এই সিলাকান্থ-এর একটা-দুটো ছানাপোনা যদি কোনও রকমে সংগ্রহ করে এনে এই লকনেসের জলে ছাড়তে পারেন তা হলে কী ভোজবাজি হয়ে যাবে তা বুঝতে পারছেন কি?
লকনেসের গহনে গভীরে আদি প্লিসিওসোরাস গোষ্ঠীর যে কটা বংশধর যেখানেই এখনও টিকে থাকুক, দু-দশ হাজার নয়, এমন দশ-বিশ কোটি বছরের সঙ্গী থাকার স্মৃতির টানে, আর কোনও কিছু নয়, শুধু একটু গা-ঘষাঘষির লোভেই তারা পিলপিল করে ছুটে আসবে। তখন একটু বুদ্ধি করে জাল ফেলার ব্যবস্থা করে তাদের একটা-আধটাকে ধরা তো কোনও সমস্যাই নয়।
শুনুন, কথায় কথায় অনেক রাত হয়েছে, তবু আপনার বিশ্রামের অবসর আর নেই। হোটেল থেকে লুকিয়ে বার হয়ে আপনি সোজা গলিঘুজির পথে ইনভারনেস স্টেশন ইয়ার্ডে চলে যান। কোনও যাত্রী-ট্রেন সেখান থেকে এখন আর পাবেন না। কিন্তু আমি খোঁজ নিয়ে জেনে এসেছি যে, একটি খালি মালগাড়ি সেখান থেকে মাঝ রাত্রে ছেড়ে এডিনবরা পর্যন্ত যাবে। সেই মালগাড়ির একটা খালি ভ্যানে উঠে লুকিয়ে এডিনবরা পর্যন্ত চলে যান, তারপর সেখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজে প্লেনে সোজা মাদাগাস্কার। ইচ্ছে মতো খরচ করবার যথেষ্ট টাকা জোগাড়ের ক্ষমতা আর উপায় যে আপনার আছে তা আমি ভাল করেই জানি। সুতরাং মাদাগাস্কারে গিয়ে জীবন্ত সিলাকান্থ ধরে আনতে যে আপনি পারবেন, সে বিশ্বাস আমার আছে। আপনার দুশমনেরা যাতে শেষ মুহূর্তে কোনও শয়তানি না করতে পারে, সেই পাহারায় আমি এখানে রইলাম। আপনি এক্ষুনি রওনা হয়ে যান।
ঘনাদা একটু থেমে আমাদের সকলের দিকে চেয়ে প্রসন্ন মুখেই বললেন, ইনভারনেস থেকে নুটসনের বাজিমাতের টেলিগ্রামের জন্যই অপেক্ষা করে আছি। খুব বেশি দেরি বোধহয় আর হবে না।
যাঁর নাম ঘনাদা (গল্পগ্রন্থ)
কাদা
ঘনাদা দরজাটা ঠেললেন, বেশ একটু অবাক হয়েই ঠেললেন। বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের বাইরের দরজা তো হাট করে খোলাই থাকে দিনরাত। সেটা এমন বন্ধ থাকার কথা তো ভাবাই যায় না।
সবে তো সন্ধে পার হয়ে রাতের প্রথম প্রহর। এমন সময় দরজা এভাবে বন্ধ কেন?
বন্ধ নয়, ভেজানো। ঘনাদা জোরে একটু ঠেলা দিতেই পাল্লা দুটো বেশ একটু যেন ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানিয়ে খুলে গেল। বহুকাল তাদের শান্তিভঙ্গ তো কেউ করেনি। মরচে ধরা কবজাগুলোতে তাই ওই আপত্তির গোঙানি।
দরজা খুলে যাওয়ায় ঘনাদা যেটুকু আশ্বস্ত হয়েছিলেন, পুরনো আমলের খিলেন দেওয়া দেউড়ি পার হয়ে ভেতরে ঢুকে তা আর থাকতে পারলেন না।
বুকটা একটু কি হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠল?
তা তো করতেই পারে। ভেতরে যে কোনও সাড়া শব্দ নেই। শুধু কি তাই! নীচের রান্না ভাঁড়ার খাবার ঘরের মহল একেবারে অন্ধকার। কারেন্ট ফেল যদি করে থাকে তাহলে হ্যারিকেন লণ্ঠনটা তত জ্বলবে! রামভুজ সে বিষয়ে দারুণ হুঁশিয়ার। ইলেকট্রিক সাপ্লাই-এর ওপর পুরোপুরি ভরসা সে রাখে না। একটা নয়, দুটো লণ্ঠন তার সন্ধে থেকে তেলভরা পলতে কাটা হয়ে মজুত থাকে।
সে লণ্ঠনের হল কী? রামভুজই বা কোথায়? রান্নাঘরে তো মানুষজন কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না!
