শুনুন, মি. গুস্তাভ নুটসন— বলে বাধা দিয়ে যা বলতে যাচ্ছিলাম তা বলা আর হল না।
কী? কী বললেন? কী নাম? গুস্তাভ নুটসন? এতক্ষণ মঁসিয়ে জুহো বলে যাঁকে ডাকছিলাম, তিনি প্রায় চিৎকার করে বললেন, এ নাম আপনি কোথায় পেলেন? এ কার নাম?
নাম আপনারই, শান্তভাবেই জবাব দিলাম, আর এই-ই যে আপনার আসল নাম তা আপনি ভাল করেই জানেন। আপনার দুশমনদের এড়িয়ে পালিয়ে থাকবার জন্য আপনি নাম আর চেহারা দুইই বদলেছেন, তবে নামটা বদলাবার একটা অন্য বড় কারণও আছে।
কারণ! অন্য কারণ–বলে দুবার ঢোঁক গিলে আমার প্রতিপক্ষ থেমে যাবার পর বেশ সহানুভূতির স্বরেই এবার বললাম, হ্যাঁ, মি. নুটসন, আপনার দুশমনদেরই ফরমাশে আপনাকে খুঁজে বার করতে গিয়ে আপনার সবকিছুই আমি জানতে পেরেছি। আপনি যা এইমাত্র আমায় শুনিয়েছেন তার কিছুই মিথ্যে নয়। আপনি সত্যিই যে আপনার বিশেষ বুদ্ধির জোরে দেশ-বিদেশের কারবারি জগৎ তোলপাড় করে তুলে কড়িকাঁড়ি টাকা উপায়ের ব্যবস্থা করে দেন, আর শেষে এ কাজে অরুচি শুধু নয়, সত্যিকার ঘেন্না ধরায় এ জগৎ থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছেন, সে সব কথাই সত্যি। কিন্তু যে কথাটা আপনি এখনও বলেননি, তা হল এই যে, অনেক অনুরোধ উপরোধ আর তারপর ভয়টয় দেখিয়েও আপনাকে নিজেদের কথায় রাজি করাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ওরা একটা মিথ্যে জুয়াচুরির সাজানো মামলায় আপনাকে জড়িয়ে দেয়। সেই সাজানো মামলা মিথ্যে প্রমাণ করবার জন্য লড়বার ধৈর্যটুকুও না থাকায় আপনি তার দায় এড়াতে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, দুঃখে রাগে তিক্ত স্বরে বললেন গুস্তাভ নুটসন, সেই জন্যই দেশে-দেশান্তরে এমন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছি, আর সেই জন্যই লকনেসের রহস্যভেদের মতো এমন একটা কিছু করতে চাইছি যার জোবে সত্যিকার সজ্জন সভ্যসমাজে আমার কথা বুঝিয়ে বলতে পারার অধিকার পাব।
পাবেন, পাবেন, নুটসনকে আশ্বাস দিয়ে আমি বললাম, কিন্তু তার জন্যই আপনাকে এখান ছেড়ে আমি যেখানে বলছি সেখানে চলে যেতে হবে
থামুন, থামুন।নুটসন আবার যেন খেপে উঠলেন। বারবার শুধু আমায় এখান থেকে তাড়াবার চেষ্টা! এখান থেকে চলে যেতে হবে বললেই চলে যেতে হবে! কোথায় যেতে হবে? কোথায়? আমায় এখান থেকে তাড়াবার পিছনে আপনার আসল মতলবটা কী, বলুন তো? ক ধান্দায় আপনি আমার পেছনে ঘুরছেন?
বলছি শুনুন।
০৮. ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল
একটু থেমে ঘনাদা বললেন, কিন্তু বলা আর হল না। ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। রিসিভার তুলে দুবার শুধু হ্যাঁ বলে জবাব দিয়ে নুটসন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আর আমার বাঁচার উপায় নেই।
উপায় নেই?নুটসনের কথায় সত্যিই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে, কী?
