান্টের পায়ের ভাঁজে পাওয়া এক ছিটে কাদার কেরামতি। আমরা প্রায় চোখ পাকিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, তা দিয়ে করেছিলেন কী?
শুকনো খাল-বিলে তা একটু গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। ঘনাদার মুখে কোনও ভাবান্তর নেই।
তাতে হল কী! আমরা অত্যন্ত সন্দিগ্ধ।
হল সাইনোলেবিয়াস বেলট্টি! ঘনাদা আমাদের দিকে একটু অনুকম্পাভরে তাকালেন।
কী বললেন!—শিবু প্রায় খাপ্পা ওসব হ-য-ব-র-ল রেখে আসল ব্যাপারটা কী হল তাই বলুন।
সাইনোলেবিয়াস বেলট্টি ছাড়া আর আসল ব্যাপার তো বোঝানো যাবে না। ঘনাদা যেন দুঃখের সঙ্গে জানালেন, তবু নামটা বাদ দিয়েই বলছি! আমরা চলে যাবার কয়েক হপ্তা পরে ওদেশের যেমন দস্তুর তেমনই তুমুল বর্ষা নামল, বান ডাকল নদীতে। ওই শুকনো কাদার গুঁড়ো জল লেগে ভিজে তার আধঘণ্টার মধ্যে ভেলকি লাগিয়ে দিলে, দিনে দিনে শ থেকে হাজার, হাজার থেকে লাখে লাখ মশার যম হয়ে উঠে। এক বছর পেরিয়ে দু বছর পুরো না হতে হতে ওঅঞ্চলে মশার ডাক গল্প কথা হয়ে দাঁড়াল।
ওই বেলট্টি না কী তাহলে কাদার গুঁড়ো, মানে ধুলো-পড়া ফুসমন্তর?—একটু বাঁকা হাসি হাসবার চেষ্টা করলে গৌর-এতক্ষণ তা বলতে হয়! ঝাড়ফুঁকে মশার বংশ নির্বংশ করলেন!
না, ঝাড়ফুঁক নয়। ঘনাদা ধৈর্যের অবতার হয়ে বোঝালেন, সাইনোলেবিয়াস বেলট্টি হল একরকম খুদে মাছ, দেখতে কতকটা আমাদের খলসের মতো। ওদেশে একটা ডাকনাম আছে মুক্তোমাছ বলে। আর্জেন্টিনার বান-ঢাকা নদী যখন মাঠ বন ভাসায় তখন এই মুক্তোমাছ ঝাঁকে ঝাঁকে সেই বেনো জলে জন্মায় আর ডিম ফুটে বেরিয়েই মশার শূক মানে প্রায় বাচ্চা পোকা ধ্বংস করতে শুরু করে। পরীক্ষিৎ রাজা সর্পমেধ যজ্ঞ করেছিলেন, আর এ মুক্তোমাছের জীবনের ব্রত হল যেন মশকমেধ। একটা মাছ একই দিনে পঞ্চাশটা অন্তত মশার বাচ্চা সাবাড় করে। ডিম ফুটে বার হবার তিন হপ্তা বাদেই মাদি মুক্তোমাছের নিজেরই ডিম পাড়া শুরু হয়। হপ্তায় শ তিনেক ডিম প্রতিটি মুক্তোমাছ পাড়ে। বানের জল নেমে যাবার পর সেসব ডিম মাঠের কাদার মধ্যে তারই সঙ্গে শুকিয়ে জমে থাকে। পরের বছর আবার বানের জলের ছোঁয়া লাগতেই—আধঘণ্টার মধ্যে সে ডিম যেন জেগে উঠে বাচ্চা ফোটায়। এক রত্তি কাদায় দশটা ডিমের ছানা থাকলেই বছর ঘুরতে না ঘুরতে তারা রাবণের গুষ্টি হয়ে ওঠে। বেলমন্টোর কাছে আসবার আগে আর্জেন্টিনার ওই রকম বান-ডাকা ক-টা নদীতে ক-দিন ঘুরেছিলাম। সেখানেই কোথাও ওই কাদার ছিটে প্যান্টে লেগেছিল নিশ্চয়। তা না লাগলে আর সময় মতো সে কথাটা মনে না পড়লে, পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা র্যাঞ্চ আজ বিফল স্বপ্ন হয়েই থাকত।
কাপড়-চোপড় একেবারে নিখুঁত ধোপদুরস্ত রাখার বাতিক সেই থেকে আমার কেটে গেছে।
গল্পের ল্যাজের ওই হুলটুকু আমাদের বেয়াদবির জবাব।
ঘনাদা সেটা বেশ ভাল করে বিঁধিয়ে, উঠে পড়লেন নীচে খেতে যাবার জন্য। শিশিরের সিগারেটের টিনটা কিন্তু তখন তাঁর হাতে। ভুল করে নয়, এ নেওয়াটা মানহানির খেসারত স্বরূপ।
টল
দিঘা, না দার্জিলিঙ?
তাই থেকে মুখ দেখাদেখি নেই!
মানে, না থাকাই উচিত ছিল। কিন্তু এক বাড়িতে বাস করে এক খাবার-ঘর এক সিঁড়ি এক বারান্দায় চলতে ফিরতে হলে তা আর কী করে সম্ভব?
তার বদলে বাক্যালাপ তাই বন্ধ।
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনে আজ প্রায় এক হপ্তা ধরে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার অবস্থা চলেছে। মনান্তর চরমে উঠে বৈদেশিক দূতাবাসে তালা-চাবি পড়বার পর তৃতীয় শক্তির মারফত যেমন কথা চালাচালি হয় আমাদের চলছে তাই।
কার সঙ্গে এ সম্পর্কচ্ছেদ?
না, বাহাত্তর নম্বরে বিপর্যয়ের খবর শুনলেই যা হয় তা এবার নয়। ঘনাদা সম্বন্ধে ভাবিত হবার কিছু নেই। এবার গৃহযুদ্ধের মহড়া যা চলেছে তা আমাদের নিজেদের মধ্যে। একদিকে শিশির আর শিবু, আর একদিকে গৌর আর আমি। আমাদের দুই জোটের মধ্যে এখন সব সম্পর্ক ছিন্ন।
সম্পর্ক ঘুচিয়ে ফেলতে চাইলেও একই আস্তানার বাসিন্দা হিসাবে খবর দেওয়া-নেওয়া আর সুযোগমতো খোঁচা দেওয়ার কাজটা তো চালাতে হয়। তার জন্য মধ্যস্থ কাউকে না হলে চলে না।
খাবার ঘরে জমায়েত হবার সময় অবশ্য পুরনো ঠাকুর রামভুজ আমাদের ভরসা।
গৌরের হয়তো নুনের বাটিটা দরকার। আর দরকার থাক বা না থাক, বাটিটা যখন শিশিরদের টেবিলে তাদের পাতের কাছাকাছি তখন গলাটা একট তেতো করে বলতেই হয়, এ ঘরে একটা নোটিশ টাঙাতে হবে, বুঝেছ, রামভুজ?
হাঁ, বাবু! বুঝুক না বুঝুক, রামভুজ তৎক্ষণাৎ এক কথায় সায় দেয়। আমাদের গৃহযুদ্ধের ঝামেলা এড়াবার এই সোজা ফিকির সে বার করে ফেলেছে।
