ঘাঁটিতে পৌঁছেই ভাড়াটে প্লেনটার পাওনা চুকিয়ে বিদেয় করে দিয়েছিলাম। বেলমন্টোর কাছে এসে তো আর দু-চার দিনে চলে যাওয়া যাবে না, সুতরাং মিছিমিছি প্লেনটাকে আটকে রেখে দিনের পর দিন ভাড়া গোনার দরকার কী!
কিন্তু বেলমন্টোর সঙ্গে দেখা হবার পর অবাক হলাম। এতকালের বন্ধুর এ কী অভ্যর্থনা।
দেখা হবার পর তার প্রথম প্রশ্ন হল, প্লেনটা ছেড়ে দিলে? না দিলেই পারতে।
কেন বলো তো! মিছিমিছি প্লেনটা বসিয়ে রেখে ভাড়া গুনতে যাব কেন?
না। ভাড়া গুনবে কেন? ও প্লেনে-ই ফিরে যেতে পারতে তাড়াতাড়ি।
আমি হতভম্ব হয়ে খানিক বেলমন্টোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সত্যি বেলমন্টোর হল কী! যা হয়েছে এবার ওই তাকিয়ে থাকার দরুনই ভাল করে চোখে পড়ল।
তার গলার স্বরে প্রথমেই একটা কেমন হতাশ কিছুতে-কিছু-আর-আসে-যায় না গোছের সুর অবশ্য পেয়েছিলাম। সেটাকে গোড়ায় তেমন আমল দিইনি, এখন লক্ষ করে দেখলাম গলার স্বরে যার আভাস মাত্র পেয়েছি, মুখে তার ছাপটা একেবারে গভীরভাবে পড়েছে। তার চোখের কোলে পুরু করে কালি, কপালের চামড়ায় যেন সূক্ষ্ম লাঙল চালানো আর মুখটা শুকিয়ে প্রায় আমসি। ঘূর্তিতে উৎসাহে ঝলমল যে বেলমন্টোকে জানতাম তার হঠাৎ হল কী!
বেশ দুর্ভাবনা নিয়েই এবার জিজ্ঞাসা করলাম, কী ব্যাপার কী বলো তো, বেলমন্টো? তুমি কি চাও না যে আমি এখানে থাকি!
বেলমন্টোর মুখে ফ্যাকাশে একটু হাসি দেখা গেল। প্রায় এরা গলায় সে বললে, আমি নিজেই যখন থাকছি না, তখন তোমায় থাকতে বলব কোন মুখে?
তুমি নিজেই থাকছ না! আমি আরও হতভম্ব—যাচ্ছ কোথায় তোমার এ র্যাঞ্চ ছেড়ে?
এ র্যাঞ্চ আমি বিক্রি করে দিচ্ছি! কথাটা যেন বেলমন্টোর বুক চিরে বেরিয়ে এল।
বিক্রি করে দিচ্ছ? তোমার এত সাধের র্যাঞ্চ! কাকে বিক্রি করছ?
কাকে আর করব! হতাশ সুরে বললে বেলমন্টো, এ জলা জঙ্গলের নরক অমনি দিলেও কেউ নেবে না। আমি তাই ব্রেজিল সরকারের কাছেই আবেদন জানিয়েছি। গতকাল তাদের জবাব এসেছে।
বেলমন্টো তারপর ব্রেজিল সরকারের জবাব আমায় দেখাল। সে জবাবে ব্রেজিল সরকার সমস্ত র্যাঞ্চ-এর যা দর দিয়েছে তা দেখে আমার তো মেজাজ গরম।
রেগে বললাম, জায়গা-জমির কথা ছেড়ে দাও, তোমার যে হাজার কয়েক গোরু ঘোড়া আছে তার দামও তো এতে উঠবে না। তবু সবকিছু বেচে পালাবার এ ঝোঁক তোমার কেন?
