কিন্তু এমন সুপরামর্শটা কেউ নিলে?
নিলে যে নিজেদের খাটো হতে হয়! তাই, কী সব আহাম্মকের মতো ওজর!
সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব! চোরা টিটকিরিটা শিশিরের, বাঃ, চমৎকার ব্যবস্থা। যাবার আগে বিতস-কে শুধু একটু ফোন করে দিলেই হবে।
শিশিরের গলার আওয়াজের বাঁকা সুরটা ঠিকই ধরেছি। সাড়ে আটানব্বই তখন নিরানব্বই ছাড়িয়েছে। তবু বিতস শুনে একটু ভড়কে যে গেছি তা অস্বীকার করব না।
ভুরু কুঁচকে হলেও প্রশ্নটা তাই যেন আপনা থেকেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, বিতস? তাকে ফোন কেন? সে আবার কে?
সে কে-ও নয়, কী -ও না, শিশিরের সে কী চিবিয়ে চিবিয়ে ব্যাখ্যা, সে হল বি-ত-স অর্থাৎ সংক্ষেপে বিশ্ব-তস্কর-সংঘ। সবাই মিলে বাড়ি ছেড়ে গেলে তাদের ফোন না করলে চলে!
কী রকম লাগে উজবুক-মার্কা এ রসিকতা? বিশেষ অমন একটা পয়লা নম্বরের মাথার কাজ দেখাবার পর? নিরেনব্বই একশোতে ওঠে কি না?
যা বলতে চেয়েছিলাম তা আর বলার ফুরসত মেলেনি।
শিশিরের মুখ থেকে কথাটা যেন লুফে নিয়ে শিবু চোখমুখে ভয় ফুটিয়ে বলেছে, ফোন না করলে রক্ষে থাকবে না! পরের দিন-ই কাগজে কাগজে চোখরাঙানো চিঠি বেরিয়ে যাবে না? পেশাগত মৌল অধিকার ক্ষুণ্ণ করার দায় কেন চাপানো হবে
তার কারণ দর্শাইবার নোটিশ যে আসবে না, তারই বা ঠিক কী? বি-ত-স-এর হালের ইস্তাহারের পাঁচ দফা দাবি দেখেছ তো!
তা আর দেখিনি! শিবুর খেইটা চটপট ধরে ফেলেছে গৌর, দাবিগুলো তো আমার মুখস্থ।
আমি তখন একশো দুই! তবু কত বাড় এরা বাড়তে পারে দেখবার জন্য ফাটো-ফাটো বোমা হয়েও গৌরের ফিরিস্তি শুনেছি।
পাঁচটা দাবি হল, গৌর তখনও বলে চলেছে, চুরির সাজা চলবে না। তালাচাবি বাতিল করো। গেরস্তর ঘুম বাড়াও। খালি বাড়ির খবর দাও। আর চোরেদের ভোট চাই।
না, আর একটা দাবিও আছে, একশো তিন হয়ে আমি ফেটেছি, আকাট আহাম্মকদের সঙ্গ ছাড়ো!
সবাই মিলে ধরে না থামালে আসর ছেড়ে আমি উঠেই আসছিলাম।
আহা, চটেমটে চলেই যাচ্ছিস যে! সবাই মিলে তারপর আমায় তোয়াজ করবার চেষ্টা করেছে, বুদ্ধিটা তুই ভালই বাতলেছিস, তবে কিনা—
উজবুক-মার্কা রসিকতার চেষ্টা আর হয়নি, কিন্তু একটার পর একটা তবে-কিনার ছররা-তেই আমার অমন ফন্দিটা তারপর ছেতরে গেছে।
বাইরের দরজা ভেজানো দেখলে ঘনাদা আর তা ঠেলে ঢুকবেন? আমার প্রস্তাবটা প্রথম ফুটো করেছে গৌর!
যদি বা ঢোকেন, অন্ধকার দেখে আর পা বাড়াবেন? শিবু ছিদ্রটা আরও বড় করে দিয়েছে।
সবচেয়ে মোক্ষম ফ্যাকড়া তুলে ফন্দিটা একেবারে বাতিল করে দিয়েছে শিশির।
রামভুজ আর বনোয়ারিকে যে ছুটি দেবে, তারপর রাত্রের ব্যবস্থা কী হবে? হরিমটর?
