বিলেতের পুলিশ কী বস্তু, তা আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে। কোনও কিছু নিয়ে হেলাফেলা করা তাদের কুষ্ঠিতে লেখেনি। সুতরাং মেকিয়াভেলির বুদ্ধি নিয়ে যত ফন্দিফিকিরের ওস্তাদই আপনি হন না কেন, এখানে থাকলে ধরা আপনাকে পড়তেই হবে। আপনার একমাত্র বাঁচবার উপায় এখন এ শহর ছেড়ে চলে যাওয়া।
না, না। মঁসিয়ে জুতো প্রায় যেন আর্তনাদ করে উঠলেন, এ-শহর ছেড়ে এখন আমি যেতে পারব না। এখান থেকে এখন চলে যাওয়া মানে বেঁচে থাকার আর কোনও মানেই না থাকা।
কিন্তু এখানে কতদিন থাকতে পারবেন আপনাদের দুশমনদের দৃষ্টি এড়িয়ে? বেশিদিন যে পারবেন না, আর ওদের কাছে ধরা পড়লে কী দশা যে আপনার হবে, তা আপনি ভাল করেই জানেন।
জানি, জানি। সিয়ে জুহহা আমার দিকেই বিষদৃষ্টিতে চেয়ে বললেন, সেই নরকযন্ত্রণার দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবার জন্যই পরিচয় আর চেহারা সবকিছু বদলাবার চেষ্টা করে এদেশে ওদেশে গা-ঢাকা দিয়ে ফিরতে ফিরতে শেষে এইখানে এসে এমন একটা কিছু করবার পেয়েছি, যাতে রহস্যভেদ করতে পারলে একটা আশ্চর্য কীর্তির সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে রেখে যেতে পারব।
আমি যদি বলি এখান থেকে আপনি আর-এক বিশেষ জায়গায় চলে গেলেই সে আশ্চর্য কীর্তি আপনার নামের সঙ্গে জড়িত হতে বাধ্য?
তা হলে বলব, মঁসিয়ে জুতো বেশ একটু তেতো গলায় বললেন, আমায় ছেলে-ভোলানো ধাপ্পা দেবার চেষ্টা করছেন। শুনুন, আশ্চর্য কীর্তি বলতে কীসের কথা বলছি তা আপনি নিশ্চয় কিছুটা বুঝেছেন, তবু আমি কতদূর যে এগিয়েছি তা আপনি কেন, এ কাজে যারা মেতে আছে তারা কেউ বোধহয় কল্পনাই করতে পারবে না।
এগিয়ে যাওয়াটা কতদুর আর কোথায়, তা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার দরকার হল না। মঁসিয়ে জুহো নিজের উৎসাহের আবেগেই বলে চললেন, আমি যদি বলি, এতকাল ধরে এতবার লকনেসের মধ্যে জলচর দানবের মতো কিছু থাকার বহু প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও কেন কেউ তার জীবন্ত একটা ছবি বা তার দেহের কিছু হাড়গোড়ও সংগ্রহ করতে পারেনি? কেন এতদিনে বংশবৃদ্ধির দরুন অন্তত শ-দেড়েক ওই প্রাণী লকনেসে নিশ্চিত আছে বলে বিশ্বাস হলেও তাদের একটিকেও ঠিক মতো ধরাছোঁয়া যাচ্ছে না? তারা যে আছে, সে-বিষয়ে সন্দেহ না থাকলেও তারা কোন ভোজবাজিতে কনেসের মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে যাচ্ছে? ধরাছোঁয়ার চেষ্টা হলেও এ সমস্ত রহস্যের সঠিক উত্তর কী হতে পারে, তা কেউ এখনও কল্পনাও করতে পেরেছে কি?
তা বোধহয় পেরেছে!
আমার কথায় চমকে উঠে মঁসিয়ে জুতো বেশ একটু অবিশ্বাসের সুরে কড়া গলায় জানতে চেয়েছেন, কে পেরেছে? কে?
যথোচিত বিনয়ের সঙ্গে বললাম, যদি বলি, আমি?
আপনি? মঁসিয়ে জুহোর গলায় অবজ্ঞার সঙ্গে একটু বিস্ময়ও মেশানো, কী, কী বুঝছেন আপনি? কী উত্তর পেয়েছেন ওই ধাঁধার?