কেন তা এখনও যদি না বুঝে থাকো, বেলমন্টো এবার তিক্ত স্বরে বললে, তা হলে সন্ধে হলেই বুঝবে।
বুঝতে তখনই কিন্তু আমি আরম্ভ করেছি। সন্ধে হবার সঙ্গে সঙ্গে একেবারে মর্মান্তিকভাবে বুঝতে পারলাম।
রূপকথায় সাতশো রাক্ষুসির হাঁউ মাঁউ খাঁউ করে তেড়ে আসার গল্প আছে। যে বিভীষিকা স্বচক্ষে ও স্বকর্ণে দেখলাম শুনলাম তার তুলনায় সাতশো রাক্ষুসি যেন নিউক্লিয়ার বোমার কাছে পটকা।
সন্ধে হতে না হতে আকাশ বাতাস যেন আতঙ্কে কাতরে উঠল। সে কী নিদারুণ অদ্ভুত আওয়াজ! বোমারু বিমানের ঝাঁক হানা দেবার সময় বুকের-রক্ত-জমিয়ে-দেওয়া যে গর্জন তোলে তাও বুঝি এ ভুতুড়ে শব্দ-বিভীষিকার চেয়ে ভাল।
আওয়াজটা কীসের? সন্দিগ্ধ প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারলাম না, ব্রেজিলের মতো গ্রসো জঙ্গলের কোনও প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ারের? দুনিয়ার সেই আদি রাক্ষস টিরানোমোরাস-এর নাতিপুতির?
না, তার চেয়ে ভয়ংকর কিছুর, ঘনাদা আমাদের হতভম্ব মুখগুলোর ওপর একবার আলতো চোখ বুলিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ঘন কালো প্রলয়ের মেঘের মতো সবকিছু ঢেকে-মুছে দেওয়া যোজনের পর যোজন মশার ঝাঁক।
হাসি চাপতে কাশতে কাশতে যে টিপ্পনিটা সকলেরই গলা পর্যন্ত ঠেলে উঠেছিল
ঘনাদা আগে থাকতেই তার খোঁচাটা ভোঁতা করে দিয়ে বলল, ভাবছ মশার ঝাঁককে। এত ভয় কীসের? ডি ডি টি কি তখনও আবিষ্কার হয়নি?
হয়েছে। বেলমন্টোকে সেই কথাই বলেছিলাম। কিন্তু তাতে করুণমুখে সে জানিয়েছিল যে ডি ডি টি-কে ডরাবার মতো মশার জাত এ নয়। বিজ্ঞানের যুগে অনেক পোড়-খাওয়া এ মশার বংশের কাছে ডি ডি টি জলপান। খানায় ডোবায় জলা-জঙ্গলে যে কেরোসিন ঢালা হয় তা এরা শখ করে গায়ে মাখে। এদের ঠেকাতে মশারি ফেলে শুয়ে থাকা যায়, কাজকর্ম চলে না।
বেলমন্টোর কথা শুনে হায় হায় করে উঠলাম, তারপর তাকে কিছু না বলে ছুটে গেলাম নিজের সঙ্গে আনা সুটকেসটা খুলতে!
ভাগ্য সত্যিই ভাল। একটা জিনের প্যান্টের পায়ের মোড়া খাঁজে কাদার ছিটেটা পেলাম।
বেলমন্টো তখন পিছু পিছু এসে হতভম্ব হয়ে আমার কাণ্ডকারখানা দেখছে। বেশ। একটু চিন্তিত হয়ে বললে, আমার এই কবছরে যা হবার উপক্রম, তোমার এক দিনেই তা হল নাকি! মাথা খারাপ হয়ে গেল মশার ডাক শুনে?
তা যদি হয় তবু তোমার কোনও ভাবনা নেই। বেলমন্টোকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, ব্রেজিল সরকারকে তোমার রাজত্ব বেচা, বেশিদিন না পারো, একটা বছর অন্তত স্থগিত রাখো। আর বর্ষা এলে যা বানে ভাসবে এমন একটা শুকিয়ে আসা খাল-বিল আমায় দেখিয়ে দিয়ো কাল সকালে।
পাগলের সঙ্গে তর্কে লাভ নেই বলেই বোধ হয় বেলমন্টো পরের দিন সকালে তাই দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল।
মশারির ভেতর শুলেও সারারাত্রি মশাদের ভয়ংকর অর্কেস্ট্রায় দু-চোখের পাতা এক করতে পারিনি। রাত-জাগা রাঙা চোখে যা আমি করেছি তা দেখে, পাছে বেশি খেপে যাই, এই ভয়েই বোধহয় বেলমন্টো টু শব্দটি করেনি।
