নিজেরা জ্যোতিষ গণনার বিষয়ে কিছু বলতে না পেরে আপনার কর্তারা আবার কারা তা ওরা জানতে চাইবে না নিশ্চয়। আপাতত আপনার নাম-ঠিকানাটা জানতে পারাই যথেষ্ট লাভ মনে করে আবোলতাবোল কিছু বলে ওরা বিদায় নেবে নিশ্চয়ই।
কিন্তু তারপর? নুটসন হতাশভাবে জিজ্ঞেস করলেন, তারপর ওরা কি লকনেসের জলে হাত-পা ধুয়ে ব্যাপারটায় দাঁড়ি টেনে চলে যাবে নিজেদের ধান্দায়?
না, তা যাবে না। গম্ভীরভাবেই বললাম, তারপরেই বড় খেলা আরম্ভ বলতে পারেন। কিন্তু আপাতত এই প্রথম ফাঁড়াটা কাটিয়ে উঠুন তো! নিন, ফোন করুন নীচের লবিতে। আমি ততক্ষণ এদিক-ওদিক একটু ঘুরে দেখি। কামরার ওধারে ওই বিরাট ওয়ার্ডরোবের ভেতরেই গিয়ে লুকোচ্ছি।
ওয়ার্ডরোবের ভেতরে!নুটসন বেশ চিন্তিতভাবে বললেন, কিন্তু ওখানে যদি–
না, নুটসনকে আশ্বাস দিয়ে একটু হেসে বললাম, ওখানে ওরা খোঁজাখুঁজি করবে। আর তা ছাড়া, ওয়ার্ডরোবের ভেতরে থাকা আমার একরকম অভ্যাসই হয়ে যাচ্ছে।
নুটসনের স্যুইটের এদিকে-ওদিকে একটু ঘুরে যা দেখবার দেখে নিয়ে বিরাট ওয়ার্ডরোবটায় গিয়ে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করার কিছু পরেই নুটসনের দুই দর্শনপ্রার্থীকে জ্যানিটর এই স্যুইটে পৌঁছে দিল।
প্রথম দিকে যেমনভাবে বলে দিয়েছিলাম সেই মতোই আলাপ করে নুটসন তার দুই দুশমনকে বেশ একটু বেকায়দাতেই ফেলেছিল, কিন্তু তারপরই প্রসঙ্গটা বদলে তারা যে বেয়াড়া প্রশ্ন করে বসল, অপ্রস্তুত নুটসনের তাতে নিশ্চয় হাত-পা ঠাণ্ডা হবার উপক্রম হলেও আমি সেইরকম কিছুর জন্য তৈরি হয়েই ছিলাম।
নুটসনের মুখে আমার শেখানো প্রশ্ন ক-টার জবাব দিতে বেশ খানিক বিব্রত হয়ে হঠাৎ তারা ফাঁদের আসল ফাঁসটাই টেনে বসল।
কিছু যদি মনে করেন, শুঁটকো ডুগান তার প্যাঁচালো বুদ্ধিতে কথাগুলো শানিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলে, আপনার পাসপোর্টটা যদি একবার একটু দেখান।
পাসপোর্ট? নুটসনের হতভম্ব গলায় বিস্ময়ের সঙ্গে আতঙ্কটাও আর গোপন রইল না। পাসপোর্ট কেন?
