না, না, নেই! এবার ডুগানই খিঁচিয়ে উঠে বলেছে, তোমার জন্যই বুনো হাঁসের পেছনে ধাওয়া করে আমাদের এই নাকাল হওয়া। কিন্তু আমার ডালকুত্তার নাক। একটু গন্ধ যখন পেয়েছি তখন যেমন করে তোক আজ না হয় কাল খুঁজে বার করবই।
খুঁজে বার করবেই? যেন সত্যি উৎসাহিত হয়ে বললাম, তা হলে আসল বাসাটা বার করতে না পারলেও কোন মুলুকে সে চরে, সেটার হদিস দেবার বাহবাটা আমায় দাও।
হ্যাঁ, দেব, দেব। তার জন্য তোর গলায় মেডেল ঝুলিয়ে দেব।
মেডেলের আগে বকশিশ পেলে কিন্তু সুবিধে হত আমার। আমি একটু যেন মিনতির সুরে বলেছি।
বকশিশ! তুই বকশিশ চাইছিস? একেবারে যেন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল কার্ভালো। তারপর আমার ওয়ার্ডরোবে গিয়ে ঢোকার পর কোমরের বেল্টে গুঁজে রাখা পিস্তলটা আবার টেনে বার করে আমার দিকে উঁচিয়ে ধরে বলেছে, তোর হাওয়া খেলবার ফুটো করে দেওয়াই এখন তোর উপযুক্ত বকশিশ, তা জানিস কি?
না, না, ওসব কী অন্যায় কথা! আমি–আমি প্রায় করুণ স্বরে বলেছি, তোমাদের আসল কাজ এমন করে হাসিল করে দেবার পর মাথার খুলি ফুটো করতে চাওয়াটা–
থাম, থাম।অধৈর্যের উত্তেজনায় আমার কথাটা শেষ করতে না দিয়ে গোরিলা কার্ভালো গর্জে উঠেছে, আমাদের সঙ্গে ঠাজি করিস, এত বড় তোর সাহস! এই অখদ্যে শহরে আনা ছাড়া কী কাজ তুই আমাদের করেছিস? বড়াই করছিস কী আসল কাজের?
কী আসল কাজ তা এখনও বুঝতে পারোনি? আমি রীতিমত হতাশার সুরে বলেছি এবার। তা যদি না বুঝে থাকো, তা হলে আর বুঝে দরকার নেই। তোমাদের মতো মগজ যাদের নিরেট, তাদের কাজের ভার নেওয়াই আমার ভুল হয়েছে। যাক, তোমাদের বকশিশ দেবার দরকার নেই। আমারও কাজ নেই এখানে আর সময় নষ্ট করবার।
খবরদার, আমি উঠে পড়বার ভঙ্গি করার সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলটা উঁচিয়ে ধরে কার্ভালো বজ্রস্বরে ধমকে দিয়েছে, আর একটু বেয়াড়াপনা করলে মাথার খুলি ফুটো করার আগে পাঁজরা দুটোই ঝাঁঝরা করে দেব! আর কিছু বলার সুযোগ কার্ভালো পায়নি। তার ডান হাতের কনুইয়ের নীচে বিদ্যুতের বেগে আমার বাঁ পায়ের হাঁটুর একটা মোক্ষম ঠোক্কর লাগার সঙ্গে সঙ্গে হাতটা অবশ হয়ে পিস্তলটা মেঝেতে ছিটকে পড়েছে।
তৎক্ষণাৎ সেটা তুলে নিয়ে ডান হাতে একটু লোফালুফি করতে করতে বলেছি, এসব বেয়াড়া জিনিস বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলাপের সময় কাছে না থাকাই ভাল। আলাপটা আমাদের দু-পক্ষের মধ্যে কাজের ফরমাশ আর তার জন্যে বকশিশের দরাদরি নিয়ে, কেমন? আসল কাজ কিছু করিনি বলে তোমরা আমার বকশিশের দাবিটা মানতেও চাও না। এমনকী, আসল কাজ যে কী আমি করেছি, তা তোমরাও জানো না বলছ! তা জানতে যখন পারোনি, তখন তোমাদের যেমন আছ তেমনই অন্ধকারে রেখে আমি এখন চলে যেতে