ঘনাদা একটু দাঁড়িয়ে পড়ে কী যেন ভাবলেন। এ অবস্থায় কী করা উচিত, ভাবনাটা নিশ্চয় তাই। রান্নাঘরটা একবার দেখে আসতে যাবেন, না সোজা ওপরেই উঠবেন, মেসের সকলের খোঁজে?
দুটোর কোনওটাই না করে ঘনাদা উঠোনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হাঁক পাড়লেন। হাঁকটা ঠিক হুংকার বলে মনে হল না, কেমন একটা করুণ আর্তনাদের সুর তার সঙ্গে যেন মেশানো।
হাঁকটা কয়েকজনের নাম ধরে, শিশির! গৌর! সুধীর!
স্তব্ধ অন্ধকার বাড়িটায় সে হাঁক একটা যেন বিশ্রী প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেল।
কোনও জবাব এল না কোথাও থেকে!
বাড়িতে কেউ নেই নাকি, কিন্তু তা কি সম্ভব? বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে নীচে-ওপরে সবাই হঠাৎ এক সঙ্গে উধাও হয়ে গেছে? কোথায়? কেন?
শিশির! গৌর! ঘনাদার এবারের ডাক বেশ একটু কাঁপতে কাঁপতেই উঠল। স্বরটাও কেমন দুর্বল।
ঘনাদা তারপর আর উত্তরের অপেক্ষা করলেন না।
যেভাবে ভেতরের উঠোন থেকে ছুটে বাইরের দরজায় প্রায় হুমড়ি খেয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন, তাকে পড়ি-কি-মরি বললে অতিশয়োক্তি বোধহয় হয় না।
এ কী! ঘনাদা, আপনি?
শিশির ডানদিক থেকে বেরিয়ে এসে একেবারে যেন তাজ্জব!
ছুটে যেন পালিয়ে এলেন?
বাঁদিক থেকে এসে শিবুর সবিস্ময় জিজ্ঞাসা।
হ্যাঁ, এখনও তো হাঁফাচ্ছেন!
সামনে থেকে এসে আমার অস্বস্তিকর মন্তব্য।
ভয় পেয়েছেন মনে হচ্ছে?
একেবারে পেছনের অন্ধকার দরজা দিয়েই বেরিয়ে এসে গৌরের চমকে দেওয়া সরব সন্দিগ্ধ অনুমান।
কী করলেন এবার ঘনাদা? কী আর করবেন? একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়েও পিছলে বেরিয়ে যাবার কোনও ফাঁক তো আর রাখা হয়নি।
যাকে সত্যকার রাম-জব্দ বলে, তাই হয়ে একেবারে অধোবদন আর তোতলা।
ঘনাদার যে অবস্থা, দেখলে সত্যি মায়া হয়।
রোজ কত কী ঘটে যাহা-তাহা,
এমন কেন সত্যি হয় না, আহা!
সত্যি তো আর নয়, কল্পনা—ঘনাদাকে জব্দ করার কল্পনা। কিন্তু ওই কল্পনাই থেকে গেছে। বাস্তব হতে ওরা দিলে কই?
ফন্দিটা কিছু কি খারাপ এঁটেছিলাম? একেবারে যাকে বলে অব্যর্থ প্যাঁচ। ভেস্তে যাবার একটা ফুটোও রাখিনি।
ঘনাদাকে তাঁর সন্ধেবেলার সরোবরসভা সেরে ফিরতেই হবে। তাঁর ফেরাও একেবারে নিয়মমাফিক, প্রায় ঘড়ি-ধরা, সাড়ে সাতটা বড় জোর আটটা। সাবধানের মার নেই বলে আমাদের সাড়ে ছটা থেকে আলো-টালো নিভিয়ে রামভুজ আর বনোয়ারিকে এ বেলার মতো ছুটি দিয়ে বাইরের দরজা ভেজিয়ে সবাই মিলে যে যার ঠিক করা জায়গায় কিছুক্ষণ ঘাঁটি মেরে থাকা! আমরা সবাই বাহাত্তর নম্বরের বাইরে, গৌর একা নিঃসাড়ে ভেতরে। খুব বেশিক্ষণও অপেক্ষা করতে হত না! বাদলার দিন। পঞ্চাশ-পেরুনোদের সরোবর সভা বেশিক্ষণ জমত না। ঘনাদা গুটি গুটি ঘরে ফিরতেন আর তারপর যা ছকেছিলাম তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যেত।
