জানি, জানি। আমার কথার মাঝে যেমন অধৈর্যের সঙ্গে তেমনই ভীত গলায় মঁসিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, সব আমি জানি। তবু বলছি, আপনি দয়া করে থামুন। আমার এখানে থাকা মানে যদি ওই শয়তানদের হাতে আবার পড়া হয়, তা হলে আমার এখন এখান থেকে পালানো মানেও এমন এক হার মানা, যার পর বাঁচবার কোনও মানেই আর থাকে না। না, না। কোথাও আমি এখন আর কিছুতেই যাব না। ওরা জংলি কুকুরের পালের মতো আমায় খুঁজছে এটা ঠিকই, কিন্তু তবু আমায় এখনও তো ধরতে পারেনি। আজ বলতে গেলে ওদের নিজেদের বাসা থেকেই। নিরাপদে আমি ঘুরে এসেছি। আপনি আমার ছদ্মবেশের ভুল দেখিয়ে দিয়েছেন বটে, কিন্তু সে ক্ষমতা ওদের হয়নি। এমনই করে আর কটা দিন যদি আমি ওদের হাত এড়িয়ে থাকতে পারি, তা হলে লকনেসের রহস্য হয়তো সত্যিই আর অজানা থাকবে না। আর তা যদি আমার দ্বারা সম্ভব হয়, তা হলে জংলি কুকুর কি বাঘ-সিংহের বদলে ওরা আমার কাছে নেংটি ইঁদুর হয়ে যাবে, তা কি বুঝতে পারছেন না?
তা পারছি। হতাশভাবে মঁসিয়ে জুতোকে বোঝাবার চেষ্টা করে বললাম, কিন্তু পুরোপুরি লকনেসের রহস্য-ভেদের উপায় সত্যিই যদি আপনি পেয়ে যান, তার সময় যে কিছুতেই আপনি আর পাবেন না। ওরা আজ আপনাকে সামনে পেয়েও চিনতে পারেনি আর পাবেন না। ওরা আজ আপনাকে সামনে পেয়েও চিনতে পারেনি তা ঠিক, কিন্তু ওরা তো তাতেই হার মেনে এখান থেকে চলে যাবে না। ওরা এইটুকু নিশ্চিত জানে যে, আজ যে তিনজন ওদের সঙ্গে দেখা করতে গেছল তাদের একজনই ওদের আসল শিকার। সেই একজনকে প্রথমে নিজেদের চেষ্টায় খুঁজে বার করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত ওরা এখানকার ব্রিটিশ পুলিশের সাহায্য যে নিতে যাবে তাতে কোনও ভুল নেই।
পুলিশের সাহায্য? একসঙ্গে আতঙ্ক আর সন্দেহ-মেশানো গলায় ঘঁসিয়ে জুতো বললেন, পুলিশের সাহায্য ওরা কী করে নেবে? এদেশের পুলিশের নজর দেবার মতো কোন অপরাধ আমি করেছি?
না, তা করেননি, দুঃখের সঙ্গেই জানালাম, তাই ওরা আপনার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ জানিয়ে পুলিশের সাহায্য তো চাইবে না।
তা হলে? রীতিমত অবাক আর সেইসঙ্গে আমার মাথার সুস্থতা সম্বন্ধে স্পষ্ট সন্দেহের সুর নিয়েই মঁসিয়ে জুহো জানতে চাইলেন, কী বলে ওরা এখানকার পুলিশের সাহায্য চাইবে?
চাইবে, যতদূর সম্ভব সোজা করে কথাটা মঁসিয়ে জুহোকে বোঝাবার চেষ্টায় বললাম, ওদের তো বেশি কিছু হাঙ্গামা করতে হবে না। ওরা শুধু যে নামে বাইরের দুনিয়ায় এতকাল আপনি পরিচিত ছিলেন, সেইটি জানিয়ে আর আপনার আসল চেহারার একটা ফোটো দিয়ে পুলিশের কাছে জানাবে যে, তাদের সঙ্গী হিসেবে এই ইনভারনেসে আসার পথে আপনি হঠাৎ রহস্যজনকভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। তাই তারা–
না, না, না, না। আমার কথার মাঝেই অস্থির উত্তেজনায় বাধা দিয়ে মঁসিয়ে জুহো বললেন, আমার আসল নাম, আসল চেহারা—এসব কী বলছেন আপনি? পু-পুলিশ ওদের কথায় আমার খোঁজ করবে কেন?