না, অন্য কিছু নয়, শুঁটকো ডুগান আশ্বাস দিয়ে বললে, ওই জ্যোতিষের গণনার জন্যে আপনার পাসপোর্টের ক-টা নম্বর নাকি দরকার। তা পাসপোর্টটা দেখাতে আপনার আপত্তি কিছু–
ডুগানের কথা আর শেষ হল না। নুটসনের মুখে যে আতঙ্ক খানিক আগে থেকে ফুটে উঠেছে, সেই আতঙ্কেরই গাঢ় ছায়া তখন তার আর কার্ভালোরও মুখের ওপর।
দু-তিন সেকেন্ড কান খাড়া করে স্থির হয়ে বসে তারা লাফ দিয়ে উঠে সুইটের বাইরে এক জানলার ধার থেকে নীচে নেমে যাওয়া ফায়ার এসকেপের দিকে ছুটে গেল।
হ্যাঁ, সমস্ত হোটেলে তখন প্রচণ্ড শব্দে ফায়ার এলার্ম মানে আগুন লাগলে তা থেকে পালাবার জন্য হুঁশিয়ারির সাইরেন বাজছে।
গোলমেলে কিছু অবস্থা দেখা দিলে তা থেকে রক্ষা পাওয়ার এই ফন্দি এঁটে আমি আগেই বৈদ্যুতিক তার-টার নেড়েচেড়ে তবেই ওয়ার্ডরোবে ঢুকেছিলাম।
ফায়ার অ্যালার্ম বাজবার পর সমস্ত হোটেলে রীতিমত হুলুস্থুলু যে পড়ে গেছল তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। প্রথম হইচই থামবার পর খোঁজাখুঁজি করে অবশ্য এরকম সাইরেন বাজবার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বৈদ্যুতিক যোগাযোগের ত্রুটিতে এরকম ভুল হুঁশিয়ারি কখনও কখনও হয় বলেই এটাকে সন্দেহজনক কিছু বলে কেউ মনে করেনি।
হোটেলের অন্য বোর্ডারদের সঙ্গে নীচের ফাঁকা জায়গায় নেমে তাদের ভিড়ের ভেতর থেকে লুকিয়ে নুটসন, ডুগান আর কার্ভালোর ওপর আমি নজর রাখতে যতটা সম্ভব কাছাকাছিই ছিলাম।
সেদিনকার মতো নুটসনের কাছে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় শেষ কথা তারা যা বলে গেল, সেইটি শোনার অপেক্ষাতেই অবশ্য আমি ছিলাম।
হোটেলের এই গোলমালে সেদিনকার মত চলে যাওয়া উচিত মনে করলেও তার পরের দিনই নুটসনের পাসপোর্টটা দেখতে আসবে বলে জানিয়ে গেল।
আগুন লাগার মিথ্যে হুঁশিয়ারি সাইরেন নিয়ে হোটেলের শোরগোল ক্রমশ থেমে যাবার পর নুটসন তার স্যুইটে ফিরে গেলে সেখানে তার সঙ্গে দেখা করলাম।
তার অবস্থা তখন প্রায় আধা-পাগলের মতো। একটা মাঝারি সাইজের স্যুটকেসে নেহাত দরকারি কিছু জিনিস খুঁজেপেতে নেবার জন্য সমস্ত কামরায় এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে করতে আমায় দেখতে পেয়ে খোঁজাখুঁজি থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রায় কাঁদোকাঁদো গলায় বললেন, কী হল, দেখলেন তো? এখন এক্ষুনি এখান থেকে না। পালালে নয়।
তার কথায় সায় দিয়ে বললাম, তা তো নয়ই। আর এইটেই তো চেয়েছিলাম।
চমকে আমার দিকে চেয়ে অবিশ্বাসের সুরে নুটসন বললেন, চেয়েছিলেন মানে? আজ রাত্রে এই অবস্থায় তাড়া-খাওয়া চোরের মতো আমি যাতে পালাই, তাই আপনি চেয়েছিলেন? ওই ভুল সাইরেন বাজায় তা হলে আপনি খুশি?
নিজেই যার ব্যবস্থা করেছি, সরল ভাবেই বললাম, তাতে খুশি হব না?
তার মানে? নিজের কান দুটোকে ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না এমন বিমূঢ় গলায় নুটসন বললেন, ওই মিথ্যে সাইরেন বাজানোটা আপনারই কারসাজি?
হ্যাঁ, বাহাদুরিটা সানন্দে স্বীকার করে বললাম, ওটা আমার এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল বলতে পারেন। ঠিক সময়মত ওটা বাজিয়ে একদিকে আপনার পাসপোর্ট দেখানোটা তখনকার মতো যেমন থামিয়ে রেখেছি তেমনই আজ রাত্রেই যাতে ইনভারনেস ছেড়ে পালাতে হয় সেব্যবস্থাও করেছি ওই এক চালে।
আপনি—আপনি—নুটসন রাগে প্রায় বাকশক্তি হারিয়ে সেটা যতক্ষণে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করছেন, সেই অবসরে নিজের কথাটা তাঁকে বুঝিয়ে বললাম, একবার পাসপোর্ট দেখবার বুদ্ধি যখন ওদের মাথায় এসেছে তখন আজ না দেখবার সুযোগ পেলেও এই খোঁজে ওরা লেগে থাকবেই। নিজেরা না পারলে শেষ পর্যন্ত এখানকার পুলিসের কাছেই ওরা একটা হারানো পাসপোর্ট খোঁজার জন্য সাহায্য চাইবে, আর সে পাসপোর্ট অন্য কারও নয়, আপনার আসল যা নাম সেই গুস্তাভ নুটসন নামে— সুতরাং বুঝতেই পারছেন, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আর আমার মতে— এক্ষুনি, আপনার না পালালে নয়। শুধু তাই নয়, পালিয়ে যেমন দুশমনদের হাত থেকে ছাড়া পাবেন, তেমনই যে জন্য জীবনপাত করছেন, সকনেসের সেই রহস্যও ভেদ করতে পারবেন।
