সেই রহস্য ভেদ করতে পারব এখান থেকে পালিয়ে? এতক্ষণে বাকশক্তি ফিরে পেয়ে রীতিমত ক্ষিপ্ত হয়ে টসন বললেন, আপনি কি নিজে উন্মাদ, না আমার সঙ্গে জড়ভরতের বুদ্ধি নিয়ে রসিকতা করছেন? কনেসের অজানা জলচর দানবের রহস্য এখানে এই ইনভারনেসে, আর আপনি বলছেন আমি তা ভেদ করার উত্তর পাব এখান থেকে পালিয়ে? পালিয়ে যাব কোথায়? শুধু পালালেই কার্যসিদ্ধি হবে?
না, জোর দিয়ে বললাম, যেখানে তোক নয়, পালাতে হবে বিশেষ একটি জায়গায়।
সেটা কোথায়? কোনওরকমে এক উন্মাদের সঙ্গে কথা বলার ধৈর্য না হারিয়ে জিজ্ঞেস করলেন নুটসন।
সেটা ধরুন মাদাগাস্কারে।
আমার কথায় এবার হোহো করে হেসে উঠে নুটসন বললেন, ঠিক, ঠিক! ঠিক নিশানাই দিয়েছেন এবার। অবশ্য এর বদলে কামস্কাটকা কি গুয়াতেমালাও বলতে পারতেন?
না, গম্ভীর হয়েই এবার বললাম, গুয়াতেমালা কি কামস্কাটকা নয়, যেতে হবে ওই মাদাগাস্কার ছাড়া আর কোথাও নয়।
বটে! ঠিক উন্মাদকে প্রশ্রয় দেবার মতো গলায় নুটসন বললেন, তা শুধু ওখানেই কেন?
শুধু ওখানেই এই জন্যে যে, আমি শান্ত গলায় ধীরে-ধীরে বললাম, যাকে নিয়ে কনেসের রহস্য, সেই জলচর দানবটি পৃথিবীর আদ্যিকালের প্লিসিওসোরাসের বংশধর বলে বহু বৈজ্ঞানিক মনে করছেন। ফসিল মানে। জীবাশ্মের প্রমাণে প্লিসিওসোরাসের বংশ যদিও বহু কোটি বছর আগে লুপ্ত হয়ে। গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়, তবু পৃথিবীর জীবজগতের বিবর্তনের কোটি কোটি বছরের ইতিহাসে লক্ষ লক্ষ জীবগোষ্ঠীর ধারার মধ্যে এরকম এক-আধটা ধারা প্রায় অমর হওয়ার দৃষ্টান্ত একেবারে বিরল নয়। লকনেসের বেলায় তাই যদি হয়ে থাকে তা হলে তা চাক্ষুষভাবে প্রমাণ করবার উপায় ওই মাদাগাস্কারেই পাওয়া যেতে পারে। কেন, কেমন করে তা পাওয়া সম্ভব, তা বোঝাবার জন্য আমার সংকেত-লিপির সংস্কৃত শ্লোকটি আর একবার মনে করিয়ে দিচ্ছি—শ্লোকটির আরম্ভেই পাচ্ছি:
প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসিবেদং
বিহিতবহিত্ৰচরিত্ৰখেদ…
কেশব ধৃতমীনশরীর। জয় জগদীশ হরে।
একটা আশ্চর্য কথা একটু মন দিয়ে এবার শুনুন, নুটসন। পৃথিবীর কোনও দেশের প্রাচীন শাস্ত্রে পুরাণে যা নেই, আমাদের এই ভারতবর্ষের যোগী-ঋষি-সাধকেরা সভ্যতার উন্মেষের আগে কোন দিব্যদৃষ্টির শক্তিতেই অবতার রূপে কল্পনা করে পর পর যে-সব জীবগোষ্ঠীর উদ্ভব ও প্রাধান্যের কথা তাঁরা বলে গেছেন, আধুনিক বিজ্ঞানে সেইসব অনুমানই সঠিক বলে স্বীকৃত হয়েছে। ভারতের প্রাচীন ঋষিদের। দিব্যদৃষ্টিতে প্রথম অবতার বলে যে জীবগোষ্ঠীর নাম করা হয়েছিল তা হল মৎস্য। মৎস্যের পর এসেছে কুর্মের নাম, তারপর অবতার রূপে কল্পনা করা হয়েছে বরাহের। বরাহের পর নৃসিংহ ও বামনরূপী অবতারকে যেভাবে কল্পনা করা হয়েছে। তাতেই আধুনিক বিজ্ঞানের সুদীর্ঘ সন্ধানী আবিষ্কারে তাঁরা কেমন করে পৌঁছেছিলেন, ভেবে অবাক হতে হয়।
