হোটেলের বদলে আমার মতো বাসা-ভাড়া করা মক্কেলের খবর এভাবে পাওয়া যাবে না জেনেই প্রথম দুটো বড় হোটেলে গিয়ে খোঁজ করতেই ভাগ্যের জোরে আসল মক্কেলেরই খোঁজ পেলাম বলে মনে হয়।
এ-হোটেলে ঠিক মাস-দেড়েক আগেই এই মক্কেলটি এসে বোর্ডার হয়েছে। আরও অনেকের মতো লকনেসের রহস্যভেদই আসল নেশা হলেও মানুষটার চালচলন একটু অদ্ভুত।
এই মানুষটার সঙ্গে দেখা করতে চাই শুনেই হোটেলের রিসেপশনিস্ট সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছে যে, সেটা কোনওমতেই সম্ভব নয়। কারণ এই অদ্ভুত মানুষটি কারও সঙ্গে দেখা করেন না, যে-কোনও দর্শনপ্রার্থীকে সেকথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেবার নির্দেশ তিনি হোটেলের ম্যানেজমেন্টকে দিয়ে রেখেছেন।
যাকে খুঁজছি, এমন আশাতীত ভাবে তার সন্ধান পাওয়ার পর এরকম নিষেধের বেড়ায় বাধা পেয়ে কী করব তাই ভাবছি, এমন সময়ে আমার মক্কেলই স্বয়ং হোটেলের লবিতে ঢুকে কাউন্টার থেকে তাঁর সুইট-এর চাবিটা চেয়ে নিয়ে গেছেন।
ভদ্রলোক হোটেলের কাউন্টারে আমারই পাশে দাঁড়িয়ে হোটেল-ক্লার্কের কাছ থেকে তাঁর চাবিটা নিয়ে গেলেও সে সময়টায় তাঁর সঙ্গে কোনওরকম আলাপের চেষ্টা করিনি। তিনি লবি থেকে হোটেলের লিফটে তাঁর ওপরতলার স্যুইটে উঠে যাবার পর হোটেলেরই নিজস্ব ছাপ-মারা একটা কাগজ চেয়ে নিয়ে তাতে যা লেখবার তা লিখে হোটেল-ক্লার্ককে সেটা ওপরে ওই ভদ্রলোকের কাছেই পাঠিয়ে দিতে বলেছি।
একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েও হোটেল-ক্লার্ক একজন জ্যানিটরকে দিয়ে কাগজটা পাঠিয়ে যে রকম মুখভঙ্গি করেছে, তাতে বোঝা গেছে, এ চিঠির জবাবে আমার ওপরে যাবার ডাক আসবার কোনও আশাই নেই।
কিন্তু ডাক সত্যিই এসেছে হোটেলের সকলকে অন্তত অবাক করে।
আমি অবশ্য জানতাম যে ডাক আসবেই। কারণ চিঠিতে আমি শুধু মৎস্যাবতারের শ্লোকের প্রথম লাইনটুকু সংস্কৃতে লিখে তার নীচে ইংরেজিতে লিখেছিলাম, সামনে দারুণ বিপদ। তবু হারের খেলায় জেতার মন্ত্র শোনাতে এসেছি।
এ চিঠি পাঠাবার খানিক বাদেই চিঠি যাঁকে লিখেছি তাঁর হুকুম পেয়ে জ্যানিটর যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি নেমে এসে আমায় সঙ্গে করে ওপরের তলার স্যুইটে পৌঁছে দিয়েছে।
স্যুইটটা সত্যিই শৌখিন। আমির-ওমরাহের থাকার মতো। সাজসরঞ্জাম আর মালপত্র দেখে বর্তমান দখলকারী বোর্ডারের চালচলন, অবস্থা আর চরিত্র সম্বন্ধে বেশ কিছু হয়তো জানা যায়, কিন্তু সেসব দিকে নজর না দিয়ে আমি সোজাসুজি প্রথম থেকেই আমার আক্রমণ শুরু করেছি।
দেখা করার অনুমতি দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, পাবলো জুহেনা, মাফ করবেন, নামটা যা নিয়েছেন তা ঠিক যেন খাপ খাচ্ছে না। নামটার মান রাখতে চেহারাটা যা পালটাবার চেষ্টা করেছেন তাতেও বড় গলদ থেকে গেছে। পাবলো জুহো বলে নামটা তো নিয়েছেন ফিনিশ মানে ফিনল্যান্ডের লোকের। কিন্তু তার জন্যে ছদ্ম চেহারা যা নিজেকে দিতে চেয়েছেন তা তো একেবারে নামের সঙ্গে মিলছে না।
