তাঁকে আবার টঙের ঘরের দিকে ঘুরতে দেখে শশব্যস্ত হয়ে পথ আগলে দাঁড়াতে হয়েছে।
আজ আমাদের স্টিমার পার্টি তা ভুলে গেলেন নাকি ঘনাদা?
আউটরাম ঘাটে লঞ্চ বাঁধা, এখুনি রওনা হতে হবে!
না। এবার ঘনাদা অনুগ্রহ করে সরব হয়েছেন, আমার যাওয়া হবে না। যাবার মতো আমার পোশাক নেই। সব নোংরা!
সামান্য ক-টি কথা, কিন্তু নিউক্লিয়ার বোমার চেয়ে সাংঘাতিক। ঘনাদা সেইটি ছেড়ে সোজা ওপরে উঠে গেছেন। আমরাও হঠাৎ নির্বাক, নিস্পন্দ হয়ে গেছি রোগের আসল গোড়াটা কোথায় তা বুঝে।
ওই নোংরা পোশাকটাই যত নষ্টের মূল।
কিন্তু মূলটাই ঘনাদার একেবারে মনগড়া। সত্যি কথা বলতে, আমাদের কারও কোনও অপরাধ নেই। বনোয়ারির একটা সামান্য ভুল থেকে সব গণ্ডগোল শুরু।
আমাদের সব জামাকাপড় বড় রাস্তার এক ডাইংক্লিনিং-এ ধোয়ানো হয়। নিয়ে যায় বনোয়ারি। সেদিন আমাদের ধুতি-পাঞ্জাবির সঙ্গে কী ভাবে ভুল করে ঘনাদার একটা ফতুয়া ডাইংক্লিনিং-এ চলে গেছে।
দুপুরের পর বিকেলে সে ফতুয়ার খোঁজ না পেয়ে ঘনাদা যে রকম হুলস্থূল বাধিয়েছেন তাতে মনে হয়েছে লালবাজারকে বাদ দিয়ে মিলিটারি পুলিশকেই তৎক্ষণাৎ না তলব করলে নয়।
ভয়ে ভয়ে বনোয়ারি এবার স্বীকার করেছে যে, ফতুয়াটা অন্য কাপড়জামার সঙ্গে ডাইংক্লিনিং-এ দিয়ে এসেছে।
আমার ফতুয়া ডাইংক্লিনিং-এ? ঘনাদা যেন অপমানিত হয়েছেন।
তাতে দোষটা কী? গৌর বুঝি প্রবোধ দেওয়ারই চেষ্টা করেছে, ময়লা ফতুয়া পরিষ্কার হয়ে আসবে।
ব্যস, গৌর অজান্তে যা করে ফেলেছে তা আউরে-ওঠা কড়া মাড়িয়ে ফেলারই। শামিল।
আমার ফতুয়া ময়লা! চড়ার বদলে ঘনাদার গলা খাদে নেমেই আমাদের বেশি সন্ত্রস্ত করে তুলেছে, হ্যাঁ, ময়লা তো নিশ্চয়ই। আমার তো আর ড্রাই ওয়াশিং করা নয়, নেহাত সাবানে কাচা।
ঘনাদা সেই যে বিগড়েছেন হাজার সাধাসাধিতেও আর সিধে করা যায়নি। কিন্তু অভিমান যত হোক আমাদের অত সাধের স্টিমার পার্টিটা অমন করে ভণ্ডুল করে দেওয়াটা কোনওমতেই ক্ষমা করবার নয়। ঘনাদাকে জব্দ করে কিছুটা শোধ নেবার জন্য তাই এত জল্পনাকল্পনা।
কিন্তু জল্পনাকল্পনাই সার হত যদি না ভাগ্য অমন আশাতীতভাবে সহায় হত। সাহায্যটাও ভাগ্যের যেন একরকম রসিকতা। তা না হলে পালাটা অমন গোল হয়ে মিলে গিয়ে মুশকিলের যা মূল তাতেই আসানের ব্যবস্থা হবে কেন?
