এদিক ওদিক ঘুরে তোমরা তখন মিসেস টডের দোকানটা খুঁজে বার করে সেখানে ঢুকেছ। সেখান থেকে বেরিয়ে তোমরা আমার ভাড়া-নেওয়া এই বাসাটা খুঁজে বের করে এখানে আসার সময় আমি যে আগাগোড়া তোমাদের পেছনে ছিলাম তা তোমরা টের পাওনি। পাও না পাও, লোকসান তাতে তোমাদের এমন কিছু হয়নি। এখন তোমাদের আসল কাজ যদি উদ্ধার হয়, তা হলে আর আফশোসের কিছু নেই।
ঘড়িতে দেখছি তোমাদের মক্কেলদের আসবার সময় হয়ে গেছে। আমি তা হলে এখনকার মতো বাইরে যাচ্ছি—
না, গর্জন করে উঠল কার্ভালো।
যাবার জন্য উঠে পড়েও আমি আবার সোফার ওপর বসে পড়লাম। তবে সেটা গোরিলা কার্ভালোর গর্জনের জন্য নয়, এমনকী কোমরের বেল্ট থেকে যে পিস্তলটা টেনে বার করে সে তখন আমার দিকে তুলে ধরেছে, তার জন্যও নয়। তবে পিস্তল উঁচিয়ে ধরবার মতো স্পর্ধা যার হয়েছে, তার দৌড় কতটা তা আমি তখন দেখতে চাই।
বেশ একটু ভয়ের ভান করে তাই আমি চটপট আবার বসে পড়ে কাঁপা কাঁপা গলায় যেন নালিশ জানালাম, পিস্তল-টিস্তল দেখানো, এ আবার কী! সোজাসুজি আমায় এখান থেকে যেতে বারণ করলেই তো হয়। তাছাড়া আমায় এখানে ধরে রেখে তোমাদের লাভটা কী? তোমরা কাকে খুঁজছ না খুঁজছ তা কি আমি জানি?
ভয় পাওয়ার অভিনয়টা আমার ভালই হয়েছিল বোধহয়। কারণ, এর আগে বারকয়েক নাকাল হবার পর নিজের জবরদস্ত শাসানির ফল এবারে যেন হাতে হাতে পেয়ে কার্ভাললা তখন মুখে যেন বাঁকা হাসি মাখিয়ে পিস্তলটা ডান হাতে একটু ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, না, তুই কিছুই জানিস না। তবু তোকে কেন ধরে রাখছি, তা বুঝতে পারছিস না? তোকে ধরে রাখছি, যাতে এখন বাইরে গিয়ে তুই আমাদের মক্কেলদের কোনওরকম ভাঙচি না দিতে পারিস।
ভাঙচি দেব আমি? সত্যিই একেবারে আকাশ থেকে পড়ে আমি বললাম, কী ভাঙচি আমি দিতে পারি? আর দিয়ে আমার লাভটা কী, তাই তো বুঝতে পারছিনা।
অত কথা জানি না। কার্ভালোর আগে শুঁটকো ডুগানই এবার খিঁচিয়ে উঠল, তোমায় এখানে থাকতে বলা হয়েছে। তাই তুমি থাকবে। এ নিয়ে তর্ক করবার আর আমাদের সময় নেই।
বেশ, তোমাদের হুকুমই মানছি! অসহায় ভাবে ওদের কথা যেন মানতে বাধ্য হয়ে বললাম, কিন্তু থাকব কোথায়? এই এখানে, তোমাদের সঙ্গে? সে কি ঠিক হবে?