নামটা যাদের নিয়েছেন, সেই ফিনদের মাথার চুল প্রায়ই লালচে আর চোখের তারা কিছুটা বাদামি সাধারণত হয় বটে, কিন্তু সত্যিকারের ব্লদ যাকে বলে, সেই ঈষৎ লালচে ধপধপে ফরসা তারা কখনও হয় না। তা ছাড়া, ফিনরা বেশির ভাগই সুইডিশ বা নরওয়ের লোকের তুলনায় একটু বেঁটেখাটো হয়ে থাকে। চোখের তারা তাদের একেবারে নীলও কখনও হয় না।
আপনি চোখের তারার রং লুকোতে বাদামি রঙের কনট্যাক্ট লেন্স লাগিয়ে খানিকটা ধোঁকা দিতে পেরেছেন সত্যি, মাথার সোনালি চুলেও বেশ একটু লালচে ছোপ ধরাতে পেরেছেন, কিন্তু লম্বা-পাতলা দেহটাকে বেঁটেখাটো করা যে ভোজবাজিতে ছাড়া সম্ভব হয় না। তার ওপর মুখ আর হাত-পার খোলা জায়গায় বেশ কয়েক পোঁচ পালিশ দিলেও ভেতরের পাকা ব্লদ মানে দুধে-আলতা আভাকে একেবারে চাপা দেওয়া যায়নি।
শুনুন, পালো জুহো, আসল নাম আপনার যা-ই হোক, আপাতত পাবলো জুহো নামেই আপনাকে ডেকে বলছি, এই নাম বদলে ছদ্ম-চেহারা নিয়ে আপনার লাভ কী হচ্ছে? সাধারণ গোলা লোককে আপনি ফাঁকি দিতে পারেন, তাদের আপনার আসল নাম আর পরিচয় নিয়ে মাথাব্যথা থাকবারও কথা নয়। কিন্তু সত্যিকার কাজের কাজ তাতে আপনার কিছু হচ্ছে কি?
বেশ ধৈর্য ধরেই ঘরের একটা সোফায় বসে আমার কথা শুনতে শুনতে মানুষটা হঠাৎ যেন খেপে গিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে কুকুর-তাড়ানোর মতো আমাকে তাড়া দিয়ে বললে, যান, যান, বেরিয়ে যান এ ঘর থেকে। কে আপনি যে, আমায় আমার ঘরে ঢুকে যত বাজে কথা শোনাতে এসেছেন! আমি যদি নাম ভাঁড়িয়ে থাকি, তা হলে সে আমার খুশি। আর কারও তাতে কী আসে যায়?
আর কারও নয়। আমি গলাটা আগের চেয়ে নামিয়ে শান্ত স্বরে বলেছি, আসে যায় আপনারই। এবং কেন যায় তা আপনি ভাল করেই এখন জানেন। যাদের জন্য নাম ভাঁড়িয়ে এমন করে লুকিয়ে বেড়িয়েছেন, তারা যে আপনার পেছনে এখনও কীভাবে লেগে আছে, আজ তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আপনি পেয়েছেন। তারা অতরকম খুঁত থাকলেও ছদ্ম-চেহারায় আপনাকে চিনতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু আজ না পারলেও কিছুদিন বাদেই তাদের চোখে ধূলো দেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কারণ আর কিছু না বুঝে থাক, যে তিনজন আজ তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেছল, তাদের আসল শিকার যে সেই তিনজনেরই একজন, এটুকু তারা ঠিকই এখন বুঝে ফেলেছে। সুতরাং এক এক করে তিনজনকেই খুঁজে বার করবার জন্য তারা যা কিছু করা সম্ভব তা করতে বাকি রাখবে না। ইনভারনেস লন্ডন কি প্যারিসের মতো এত বড় শহর নয় যে বাড়িঘর আর মানুষের ভিড়ের জঙ্গলে সেখানে চিরকাল না-ও যদি হয়, বেশ কিছুদিন অন্তত লুকিয়ে থাকা যায়। তা ছাড়া আপনাকে যারা খুঁজছে তারা কী ধরনের মানুষ তা জানতে নিশ্চয় আপনার বাকি নেই। চটপট আপনাকে খুঁজে বার না করতে পারলেও তারা খোঁজায় ক্লান্ত হবে না। সহজে খোঁজ না পেলে তারা হন্যে হয়ে আপনার সন্ধানে যা কিছু সম্ভব তার কোনও ফন্দি খাটাতে বাদ রাখবে না। কিছুতে না পারলে তারা আপনার আসল পাসপোর্ট যে নামে আছে, সেই নামের যে-মানুষ হঠাৎই এই ইনভারনেস শহরে আসার পর নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে, তাকে খোঁজার জন্য পুলিশের সাহায্য চাইবে।
