বনোয়ারি! রামভুজ! ঘনাদার গলা ক্রমশ উদারা থেকে মুদারায় উঠেছে। সেই সঙ্গে একটু কেমন কাঁপনও যেন পাওয়া গেছে তার মধ্যে।
পায়ের শব্দে এবার বোঝা গেছে যে ঘনাদা সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন।
আমাদের রুদ্ধ নিশ্বাসে অপেক্ষা বিফল হয়নি। ঘনাদা এক-পা এক-পা করে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন টের পেয়েছি।
সিঁড়ি থেকে নেমে বারান্দা। বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে আড্ডাঘরের সামনে এসে একটু বুঝি দ্বিধা। তারপর মরিয়া হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে একটা প্রায় কাতর স্বগতোক্তি—এখানে কেউ নেই নাকি?
কলকাতা শহরের বিদ্যুৎ-বিধাতা সেদিন অলক্ষ্যে আমাদেরই সঙ্গী হয়েছেন তা কি জানি!
ঠিক সেই মুহূর্তেই কারেন্ট ফিরে এসে ঘরের আলো জ্বলে উঠল।
আজ্ঞে, আছি বই কী!
কথাটা পুরোপুরি তখনও আমরা উচ্চারণ করতে পারিনি আর ঘনাদা আড্ডাঘরের ভেতরে দু-পা মাত্র বাড়িয়ে থমকে দাঁড়িয়েছেন।
ঘনাদা এবার রাম-জব্দ যাকে বলে তাই নিশ্চয়? পিছলে গলে পালাবার আর কোনও উপায়ই নেই।
না। স্বয়ং বিদ্যুৎ-বিধাতাকেও হার মানতে হল।
ঘনাদা এক মুহূর্তের জন্য যদি একটু ভড়কে গিয়ে থাকেন তাহলেও হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠায় চোখধাঁধানিতে তা আমরা দেখতে পাইনি।
যাক, আছ তাহলে!পরের মুহূর্তেই নির্বিকার মুখে মন্তব্যটা করে ঘনাদা যেভাবে সোজা তাঁর মৌরসি কেদারায় গিয়ে বসলেন তাতে মনে হল মাঝখানে যা যা ঘটেছে তা আমাদের ভ্রান্তি!
হ্যাঁ, তোমাদের ওই ডাইংক্লিনিং-এর ঠিকানাটা কী হে?
আমরা সবাই হতভম্ব ও নির্বাক। ঘনাদা তাঁর যাকে বলে সংরক্ষিত আরামকেদারায় বসবার পর শিশির আপনা থেকেই অভ্যাস বশে সিগারেটের টিনটা খুলে ফেলেছিল। ঘনাদার এ প্রশ্ন শুনে টিনটা সে এগিয়ে দিতে ভুলে গেল।
ঘনাদা নিজেই হাত বাড়িয়ে শিশিরের ত্রুটি সংশোধন করতে গোটা টিনটাই তুলে নিয়ে আমাদের হাঁ করা মুখগুলো যেন লক্ষ না করেই আবার বললেন, ওইখানেই
এখন থেকে সব কাচাব ঠিক করেছি।
আমাদের মুখে তখনও রা নেই। ঘনাদার হঠাৎ যেন টিপয়ের ওপরে রাখা ধোয়া
কাপড়গুলোর ওপরে চোখ পড়ল।
এই বুঝি তোমাদের কলের কাচা কাপড়! ঘনাদা যেন একটু উচ্ছসিতই হলেন, তা ভালই তো কেচেছে!
ভাল কী বলছেন! এতক্ষণে আমাদের জিভের সাড় ফিরে এল। সেই সঙ্গে ঘনাদাকে এখনও একটু বেকায়দায় ফেলবার আশা।
একেবারে যাচ্ছেতাই কাচা! শিবু নাক সিঁটকাল।
কাচা কাপড়গুলোর দিকে চেয়ে ঘনাদার ভুরুটা একটু কোঁচকাল কি? সেই ভ্রুকুটি আরও বাড়িয়ে দেবার চেষ্টায় বললাম, ডাহা ফাঁকিবাজি!
ঘনাদার চোখ দুটো সন্দেহে একটু যেন ধোঁয়াটে হতেই গৌর তাতে ধুনো চাপাল, দেখছেন না কী রকম কাদা-মাখানো!