আমার পরামর্শটার পোকা বেছে নিজেরা আরও সরেস কিছু বাতলাতে পেরেছে কি?
তার বেলায় ঢু-ড়ু! সারা বিকেলটা মাথা ঠোকাঠুকি করেও ঘনাদাকে সত্যিকার জব্দ করার একটা মনের মতো প্যাঁচ কেউ বার করতে পারেনি।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়েছে। সন্ধে পার হয়ে ঘড়ির কাঁটা আটের ঘর ছুঁতে না ছুঁতে মার্কামারা জুতোর আওয়াজ পাওয়া গেছে সিঁড়িতে। ঘনাদা প্রায় মিলিটারি কদমে উঠে আসছেন। নীচের সিঁড়ি থেকে বারান্দা, বারান্দা থেকে টঙের ঘরের সিঁড়ি।
ঘনাদার পায়ের আওয়াজ কি একটু ঢিমে হবে না আমাদের আড্ডাঘরের দরজার সামনে এসে? মিলিটারি কদমটা একটু মন্থর?
বৃথা আশা। বাহাত্তর নম্বরে আমাদের দোতলার আড্ডাঘর বলে কিছু আছে ঘনাদা যেন সে খবরই রাখেন না। একেবারে সমান তালে পা ফেলে তিনি তাঁর টঙের ঘরে উঠে গেছেন।
আমরা মুখ হাঁড়ি করে পরস্পরের দিকে তাকিয়েছি।
না, এ তাচ্ছিল্যের একটা জুতসই জবাব না দিলেই নয়। ঘনাদাকে একটিবার অন্তত জব্দ না করলে আর মান থাকে না।
ঘনাদাকে জব্দ করার জন্য এত ছটফটানি কেন?
কেন হবে না?
বিনা দোষে ঘনাদা এবারে যা জ্বালা দিয়েছেন আর দিচ্ছেন, তাতে তাঁর দাওয়াই তাঁকেই একটু খাওয়াবার বাসনা কিছু অন্যায়?
গত বুধবারেই রাজনৈতিক সম্পর্কে চিড় ধরেছে বলা যায়। বৃহস্পতিবার দূতাবাসে তালাচাবি বলে ব্যাপারটা বোঝানো যেতে পারে। তারপর শনিবার সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ছিন্ন। সীমান্তের সব যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ।
কিন্তু রাজনৈতিক হাওয়া যতই গরম হোক, ঘনাদা রবিবারের দিন অমন একটা বিলো দ্য বেল্ট মানে অধর্মের ঘা দেবেন ভাবতেও পারিনি।
সকালবেলায় সেজেগুঁজে সবাই তৈরি হয়ে আড্ডাঘরে জমায়েত হয়েছি এমন সময় আমাদের বারান্দা থেকেই ঘনাদার গলা শুনতে পেলাম। তাঁর মার্কামারা পাড়া-জাগানো সুমধুর স্বরে নীচে রামভূজকে ডেকে বলছেন, ভাত নয়, আজ রুটি করবে রামভুজ। ঠিক বারোটায় খাব।
সবাই একেবারে থ। অন্য কোথাও নয়, ঠিক আমাদের সামনের বারান্দায় এসে নীচের রান্নাঘরে নয়, যেন ওপাড়ার কোথাও কাউকে হেঁকে হুকুম শোনানোটাতেই প্রমাদ গনবার কথা, তার ওপর হুকুমের তাৎপর্য বুঝে একেবারে চক্ষু চড়কগাছ।
মান অভিমান ভুলে সবাইকে তৎক্ষণাৎ ছুটে যেতে হয়েছে বাইরে।
বারোটায় খাবেন কি ঘনাদা? তখন কি আমরা এখানে? স্টিমারে প্রায় ডায়মন্ডহারবারে পৌছে যাব না ততক্ষণে?
কাকে কী বলছি?
হয় আমরা সব স্বচ্ছ কাচ হয়ে গেছি, নয় ঘনাদা বাংলা ভুলে গেছেন।
তিনি মুখ ঘুরিয়ে চেয়েছেন, কিন্তু সোজা আমাদের ভেদ করে যেন তাঁর দৃষ্টি অন্যদিকে চলে গেছে। তাতেও আবছাভাবে আমাদের যদি দেখতে পেয়ে থাকেন, আমাদের ভাষা এক বর্ণও যেন বোঝেননি।