আপনি যা পেয়েছেন, তা ছাড়া আর কিছু নয় বোধহয়। ইচ্ছে করেই মঁসিয়ে জুহোকে একটু জ্বালিয়ে বলেছি, ওই একটি ছাড়া রহস্যের সহজ ব্যাখ্যা আর কিছু আছে বলেই মনে হয় না।
কিন্তু ব্যাখ্যাটা কী? জুহো জ্বলে উঠেছেন, কী আপনি বুঝেছেন, সেইটে স্পষ্ট করে বলুন না!
স্পষ্ট করে বলতে হলে, যেন অত্যন্ত সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখতে হচ্ছে এমনভাবে বলেছি, আর কিছু নয়, উত্তরটা শুধু এই যে, লকনেস নামে হ্রদটার বাইরের মাপ লম্বায় চল্লিশ মাইল হলেও আসল মাপ খুব সম্ভবত আরও অনেক বেশি। বাইরে যা দেখা যায়, তা বাদে এই হ্রদ পাতালসাগর হয়ে এই ইনভারনেস অঞ্চলের পাহাড়ি উপত্যকার নীচে বহুদূর পর্যন্ত গভীরভাবে ছড়িয়ে আছে। ওপরে যে হ্রদ আমরা দেখতে পাই, তার সঙ্গে সেই পাতালদের যোগাযোগ আছে ঠিকই, কিন্তু তা খুঁজে বার করতে হলে সমস্ত হ্রদটাই তন্নতন্ন করে জরিপ করতে হয় বলে তা আপনার আমার তো নয়ই, মার্কিন ধনকুবেরদেরও সাধ্য যদি বা হয়, শখ করে মেতে ওঠবার মতো কাজ হবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া আদ্যিকালের এক আজগুবি জানোয়ার সত্যি এখনও আছে কি নেই, তার প্রমাণ পাবার জন্য ব্রিটিশ সরকার তার দেশের পাহাড়-জঙ্গল অমন খোঁড়াখুঁড়ি করে তছনছ করার অনুমতি দেবে বলেও মনে হয় না।
মঁসিয়ে জুতোর মুখটা বেশ একটু করুণ হয়ে এসেছে, তা লক্ষ করে এবার বললাম, না, মঁসিয়ে জুহো, আপনার বৈজ্ঞানিক অনুমানটা যত সঠিকই হোক, নেহাত অচল টাকায় কেনা লটারির টিকিটে ডার্বি সুইপ পাওয়ার মতো ভাগ্যের অবিশ্বাস্য কৃপা না হলে বাকি জীবনভর আগাগোড়া লকনেসের বুকে ড়ুবুরি হয়ে খুঁজলেও পাতালসাগরের সঙ্গে কোথায় তার যোগাযোগ হয়েছে তা খুঁজে পাবেন না। আর খুঁজে পেলেও বা লাভ কী হবে? পাতালসাগরের খোঁজ পেলেই সেখান থেকে জ্যান্ত। কি মরা, বাচ্চা কি বুড়ো লকনেসের জলচর দানব ধরে আনতে পারবেন কি না, তা পারবার একমাত্র উপায় আমি যা পরামর্শ দিচ্ছি তা অগ্রাহ্য না করা। শুনুন মঁসিয়ে জুহো, লকনেসের রহস্য চিরকালের মতো যথার্থই ভেদ করবার গৌরব যদি না-ও চান, নিজেকে বাঁচাবার জন্য ইনভারনেস থেকে সম্ভব হলে এই মুহূর্তে আপনার চলে যাওয়া একান্ত দরকার। যাদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য আপনাকে এমনভাবে এখান থেকে তাড়াবার চেষ্টা করছি, তাদের আসল পরিচয় আপনি আমার চেয়ে ভাল করেই জানেন। ভারতবর্ষের জঙ্গলে কেঁদো বাঘেরা পর্যন্ত যাদের অন্তত ক্রোশখানেকের ফাঁক রেখে এড়িয়ে চলে, সেই জংলি কুকুরের পালের চেয়ে এরা বুঝি ভয়ানক। একবার নিজেদের দাঁতের কামড় যার ওপর এরা বসিয়েছে তার আর রক্ষে নেই। এরা কে—