হঠাৎ ঝড়ে পড়ানো গাছের মতো একেবারে ভেঙে পড়ে ফ্যাকাশে মুখে নুটসন বললেন, ওরা এসে গেছে। নীচে হোটেলের কাউন্টারে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে আমার অনুমতির অপেক্ষায় বসে আছে।
আপনার সঙ্গে দেখা করবার অনুমতি চেয়ে? আমি যেমন অবাক তেমনই নুটসনের ওপর কিছুটা রেগেই বললাম, আপনার সঙ্গে দেখা করবার অনুমতি ওরা চাইবে কী বলে? আপনার আসল নকল কোনও নামই কি ওরা জানে? ওদের সঙ্গে আপনি যখন রহস্য-সংকেতের কাগজ নিয়ে দেখা করতে যান তখন তো তাতে নামটাম নয়, শুধু আপনার দেখা করবার পাস-এর একটা নম্বর দেওয়া ছিল।
হ্যাঁ, নামটাম নয়, শুধু তাই ছিল, হতাশভাবে বললেন নুটসন, তাই ওরা এখানে এসে দারুণ চালাকি করেছে। নামটাম বলেনি। শুধু আমার চেহারার বর্ণনা দিয়ে বলেছে যে, এই চেহারার একজন ভদ্রলোক খুব সম্ভব এই হোটেল থেকেই আজ সকালে তাদের সঙ্গে একটা বিশেষ কারণে দেখা করতে যান। তিনি যদি এই হোটেলেরই বোর্ডার হন তা হলে তাঁর নিজেরই বিশেষ দরকারে এখনই তাঁর দেখা পাওয়া অত্যন্ত দরকার।
যেভাবে কথাগুলো বলা হয়েছে তাতে সন্দেহ করবার এমন কিছু নেই। হোটেলের কর্তারা তাই সরল বিশ্বাসে চেহারার বর্ণনা থেকে তাঁর নামটা বুঝে নিয়ে এইমাত্র ফোনে তাঁর কাছে দুজন দর্শনপ্রার্থীকে পাঠাবার অনুমতি চেয়েছে।
বুঝলাম। গম্ভীর হয়েই আবার বলেছি, আপনি কী বলেছেন তাতে? আমি—আমি— হতাশ গলায় নুটসন বলেছেন, কী আর বলতে পারি আমি? ওদের লবিতে অপেক্ষা করতে বলে এখনই যাচ্ছি বলে জানিয়েছি।
একটু থেমে নিজের রঙ করা লালচে চুলগুলো মুঠো করে যেন ছেঁড়ার চেষ্টা করে নুটসন পাগলের মতো বললেন, এখন—এখন আমার এই হোটেলের জানলা থেকে নীচে ঝাঁপ দিয়ে মরা ছাড়া আর কিছু করবার নেই।
থামুন, রীতিমত কড়া গলায় ধমক দিয়ে এবার বললাম, আপনার কাণ্ড দেখে আমি অবাক হচ্ছি। কারবারি দুনিয়াকে শুধু বুদ্ধির প্যাঁচে যে নাকানিচোবানি খাওয়ায়, আপনি যে সেই হিসেবের ভোজবাজির জাদুকর, একথা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। শুনুন, হাত-পা ছেড়ে চোখে অন্ধকার দেখার মতো কিছু হয়নি। যা বলছি শুধু তাই করুন এখন। আপনি নিজে ওদের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন না। তার বদলে ওদেরই এখানে পাঠিয়ে দিতে বলুন আপনার হোটেলের কর্তাদের। আর
ওদের এখানে পাঠিয়ে দিতে বলব? আঁতকে উঠলেন নুটসন। তারপর তারপর—বাঁচবার কোনও উপায় যে আর
হাঁ, হ্যাঁ, থাকবে। নুটসনকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, আপনার কোনও ভাবনা নেই। যা-যা বলছি, শুধু তা-ই করুন। ওরা দুজনে এখানে পৌঁছবার পর যেন অত্যন্ত খুশি হয়ে ওদের সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলবেন, ভাল, ভাল। ভারতীয় জ্যোতিষের গণনা তা হলে শেষ হয়েছে। ওরা কিছু বলবার আগেই অধীর আগ্রহে আবার বলবেন, বলুন, বলুন, গণনায় শেষ পর্যন্ত কী জানা গিয়েছে? আমি এখনই আমার কর্তাদের জানিয়ে দেব।