হপ্তা ঘুরে আবার এক শনিবার। আড্ডাঘরে আমরা জমায়েত হয়েছি সন্ধে থেকেই, কিন্তু আসর জমেনি। অন্য কিছুর অভাবে তাস নিয়ে বসেছি, কিন্তু তিন নো ট্রাম্পের ওপর পাঁচ ক্লাব ডেকে পাঁচশো ডাউন দিয়েও পার্টনার শিশিরের কাছে গালমন্দ দূরে। থাক, একটা ঠাট্টা পর্যন্ত শুনতে হয়নি। অমন একটা মৌ-কা পেয়ে শিবু গৌর ডবল দিতেই ভুলে গেছে। আর শেষ পর্যন্ত রবার হবার জন্যও অপেক্ষা না করে খেলা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
শিবু না শিশির কে একবার যেন মোড়ের দোকান থেকে গরম খাস্তা কচুরি আনাবার কথা তুলেছিল। কথাটা উঠেই আবার আমাদের অন্যমনস্কতায় চাপা পড়ে গেছে।
রাত অবশ্য প্রায় সাড়ে নটা। শনিবার বলে একটু দেরিতে রাত সাড়ে দশটায় খাবার ডাক আসবে। এই একটা ঘণ্টা কাটানোই দায়।
তবু বনোয়ারি ডাইংক্লিনিং থেকে এ খেপের ধোয়া কাপড়গুলো এনে ফেলায় একটু উত্তেজনার খোরাক জুটেছে।
ধোয়া জামাকাপড়গুলো মিলিয়ে নিতে নিতে গৌর হঠাৎ বনোয়ারিকে বকুনি দিয়েছে, এ কী এনেছিস! একটু দেখে আনতে পারিসনি? পয়সা দিয়ে ডাইংক্লিনিং-এ পাঠিয়েছি কাদা মাখাবার জন্য?
গৌরের বকুনিটা একটু অবশ্য মাত্রাছাড়া একটা পাজামার পায়ের দিকে সামান্য একটু যেন দাগ। সেটা সত্যিই কাদার কি না তাও গবেষণাসাপেক্ষ।
কিন্তু আসরের ঠাণ্ডা হাওয়াটা একটু চমকে তোলবার জন্য যে কোনও ছুতেই তখন সই।
আমরা সোৎসাহে গৌরের আর্তনাদে পোঁ ধরেছি।
আরে, পাজামাটার তো একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে!
অন্য জামাকাপড়গুলোও খুলে দেখা দরকার। কাদা কি আর শুধু একটায় লাগিয়েছে।
বেছে বেছে ঠিক এই সময়টিতে ভাগ্য তার রসিকতাটি করেছে।
হঠাৎ ঘরদোর সব অন্ধকার। আমাদের মেন ফিউজ হয়ে গেছে, না পাড়ার কারেন্টই ফেল করেছে বোঝবার জন্য দু-চার সেকেন্ড অপেক্ষা করেছি।
না, আমাদের বাহাত্তর নম্বর শুধু নয়, পাড়াকে পাড়াই অন্ধকার।
এ রকম আকস্মিক বিপদের জন্যে শিশির তার ঘরে মোমবাতি রাখে। তাই সেগুলি আনতে যাচ্ছিল। কিন্তু যাওয়া হয়নি।
গৌর হঠাৎ অন্ধকারেই তাকে ধরে ফেলে চাপা গলায় বলেছে, চুপ! নড়িস না! শুনতে পাচ্ছিস?
গুনতে তখন সবাই পেয়েছি। আলো নিভে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড যেতে যেতে টঙের ঘরের দরজাটা বেশ একটু জোরে খোলার শব্দ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ঘনাদা ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের খোলা ছাদে এসে দাঁড়িয়েছেন।
গৌর চাপা গলায় বনোয়ারিকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে নিঃশব্দে নীচে নেমে যেতে বলেছে। শহরের বিদ্যুৎ শক্তির যদি কোনও দেবতা থাকেন আমরা তাঁর কাছে আকুল নীরব প্রার্থনা জানিয়েছি।
দেবতা থাকুন বা না থাকুন, প্রার্থনা আমাদের পূর্ণ হয়েছে। পাঁচ-দশ সেকেন্ড করে পুরো দুটি মিনিট পার হয়ে গেছে। সমস্ত পাড়া তখনও অন্ধকার।
ঘনাদার গলা খাঁকারি শোনা গেছে ছাদের আলসের ধারে। তারপর গলাটা খুব বেশি না তুলে যেন সহজ স্বাভাবিক ডাক—বনোয়ারি!
কোনও সাড়া নেই কোথাও। থাকবে কী করে? বনোয়ারিকে সেইরকম শিখিয়ে পড়িয়েই পাঠানো হয়েছে রামভুজকে সুদ্ধ সাবধান করে দেবার হুকুম দিয়ে।