পারি তোমাদের কিছু না বোঝার ছটফটানির মধ্যে রেখে। কিন্তু তা আমি করব না। তোমাদের অন্য এক জাতের ছটফটানির মধ্যে রেখে এইটুকু শুধু বলে যাব যে, যাকে তোমরা খুঁজছ সে আজ এখানে তোমাদের সামনে এসে দেখা দিয়ে কথাও বলে গেছে। তার ছদ্মবেশ আর চেহারা শুধু তোমরা চিনতে পারোনি। এখন যে তিনজন আজ এসেছিল, তাদের মধ্যে কোনটি তোমাদের আসল শিকার তা ভেবে বার করতে মাথার চুল ঘেঁড়ো। আমি চললাম।
আমি ঘরের বাইরে এসে দরজাটা ভেজিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে প্রায় আকুল আর্তনাদের মতোই দুই মূর্তিমানের মিনতি শুনলাম, এই যে, এই শোেনো, শোনো– এরপর আর-একটু খাতির মাখানো গলায়, শুনুন, শুনুন মি. দাস! মিনতির উত্তরে গুলি বার করে নেওয়া পিস্তলটা শুধু বাইরের দরজার ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে আমি একটা গলি-পথে বাঁক নিয়ে চলে এলাম।
০৭. রহস্য-সংকেতের কাগজ
ঘনাদা বললেন, রহস্য-সংকেতের কাগজ নিয়ে তার অর্থ বোঝার জন্য যে তিনজন খানিক আগে আমার ডেরায় এসেছিল, তাদের মধ্যে আসল ধুরন্ধরকে আমি চিনতে পেরেছি মনে হল। এখন প্রথম কাজ হল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে খুঁজে বার করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা।
কিন্তু ডুগান আর কার্ভালোর আগে তা কি আমি পারব?
ছদ্মবেশ চেহারায় আসা আসল আসামিকে তারা ঠিক মতো চিনতে না পেরে থাকলেও সে যে তিনজনের একজন, এ বিষয়ে তো তাদের কোনও সন্দেহ নেই। আমি যখন বিশেষ একজনকে খুঁজব, তাদের তখন পরপর তিনজনের পেছনে লেগে থেকে আসল ধুরন্ধরকে খুঁজে বার করতে হবে।
কিন্তু তিনজনের বেশি চারজন তো নয়। ভাগ্য একটু সদয় হলে আমার আগেই তারা আসল লোককে পাকড়াও করতে পারবে নাই বা কেন?
যাকে আসল আসামি বলে চিনে ফেলেছি বলে আমার ধারণা, তাকে খুঁজে বার করাও আমার পক্ষে মোটেই সোজা নয়। তার ছদ্মচেহারাটাই আমি দেখেছি। সেই ছদ্মচেহারা যদি সে এখন চটপট পালটে না-ও ফেলে থাকে, তা হলেও তার আস্তানা খুঁজে বার করে তার সঙ্গে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যোগাযোগের ব্যবস্থা করার কী উপায় আছে?
ভাগ্য একটু সহায় বলে সেই উপায়ই হল। কার্ভালো আর ডুগান হন্যে হয়ে যাকে খুঁজছে, খুব বেশিদিন সে বিলেতে এসে নামেনি। হিথরোতে নেমেই সম্ভবত লকনেসের রহস্যের টানে ইনভারনেসে রওনা হলেও সেটা মাসখানেকের চেয়ে বেশি আগের ব্যাপার হতে পারে না। কার্ভালোদের শিকারের খোঁজ করতে হলে ইনভারনেসের গোনাগুনতি ছোটবড় হোটেলের রেজিস্টারে মাস-দেড়েকের মধ্যে আসা-যাওয়া বোর্ডারদের পরিচয়গুলো সংগ্রহ করতে হয়। আসল আসামির সে পরিচয় মিথ্যে হলেও তার হোটেলের বোর্ডার হওয়ার তারিখটা থেকে যা জানবার তা আঁচ করা যেতে পারে।