একটু শান্ত হয়ে আমার কথাগুলো শুনুন মঁসিয়ে জুহে, বেশ শান্ত গলায় বোঝাবার চেষ্টা করলাম এবার, পুলিশ কোনওরকমের অপরাধী বলে আপনার খোঁজ করবে না। আপনার দুশমনদের চাল সেদিক দিয়ে খুব পাকাই হবে। কিন্তু অপরাধী
হলেও হঠাৎ নিরুদ্দেশ হওয়া মানুষকে খুঁজে বার করা তো পুলিশের একটা দায়। ওরা সেই দিক দিয়েই আপনার যথাসাধ্য খোঁজ করবে। তখন কেঁচো খুঁড়তে কী যে বার হতে পারে, তা আপনি বুঝতে পারছেন নিশ্চয়।
না, না, না। আবার উত্তেজিত হয়ে উঠে একটু খাপছাড়া ভাবেই বলে উঠলেন জুতো, আমার আসল নাম কিছু নেই। আর এখানকার পুলিশ তা বার করতেই বা পারবে কী করে? আর যদি বারই বা করে, তার ভয়টা কী আমার? পুলিশ গ্রেফতার করে চালান দিতে পারে এমন কোনও কিছুর সঙ্গে সে নাম কি জড়ানো?
না, তা নয়। একটু দুঃখের হাসি হেসে বললাম, তবু ওই নামটা পচা খোলসের মতো খুলে ফেলে তার সঙ্গে যা কিছুর সংস্রব সব ছেড়ে দিয়ে নতুন একটা সুস্থ জীবন পাবার জন্য আপনি দেশ-দেশান্তরে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে এই লকনেসের রহস্যের দেশে এসে হাজির হয়েছেন। আর এর মধ্যে নানা জায়গায়, কে জানে কোন ফাঁকির কারসাজিতে গাদা করা রাশি রাশি টাকা নানা সৎ কাজে দান করে নিজের মনের গ্লানি খানিকটা ধুয়ে ফেলতে চেয়েছেন।
হ্যাঁ, জুহো এবার স্বীকার করেন, দুঃখী মানুষের উপকারের কাজে অনেক টাকা আমি নানা জায়গায় নিজের নামটুকু পর্যন্ত না জানিয়ে দান করেছি। তবে বিশ্বাস করুন, নানা জায়গায় দান যা করেছি তা কোনওরকম সাধারণ চুরি-ডাকাতি-জালিয়াতির টাকা নয়। সাধারণ বলছি এই জন্য যে, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে চোরাই মালের আসামি হবার মতো অপরাধ না হলেও তা এখনকার যুগের কোটিপতি শেঠেদের একরকম দুর্দান্ত জালিয়াতি। এ জালিয়াতি কোনও আইনের শাসনে পড়ে না, কিন্তু টাকার জোরের সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের ধারালো বুদ্ধি থাকলে দুনিয়ার পয়সাকড়ির বাজার নির্ভয়ে নিজের খুশি মতো লুঠ করা যায়। বুদ্ধির সেরকম প্যাঁচালো ধার থাকলে টাকার জোরেরও দরকার হয় না। যেমন হয়নি আমার। ফাটকাবাজার যাকে বলে, দুনিয়ার সেই ব্যবসাদারির জুয়ার জগতের হাড়হদ্দ অতি সহজে বুঝে নিয়েই আমি সামান্য দু-চারটে নাড়াচাড়ার চালে যখন যেমন খুশি মুনাফা লুটতে পেরেছি। এ কাজে প্রথমে নামবার সময় আমার দুশমন বলে যাদের আপনি জেনেছেন, সেই দু-জনের সঙ্গে আমায় নিয়ম রাখতেই জোট বাঁধতে হয়েছিল। আমার বুদ্ধিতে এর পর অঢেল টাকা যখন উপায় হতে থাকে, তখন এই জোটের বন্ধন আমার গলায় ফাঁসি হয়ে ওঠে। আমার বুদ্ধিতে যত তাদের লাভের টাকা জমতে থাকে তাদের লোভও বাড়তে থাকে তত। আমার তখন সমস্ত ব্যাপারটায় ঘেন্না ধরে গেছে। কিন্তু আমি ছাড়তে চাইলেও তাদের ধুলো-মুঠোকে সোনা-মুঠো করবার পরশপাথর হিসেবে আমায় তারা কিছুতেই মুক্তি দেবে না। সেইজন্য শেষ পর্যন্ত নাম ভাঁড়িয়ে চেহারা লুকিয়ে এমন করে আমি পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। এই অবস্থায় লকনেসের রহস্যভেদের মতো অসামান্য কিছু করলে আমি আমার সব অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে মনে করে আবার সজ্জন মানুষের সমাজে মুখ দেখাতে পারব। আমি—