না, তা হবে না, কার্ভালো গর্জন করে উঠল, আমাদের মধ্যে নয়, তুই থাকবি ওই—ওই—
এদিক-ওদিক চেয়ে ঘরের ওয়ার্ডরোবটার দিকে চোখ পড়ায় সে খুশি হয়ে বললে, তুই থাকবি ওই ওয়ার্ডরোবের ভেতরে।
থাকবার জায়গার নির্দেশ দিয়ে গোরিলা কার্ভালো সাবধানও করে দিলে সেই সঙ্গে, ওখানে থাকবি, কিন্তু একেবারে সাড়াশব্দ না দিয়ে। ওখান থেকে কোনওরকমে বেয়াড়াপড়ার চেষ্টা করলে লুকিয়ে চোর ঢুকেছে মনে করার ছুতোয় পিস্তলের গুলি ছুঁড়ে একেবারে ঝাঁঝরা করে দেব, মনে থাকে যেন।
ওয়ার্ডরোবের ভিতর বা যেখানেই হোক, ওই কামরার মধ্যে উপস্থিত থাকবার সুযোগ পাওয়াটাই তখন আমার কাছে মস্ত লাভ।
সময় তখন হয়ে গেছে। কার্ভালোর সঙ্গে কোনও রকম তর্ক আর না করে সুবোধ ছেলের মতো ওয়ার্ডরোবের ভেতর গিয়ে ঢুকলাম। ছোটখাটো নয়, আমার মতো মানুষের বেশ স্বচ্ছন্দে থাকবার মতো প্রশস্ত জায়গা। আমাদের এখানে হলে ভ্যাপসা গরমে কষ্ট পাবার ভয় হয়তো ছিল। কিন্তু উত্তর স্কটল্যান্ডের তখনকার শীতে কোনওরকম কষ্টই হয়নি।
কিন্তু যার জন্য এতসব আয়োজন, সেই আসল কাজটাই যে গেল পুরোপুরি ভেস্তে। যাদের আসবার কথা তারা পর পর সময়মত তিনজন ঠিকই এসেছে। কিন্তু এই নিষ্ফল আসার হয়রানির জন্য গালমন্দ দিয়ে ঝগড়া যে কেউ তারা করেনি, সে নেহাত ওদেশের সহবত শিক্ষার গুণেই বলে মনে হয়।
যে তিনজন এসেছিল, তাদের মধ্যে একজন বয়স্কা মহিলা, একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক, আর তৃতীয়জন কিছুটা কম বয়সের, অবসর-নেওয়া মিলিটারি অফিসার। বলেই মনে হয়।
ওয়ার্ডরোবের দরজার চাবির ফুটোটা আমি আমার চাবির রিং-এ পরানো খুদে ছুরির ফলা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে একটু বড় করে নিয়েছিলাম। যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের চেহারাগুলো দেখতে আর কথাগুলো শুনতে বিশেষ কিছু অসুবিধে তাই হয়নি।
চেহারাগুলোর তফাত থাকলেও কথা তিনজনে যা বলেছে, তা সম্পূর্ণ একই বলতে হয়।
তাদের প্রথম জিজ্ঞাসা হল, তাদের কাছে বিক্রি করা রহস্য-সংকেতের কাগজে ভারতীয় ভাষায় যা লেখা আছে তার অর্থটা কী? আর সেটা যদি জ্যোতিষ গণনার মন্ত্র হয়, তা হলে তার সাহায্যে কী হদিস পাওয়া গেছে লকনেসের জল-দানবের রহস্যের?
দুই মূর্তিমান, শুঁটকো ডুগান আর গোরিলা কার্ভালো যে কোনও জবাবই এই দুটি প্রশ্নের দিতে পারেনি, তা বোধহয় বলতে হবে না। সময় লাগার অজুহাত যে তারা দেখিয়েছে, তা মানতে কেউ রাজি হয়নি। রহস্য সংকেত জানবার জন্য প্রার্থীদের দেওয়া মোটা দর্শনী তাই ফেরত দিতে হয়েছে ডুগান আর কার্ভাললাকে!
তাতে তারা খুব দুঃখ পেয়েছে কি?
না, তা পাবার তো কথা নয়। কারণ, আসল যা কাজ তা তাদের হাসিল হয়ে গেছে। সংকেতলিপির রহস্য জানতে যারা আসবে, কাছ থেকে তাদের খুঁটিয়ে দেখাই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য। সে-দেখার সুযোগও তাদের হয়েছে।
তবু তারা খুশি নয় কেন? তারা যাকে খুঁজছে সংকেতলিপির মানে বুঝতে চাওয়া তিন উমেদারদের মধ্যে সে কি ছিল না? ছদ্মবেশেও কি নয়? কথাটা জিজ্ঞেস করেছি আমি বেশ একটু হতাশ গলাতেই।