অন্য সকলের কথা ছেড়ে দিয়ে প্রথম মৎস্যাৰতারের কথাই ধরলে কোটি-কোটি বছর আগেকার প্লিসিওসোরাসই তার আদিরূপ ভাবলে বোধহয় খুব ভুল হয় না।
কালে-কালে নিজের সঙ্গী-সাথী আর ধারা একে একে নির্বংশ হয়ে গেলেও লকনেসের বুকে একটি শাখা যদি কোনওরকমে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পেয়ে থাকে, তা হলে কোনও গুপ্ত খাত দিয়ে ইনভারনেসের পাহাড়তলির তলায় কোনও বিরাট পাতালসাগরে পালিয়ে থাকবার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের একটি-দুটিকে অন্তত নির্ভুল চার আর টোপের প্রলোভনে বার করে এনে ধরা যেতে পারে। সে নির্ভুল টার আর টোপ বলতে কী বুঝব? লকনেসের রহস্যময় জলদানবদের বহু
কোটি বছর আগে বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়া যে জীবগোষ্ঠীর একটি অতি ক্ষীণ, আশ্চর্যভাবে টিকে থাকা প্রতিনিধি বলে মনে করা হয়, সেই প্লিসিওসোরাসের আহার ও বিচরণক্ষেত্র বলতে যা বোঝায় তাই বুঝব নিশ্চয়ই।
বহু কোটি বছর আগে যার মূলধারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সে প্রাণীর মনের মতো চেনা খাবার আর পরিবেশ কি এখন আর পাওয়া সম্ভব? পরিবেশ না হোক, আহারটা পাওয়া সত্যিই যে অসম্ভব নয়, এইটিই এ যুগের পরমাশ্চর্য এক আবিষ্কার।
ব্যাপারটা ঠিক মতো বুঝিয়ে দিতে হলে বলতে হয়, প্লিসিওসোরাস আমাদের ভারতীয় শাস্ত্র-পুরাণের আদি মৎস্যাবতার। অর্থাৎ সৃষ্টিতে জীব বিবর্তনের ইতিহাসে এই মৎস্যাবরই আদি মনুর রক্ষক আর বাহন।
আদি মনুর বাহন বা রক্ষক সেই মৎস্যাবতারকে প্রলুব্ধ করে ধরবার জন্য একমাত্র মান্ধাতার টোপই তা হলে প্রয়োজন।
কোথায় মিলবে সে মান্ধাতার টোপ? তা পাওয়া কি সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব। বহু কোটি বছর আগে বিলুপ্তপ্রায় প্লিসিওসোরাসের একটি সমবয়সী জীবগোষ্ঠীর ধারা এখনও ক্ষীণভাবে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে।
চলেছে আর কোথাও নয়, আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের মাদাগাস্কার দ্বীপের সমুদ্রে। কোটি কোটি বছর ধরে একই চেহারা-চরিত্র আর দেহ-বৈশিষ্ট্য নিয়ে তারা যে টিকে আছে মাদাগাস্কারের সমুদ্র উপকূলে গত দুই-তিন দশকে মৎস্য-শিকারিদের ছিপে আর জালে ধরা পড়া নিদর্শনে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে।
শুনুন, মি. নুটসন, এখন আর কোথাও নয়, এখান থেকে পালিয়ে সেই মাদাগাস্কারে গিয়েই একটি অন্তত জীবন্ত মান্ধাতার টোপ আপনাকে সংগ্রহ করে আনতে হবে। আদি মনুর বাহন ও রক্ষক প্রথম মৎস্যাবতারের নাম যেমন প্লিসিওসোরাস, তাকে প্রলুব্ধ করে ধরবার এই মান্ধাতার টোপেরও বৈজ্ঞানিক নাম তেমনি হল সিলাকান্থ।