তা আর দেখছি না! ঘনাদা অম্লানবদনে তাঁর আণুবীক্ষণিক চোখের প্রমাণ দিয়ে যা বললেন তাতেই আমরা সত্যিকারের কাত। বললেন, তা একটু-আধটু কাদা তো ভাল।
কাদা ভাল! কাচা কাপড়ে কাদায় আপনার আপত্তি নেই?
আপত্তি! বিলক্ষণ! ঘনাদা আমাদের মূর্খতায় যেন ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, এক ফোঁটা কাদার দাম কী হতে পারে জানো! একটা কাদার ছিটে দিয়ে একটা রাজ্য উদ্ধার করা যায়?
সে কী রকম কাদা! আর্মস্ট্রং-অ্যালড্রিনের আনা চাঁদের মাটির নাকি? ঘনাদাকে তখনও কাহিল করবার ক্ষীণ আশা নিয়ে খোঁচাটা দিলাম।
না, চাঁদের নয়, এই আমাদেরই পৃথিবীর। ঘনাদা খোঁচাটা যেন টেরই না পেয়ে বললেন, দক্ষিণ আমেরিকার বান-ডাকানো দু-একটা নদীর আশীর্বাদ বলা যেতে পারে। এক ছিটে সেই কাদা না পেলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় র্যাঞ্চ জলের দরে বিক্রি হয়ে গিয়ে তার মালিক আজ পথের ভিখিরি হত।
এক ছিটে কাদায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় র্যাঞ্চ-এর মুশকিল আসান হয়ে গেল! মন্তর পড়া দৈব কাদা বুঝি? আমরা তখনও সঙ্গিন উঁচিয়ে আছি।
না, মন্তর পড়া-টড়া দৈব-টৈব কিছু নয়! ঘনাদা ধৈর্যের অবতার হয়ে বুঝিয়ে আর বাগড়া দেবার অবসর দিলেন না। নেহাত সাধারণ কাদা—দৈব নয়, বরং জৈব বলা যেতে পারে। আমার একটা প্যান্টের একটা পায়ে এক ছিটে যে লেগে ছিল তা আমি নিজেই জানতাম না। আর্জেন্টিনা হয়ে তখন পুরনো বন্ধু বেলমন্টোর খোঁজ নিতে ব্রেজিলের মতো গ্রস্সাে অঞ্চলে আরাগুয়াইয়া নদীর দেশে তার র্যাঞ্চ-এ গেছি। গোরু ঘোড়ার র্যাঞ্চ, কিন্তু ছোটখাটো কিছু নয়। আমাদের গোটা চব্বিশ পরগণা জেলাটা তার র্যাঞ্চ-এর এলাকার মধ্যে ধরিয়ে দিয়েও কলকাতা হাওড়া শহর দুটো ঢোকাবার মতো জায়গা কিছু থাকে।
বেলমন্টো একটু স্বপ্ন-দেখা গোছের মানুষ। ব্রেজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ারই তখন সবে পরিকল্পনা চলছে। উত্তরের আমাজনের মোহনায় বেলেম বন্দর থেকে দক্ষিণের রাজধানী ব্রাসিলিয়া পর্যন্ত দু-হাজারের ওপর কিলোমিটারের পাহাড়, জঙ্গল, জলা ফুড়ে যাওয়া সড়ক তখন কল্পনারও অতীত। সেই তখনকার দিনেই বেলমন্টো তার পৈতৃক আর নিজের উপার্জন করা সব কিছু দিয়ে জলাজঙ্গলে এই অজানা অঞ্চল কিনে ছিল। তার স্বপ্ন হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় র্যাঞ্চ তৈরি করা, যেখানে এমন গোরু ঘোড়া সে পয়দা করবে পৃথিবীতে যার জুড়ি মিলবে না।
এই স্বপ্ন সার্থক করার পথে কতদূর সে এগিয়েছে দেখবার জন্যই সেবার পাহাড় জঙ্গল ভেঙে বেশ কষ্ট করে তার র্যাঞ্চ-এর মুলুকে গেছলাম।
রিও আরাগুয়াইয়া মানে আরাগুয়াইয়া নদীর এলোমেলো বিনুনিগুলো যেখানে এসে মিলেছে সেইখানে বেলমন্টোর প্রধান ঘাঁটি। নেহাত একটা সেকেলে প্লেন ভাড়া পেলে সে ঘাঁটি খুঁজে পাওয়া শক্ত হত।
